বিব্রত হাইকমান্ড, সতর্কতা ও শৃঙ্খলা জোরদারের উদ্যোগ
বেফাঁস বক্তব্যে বারবার বিতর্কে জামায়াতের নেতা-এমপিরা
শাহীন রহমান

নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম। সাম্প্রতিক তিনি আলোচনার বড় কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। গত ১৪ জুন জাতীয় সংসদে দেয়া এক বক্তব্যে তিনি দাবি করেছেন, তার বাবা ও দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। বক্তব্যটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
নিজেকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সন্তান দাবি করলেও নির্বাচনী হলফনামায় দেখা যায় তার জন্ম ১৯৮১ সালে। একই সঙ্গে তার পিতা আব্দুল কাদের সৈয়দীও জীবিত আছেন। এমন বেফাঁস বক্তব্য তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন মুনতাকিম ও তার দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এমনকি সরকারদলীয় এমপিদেরও প্রশ্নের মুখে পড়েন। পরে তিনি বক্তব্যটি অনিচ্ছাকৃত ভুল ছিল বলে বিষয়টি স্পিকারকে জানান এবং তার ভুল স্বীকার করে নেন। একজন সংসদ সদস্যের এমন বেফাঁস বক্তব্য দলটির ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলেছে।
বিতর্কের আরেকটি ঘটনায় জড়ান নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবদুস সাত্তার। সংসদে একটি উপমা ব্যবহার করে দেয়া তার বক্তব্য নিয়ে আপত্তি ওঠে। এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমানও সংসদ সদস্যদের আবাসিক সুবিধা নিয়ে বক্তব্য দেয়ার পর আলোচনায় আসেন। স্থানীয় উন্নয়ন বা জাতীয় নীতির পরিবর্তে ওভেন, পর্দা কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয়তার মতো বিষয় সংসদে উত্থাপনের ঘটনাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক হাস্যরসের জন্ম দেয়।
এদিকে গত মঙ্গলবার রংপুরের মিঠাপুকুরে একটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী ঘোষণা করতে গিয়ে মসজিদের ভেতরে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে দলীয় সভা করেছে জামায়াতে ইসলামী। এ-সংক্রান্ত ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বেফাঁস বক্তব্য ও স্থানীয় পর্যায়ে বিতর্কিত ঘটনায় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে দলটিকে। এ প্রেক্ষাপটে দলীয় নেতাকর্মী ও সংসদ সদস্যদের জনসমক্ষে বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে আরো সংযত এবং দায়িত্বশীল হওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
জানা গেছে দলটির কয়েকজন নেতা ও সংসদ সদস্যের ধারাবাহিক বেফাঁস, বিতর্কিত এবং কখনো তথ্যগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বক্তব্য দলটির জন্য নতুন করে অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে দেয়া এসব মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা হাইকমান্ড নেতাদের বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছে এবং দলীয় শৃঙ্খলা কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
দলীয় সূত্র জানা গেছে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন নেতা ও এমপির মন্তব্য গণমাধ্যমেও নেতিবাচকভাবে প্রচারিত হওয়ায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ কারণে ভবিষ্যতে কোনো নেতা যেন ব্যক্তিগত মতামতকে দলীয় অবস্থান হিসেবে তুলে না ধরেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সাংবিধানিক কিংবা জাতীয় ইস্যুতে বক্তব্য দেয়ার আগে কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে পরামর্শ করারও পরামর্শ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
দলের নেতারা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি অসতর্ক মন্তব্য মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে পড়ে এবং তা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমালোচনার অস্ত্র হয়ে ওঠে। ফলে নেতাদের বক্তব্যের ভাষা, তথ্যের নির্ভুলতা এবং রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার বিষয়টি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি দল যখন জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করে, তখন নেতাদের ব্যক্তিগত বক্তব্যও দলীয় ভাবমূর্তির অংশ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কোনো বিতর্কিত মন্তব্য কেবল একজন ব্যক্তিকেই নয়, পুরো দলকেই ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য করতে পারে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বক্তব্য নিয়ে অভ্যন্তরীণ বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নেতাদের কেউ কেউ মৌখিকভাবে সতর্কবার্তা পেয়েছেন, আবার কিছু ক্ষেত্রে ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে। যদিও এসব বিষয়ে দল আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
এ বিষয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, ‘দলের সদস্যরা যেন অযাচিত ভুল না করেন, সেজন্য সংসদ অধিবেশন শুরুর আগে দুদিন করে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এরপর প্রতিদিন কারা বক্তব্য দেবেন, সেটিও জানিয়ে দেয়া হচ্ছে। তার পরও কেউ কেউ ভুল করছেন।’ তবে চলমান ইস্যু নিয়ে জামায়াত বিরোধীদলীয় সংসদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এটি তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম বলে জানান সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
তিনি বলেন, ‘কেউ কোনো বিতর্কের সঙ্গে জড়িত হলে আমরা প্রথমে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করি এবং সতর্ক করি, পরামর্শ দিই। শুরু থেকে এমপিদের জন্য বিভিন্ন কর্মশালার ব্যবস্থা ছিল। এটি আমাদের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। আমরা সুশৃঙ্খল দল হিসেবে বিতর্ক এড়িয়ে যেতে চাই।
তবে জামায়াতের নেতারা জানিয়েছেন কোনো নেতার ব্যক্তিগত মন্তব্যকে দলীয় অবস্থান হিসেবে দেখা উচিত নয়। দল তার নিজস্ব নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং আনুষ্ঠানিক বিবৃতি বা মুখপাত্রের বক্তব্যই দলীয় অবস্থান হিসেবে বিবেচ্য। বিশ্লেষদের মতে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনমত গঠনে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে দলীয় নেতাদের বক্তব্যে অসঙ্গতি বা তথ্যগত ভুল থাকলে তা দ্রুত জনআলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। এতে শুধু সমালোচনাই নয়, দলের সাংগঠনিক দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো বার্তার সমন্বয় বজায় রাখা। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব একটি অবস্থান তুলে ধরলেও যদি বিভিন্ন নেতা ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দেন, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। এ কারণে বিশ্বের অনেক রাজনৈতিক দলই মুখপাত্রভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেয়।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে ভবিষ্যতে প্রশিক্ষণ, ব্রিফিং এবং গণমাধ্যমে বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে আরও সমন্বিত নীতি অনুসরণ করা হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অনুমোদিত মুখপাত্রদের মাধ্যমেই দলীয় অবস্থান তুলে ধরার বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। তবে জামায়াতের কয়েকজন নেতা দাবি করেছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ অনেক সময় তাদের বক্তব্য আংশিক উদ্ধৃত করে বা প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে উপস্থাপন করে বিতর্ক তৈরি করে। তাদের মতে, সম্পূর্ণ বক্তব্য বিবেচনা করলে অনেক ক্ষেত্রেই ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ থাকে না। যদিও সমালোচকদের বক্তব্য, জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়ার সময় শব্দচয়ন ও তথ্য উপস্থাপনে সর্বোচ্চ সতর্কতা নেতাদেরই অবলম্বন করা উচিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যেকোনো দলের জন্য অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও বার্তার সামঞ্জস্য বজায় রাখা দীর্ঘমেয়াদে জনআস্থা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। তাই বিতর্কিত মন্তব্যের পুনরাবৃত্তি রোধে সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা দলের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে এ বিষয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত নির্দেশনা প্রকাশ্যে আসেনি।
আ.দৈ/আরএস




















