দেশের অর্থনীতিতে ভরসা যোগাচ্ছে মাছের রেকর্ড উৎপাদন
শাহীন রহমান

চাষের মাছ উৎপাদনে বিশ্বে ৪র্থ, মিঠা পানির মাছে ২য়, ইলিশে এক নম্বর বাংলাদেশ; প্রোটিন নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় চালিকাশক্তি
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন এক শক্তিশালী খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে মৎস্য খাত। ধান ও পোশাক শিল্পের পর এখন খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে মাছ উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক সংস্থা খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এর সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশ এখন চাষের মাছ উৎপাদনে বিশ্বের চতুর্থ, মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে দ্বিতীয় এবং একক প্রজাতি হিসেবে ইলিশ উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম অবস্থানে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সাফল্য শুধু পরিসংখ্যান নয়; বরং দেশের প্রায় দুই কোটি মানুষের জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির গভীর পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি।
এফএও’র স্টেট অব দ্যা ওয়ার্ল্ড ফিশারিস এন্ড একুয়াকালচার প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে সফল অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি। দেশটি বিশ্বের মোট মিঠা পানির মাছ উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশ সরবরাহ করে এবং প্রায় ১১ শতাংশের বেশি অবদান রাখছে বৈশ্বিক ইনল্যান্ড ফিশ প্রোডাকশনে। নদী, খাল-বিল, হাওর এবং পুকুরভিত্তিক চাষ ব্যবস্থার মাধ্যমে এই উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে, চাষের মাছ বা অ্যাকুয়াকালচার খাতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। এই খাতে পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, রুই, কাতলা, মৃগেলসহ বিভিন্ন প্রজাতির বাণিজ্যিক চাষ ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে মোট মাছ উৎপাদন এখন প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ মেট্রিক টনের কাছাকাছি। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি আসে চাষের মাছ থেকে। গত দুই দশকে প্রযুক্তিনির্ভর হ্যাচারি, উন্নত পোনা উৎপাদন, বাণিজ্যিক ফিড শিল্প এবং আধুনিক চাষ পদ্ধতির কারণে এই উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ইলিশ আহরণে বিশ্বে শীর্ষ স্থানে রয়েছে। তেলাপিয়া উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ ও এশিয়ায় তৃতীয়।
এদিকে উৎপাদন বাড়াতে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ইলিশ, যাকে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ বলা হয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই বাংলাদেশে উৎপন্ন হয়। সাম্প্রতিক বছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন ৫.৫ থেকে ৬ লাখ মেট্রিক টনের মধ্যে রয়েছে। মৎস্য গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের কারণে ইলিশ সংরক্ষণে সাফল্য এলেও নদীদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রজনন এলাকায় চাপ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মাছ এখন শুধু খাদ্য নয়, একটি বিশাল অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরীণ মাছের বাজারের আকার বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। এই বাজারে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয় খুচরা, পাইকারি, পরিবহন, বরফকল, ফিড, হ্যাচারি ও রপ্তানি খাতে মিলিয়ে।
মাছের বাজারের এই বিশাল অর্থনীতি শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়, বরং গ্রামাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, যশোর, বগুড়া, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল অঞ্চলে মাছ চাষ এখন কৃষকের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস। অনেক পরিবার কৃষির পাশাপাশি মাছ চাষকেই প্রধান জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেছে। রপ্তানি খাতেও মৎস্য শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে চিংড়ি ও অন্যান্য সামুদ্রিক পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রপ্তানি বাজারে ওঠানামা দেখা গেছে, তবুও এই খাত এখনো দেশের কৃষিভিত্তিক রপ্তানির অন্যতম বড় অংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ, উন্নত জাতের মাছ উদ্ভাবন, সরকারি ও বেসরকারি খাতে হ্যাচারির বিস্তার, মাছের খাদ্য শিল্পের বিকাশ এবং গ্রামীণ পর্যায়ে চাষিদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা। মৎস্য গবেষকরা জানিয়েছেন, স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ৮০টিরও বেশি নতুন মাছের জাত ও চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। এর ফলে কম জমিতে বেশি উৎপাদন সম্ভব হয়েছে এবং একসময় অনিশ্চিত খোলা জলাশয়ের ওপর নির্ভরশীলতা কমে এসেছে।
তবে সাফল্যের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্যতা হ্রাস, জলদূষণ এবং অতিরিক্ত আহরণ কিছু প্রজাতির মাছের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে ইলিশের ক্ষেত্রে নদীপথে প্রজনন বাধাগ্রস্ত হওয়া একটি বড় উদ্বেগ। এছাড়া, দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়নের কারণে বহু জলাশয় দখল বা দূষণের শিকার হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মাছ উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।
মৎস্য অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বাজার ব্যবস্থাকে আরও সংগঠিত করা। তারা বলছেন, মাছের এই বিশাল বাজারকে যদি সঠিকভাবে আধুনিকীকরণ করা যায়, তাহলে এটি ভবিষ্যতে তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ এখন একটি “ফিশ-ডিপেনডেন্ট নিউট্রিশন ইকোনমি”-র দিকে এগোচ্ছে, যেখানে মানুষের প্রাণিজ প্রোটিনের বড় অংশই আসছে মাছ থেকে। গড়ে একজন বাংলাদেশি বছরে মাছ গ্রহণের হারও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
সামগ্রিকভাবে, পরিসংখ্যান বলছে বাংলাদেশের মৎস্য খাত এখন কেবল খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়, বরং একটি বিশাল শিল্পখাত, যার বাজার মূল্য এক লাখ কোটি টাকারও বেশি এবং যা দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের মাছ ও চিংড়ি খামারমালিকদের সংগঠন ফিশ ফার্ম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ফোয়াব) সভাপতি মোল্লা শামসুর রহমান শাহীন বলেন, চাষের মাছের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ‘বিপ্লব’ ঘটেছে। কিন্তু খামারিদের বিমার সুবিধা, উন্নত পোনা, মাছের ভালোমানের খাদ্য ও সহনীয় দামের ক্ষেত্রে সমস্যা আছে। এর পাশাপাশি উন্নত বাজার ব্যবস্থাপনাও একটি সংকট। যেগুলোতে নীতিসহায়তার অভাব আছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহফুজুল হক বলেন, সেই আশির দশক থেকেই চাষের মাছের ক্ষেত্রে তৎপরতা শুরু হয়েছিল। এখন সেখানে শিক্ষিত খামারিও এসেছেন অনেক। আবার উপজেলা ও জেলাপর্যায়ে মৎস্য অধিদপ্তরের যে কাঠামো তা অনেক দেশের নেই।
আ.দৈ/আরএস




















