বিশ্বকাপ নকআউট পর্ব
ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার সমীকরণ: ফাইনালের আগে দেখা হওয়ার সুযোগ কতটা?
শাহীন রহমান

ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমর্থকদের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য মুখোমুখি লড়াই। লাতিন আমেরিকার দুই পরাশক্তি এবার ভিন্ন ভিন্ন অংশে অবস্থান করায় তাদের পথচলার হিসাব-নিকাশও আলাদা। ফলে ফাইনালের আগে দুই দলের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা কতটা, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বর্তমান নকআউট সূচি অনুযায়ী ব্রাজিল রয়েছে ব্র্যাকেটের এক অংশে, আর আর্জেন্টিনা রয়েছে অন্য অংশে। এর অর্থ, দুই দল নিজেদের নিজ নিজ ম্যাচ জিততে থাকলে সরাসরি ফাইনালের আগে তাদের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচই হতে পারে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর প্রথম লড়াই।
ব্রাজিলের যাত্রা শুরু হচ্ছে রাউন্ড অব ৩২ থেকে। প্রথম ম্যাচে জয় পেলে তারা উঠবে শেষ ষোলোতে। এরপর কোয়ার্টার ফাইনাল এবং সেমিফাইনাল পেরোতে পারলেই ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত হবে। একইভাবে আর্জেন্টিনাকেও নিজেদের ব্র্যাকেট ধরে শেষ ষোলো, কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনাল জিতে ফাইনালে পৌঁছাতে হবে।
ব্রাজিল ‘সি’ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় রাউন্ড অব ৩২-এ তাদের প্রতিপক্ষ ‘এফ’ গ্রুপের রানার্সআপ জাপান। এই ম্যাচ জিততে পারলে শেষ ষোলোতে ব্রাজিল খেলবে কোট দিভোয়ার–নরওয়ে ম্যাচের বিজয়ীর বিপক্ষে। সেখান থেকে জিতলে কোয়ার্টার ফাইনালে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হতে পারে ইংল্যান্ড, মেক্সিকো, কঙ্গো, ইকুয়েডর কিংবা ওই অংশ থেকে উঠে আসা অন্য কোনো দল। কোয়ার্টার ফাইনাল পেরোতে পারলে সেমিফাইনালে তাদের সামনে আসতে পারে জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস বা মোরক্কোর মতো শক্তিশালী দল।
অন্যদিকে ‘জে’ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার প্রথম নকআউট প্রতিপক্ষ ‘এইচ’ গ্রুপের রানার্সআপ কেপ ভার্দে। এই ম্যাচে জিতলে শেষ ষোলোতে তাদের প্রতিপক্ষ হবে অস্ট্রেলিয়া–মিশর ম্যাচের বিজয়ী। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হতে পারে সুইজারল্যান্ড, আলজেরিয়া, কলম্বিয়া বা ঘানা। সেমিফাইনালে উঠলে স্পেন, পর্তুগাল, ক্রোয়েশিয়া, বেলজিয়াম, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ওই অংশ থেকে উঠে আসা যে কোনো দলের বিপক্ষে খেলতে হতে পারে।
অর্থাৎ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা নকআউটের দুই ভিন্ন অর্ধে রয়েছে। ফলে কোয়ার্টার ফাইনাল বা সেমিফাইনালে তাদের মুখোমুখি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একমাত্র উভয় দল নিজেদের চারটি নকআউট ম্যাচ জিতে ফাইনালে উঠতে পারলেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা মহারণ সম্ভব হবে। বিশ্লেষকদের মতে, নকআউট পর্বে প্রতিটি ম্যাচই আলাদা পরীক্ষা। গ্রুপ পর্বের পারফরম্যান্স যত ভালোই হোক, এক ম্যাচের ভুলেই বিদায় নিতে হতে পারে। তাই ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা কোনো দলই ফাইনালের কথা ভাবার আগে নিজেদের প্রতিটি ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
দুই দলের সম্ভাব্য পথও বেশ কঠিন। ব্রাজিলের ব্র্যাকেটে রয়েছে কয়েকটি শক্তিশালী ইউরোপীয় ও আফ্রিকান দল। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার দিকেও রয়েছে অভিজ্ঞ ও গতিশীল কয়েকটি প্রতিপক্ষ। ফলে দুই দলকেই প্রতিটি রাউন্ডে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মুখোমুখি লড়াই খুব বেশি দেখা যায়নি। দুটি দল একই মহাদেশের হলেও বিশ্বকাপের ড্র এবং নকআউট বিন্যাসের কারণে বেশিরভাগ সময়ই তারা আলাদা পথে থেকেছে। ফলে সম্ভাব্য একটি ফাইনাল ফুটবলপ্রেমীদের জন্য হতে পারে বহু প্রতীক্ষিত এক মহারণ।
তবে নকআউট পর্বের বাস্তবতা হচ্ছে, কোনো সমীকরণই শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। বড় দলগুলোর বিপক্ষে অঘটন ঘটার নজির বিশ্বকাপে বহুবার রয়েছে। তাই ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার যেকোনো একটি দল মাঝপথে বিদায় নিলে সম্ভাব্য ‘সুপার ক্লাসিকো’ ফাইনালের স্বপ্নও শেষ হয়ে যাবে।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ব্র্যাকেট অনুযায়ী দুই দলই যদি নিজেদের সব ম্যাচ জিতে ফাইনালে পৌঁছায়, তবেই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা মহারণ সম্ভব হবে। সেমিফাইনাল বা কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের মুখোমুখি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, কারণ তারা নকআউটের বিপরীত অংশে অবস্থান করছে।
এ কারণে সমর্থকদের আগ্রহ এখন দ্বিমুখী। একদিকে নিজ নিজ দলের জয়, অন্যদিকে সম্ভাব্য ঐতিহাসিক ফাইনালের অপেক্ষা। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীও সেই স্বপ্নের ম্যাচের দিকেই তাকিয়ে আছেন। তবে তার আগে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা—উভয় দলকেই নিজেদের সামনে থাকা প্রতিটি বাধা পেরোতে হবে। সব মিলিয়ে বর্তমান নকআউট সূচির হিসাব বলছে, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা ফাইনালের আগে একে অপরের প্রতিপক্ষ হতে পারবে না।
তাদের সম্ভাব্য লড়াইয়ের একমাত্র মঞ্চ হলো বিশ্বকাপের ফাইনাল। এখন দেখার বিষয়, দুই দলই কি নিজেদের পথচলা সফল করে সেই বহুল আকাঙ্ক্ষিত ফাইনাল নিশ্চিত করতে পারে, নাকি নকআউট পর্বে অন্য কোনো দল তাদের স্বপ্ন ভেঙে দেয়।
আ.দৈ/আরএস




















