বর্ষার মাঝেও তাপপ্রবাহ
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি
শাহীন রহমান

বর্ষাকাল চললেও দেশের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আট জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে দেশের অধিকাংশ এলাকায় বজ্রসহ বৃষ্টি এবং কোথাও কোথাও ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষার মধ্যে এমন পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক মনে হলেও বাংলাদেশের মৌসুমি জলবায়ুতে এটি বিরল নয়।
তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একই সময়ে তাপপ্রবাহ, ভারী বৃষ্টি ও বজ্রঝড়ের মতো চরম আবহাওয়া আরও ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে। শুধু বাংলাদেশ নয় পুরো ইউরোপ জুড়ে একই ধরনের আবহাওয়া বয়ে যাচ্ছে। তবে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান তাপপ্রবাহের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই।
তাদের মতে, ইউরোপে যে তাপপ্রবাহ দেখা দিয়েছে, তার পেছনে রয়েছে শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয় বা ‘হিট ডোম’, উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা অতিগরম বায়ু এবং স্থানীয় আবহাওয়াগত পরিস্থিতি। অন্যদিকে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে মৌসুমি বায়ু, স্থানীয় বৃষ্টিপাতের বৈচিত্র্য এবং আঞ্চলিক বায়ুপ্রবাহের ফল।
তবে তারা বলছেন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়েই চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব, তীব্রতা ও পুনরাবৃত্তির হার বেড়েছে। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্চ-এপ্রিলের বাইরে মে, জুন এমনকি বর্ষা মৌসুমেও স্বল্পমেয়াদি তাপপ্রবাহের ঘটনা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে অল্প সময়ের মধ্যে ভারী বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও বজ্রপাতের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, একই সময়ে তাপপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাতকে পরস্পরবিরোধী মনে হলেও মৌসুমি আবহাওয়ায় এটি সম্ভব। কারণ, দেশের সব এলাকায় একই ধরনের আবহাওয়া একসঙ্গে বিরাজ করে না। কোনো এলাকায় মেঘ ও বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা কমে গেলেও অন্য এলাকায় রোদ ও কম বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী পাঁচ দিন দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। পশ্চিমাঞ্চলেও বৃষ্টির বিস্তার বাড়লে বর্তমানে চলমান মৃদু তাপপ্রবাহ ধীরে ধীরে প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ততদিন পর্যন্ত তাপপ্রবণ এলাকার বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনে রোদে চলাফেরা এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
রোববার আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু তাপপ্রবাহ আগামী কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং খুলনা বিভাগের কিছু এলাকায় দমকা হাওয়া ও বজ্রপাতসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণও হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বর্তমানে একটি লঘুচাপের বর্ধিতাংশ গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর মোটামুটি সক্রিয় থাকলেও উত্তর বঙ্গোপসাগরের অন্যত্র তা দুর্বল থেকে মাঝারি অবস্থায় রয়েছে। এই পরিস্থিতির কারণেই দেশের এক অংশে বৃষ্টিপাত এবং অন্য অংশে তাপমাত্রা বেশি থাকার মতো বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, জুনের শেষ সপ্তাহে তাপপ্রবাহ খুব সাধারণ ঘটনা না হলেও এটি অস্বাভাবিকও নয়। বিশেষ করে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে কয়েকদিন উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি না হলে এবং আকাশ তুলনামূলক পরিষ্কার থাকলে ভূমি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গসংলগ্ন অঞ্চল থেকে উষ্ণ ও অপেক্ষাকৃত শুষ্ক বায়ু প্রবাহিত হলে সেই উত্তাপ আরও বাড়ে। ফলে বর্ষা মৌসুমেও স্থানীয়ভাবে মৃদু তাপপ্রবাহ সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বর্তমানে যেসব জেলায় তাপপ্রবাহ চলছে, সেগুলোর বেশির ভাগই দেশের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। এ অঞ্চলগুলোতে বর্ষার বৃষ্টির পরিমাণ অনেক সময় পূর্বাঞ্চলের তুলনায় কম থাকে। বৃষ্টির এই অসম বণ্টনের কারণেই একই সময়ে একদিকে বৃষ্টি, অন্যদিকে তাপপ্রবাহ দেখা দেয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংজ্ঞা অনুযায়ী, দেশের কোথাও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাকে মৃদু তাপপ্রবাহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় প্রকৃত অনুভূত তাপমাত্রা আরও বেশি হতে পারে। এতে মানুষের শরীরে গরমের চাপ বাড়ে এবং শিশু, বয়স্ক ও বাইরে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
আ.দৈ/আরএস




















