রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হামে ৩, ডেঙ্গুতে ২ জনের মৃত্যু; আক্রান্তের সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী, জনস্বাস্থ্য নিয়ে শঙ্কা
হাম-ডেঙ্গুর যৌথ সংক্রমনে বাড়ছে উদ্বেগ
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, ৯:২২ পিএম   (ভিজিট : ৫৭)
X

দেশে একই সময়ে হাম ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চলতি মৌসুমে দুই রোগের বিস্তার এবং মৃত্যুর ঘটনা স্বাস্থ্য খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ২৪ ঘন্টায় হামে তিনজন এবং ডেঙ্গুতে দুইজনের মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে হাম ও ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৮৯টি শিশু। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে মোট ৫৯৬টি শিশুর। আর হামে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯৩টি শিশু প্রাণ হারিয়েছে। অর্থাৎ হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এই সময়ে মোট ৬৮৯টি শিশু মারা গেছে। এছাড়া, ২৪ ঘণ্টায় ৯৩টি শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে, আর হামের উপসর্গজনিত রোগীর সংখ্যা ৯৯৬। এই সময়ে ৯২১টি শিশু নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, আর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ৯১১টি শিশু।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৯৫ হাজার ৭৬০, আর নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১১ হাজার ৩৯০। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ৭৯ হাজার ৬৩৭ রোগী, যাদের মধ্যে ৭৫ হাজার ৮৮২ জন ছাড়পত্র পেয়ে ইতোমধ্যে বাড়ি ফিরেছে।

এদিকে দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও বেড়ে যাওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এক দিনের ব্যবধানে ডেঙ্গুতে আবারও মৃত্যু দেখল দেশ। বুধবার সকাল ৮টা থেকে আগের ২৪ ঘণ্টায় দুই ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ২২ ও ২১ জুন যথাক্রমে এক ও দুই ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, চলতি বছর এ পর্যন্ত ১২ ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে চলতি জুন মাসে। বাকি পাঁচজনের মধ্যে দুজন করে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে এবং একজন মারা যান মে মাসে। সর্বশেষ দুজনের মৃত্যু হয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগে। তাঁরা পুরুষ, বয়স ২১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। মারা যাওয়া ১২ ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ৫ জন নারী।

সাধারণত বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বর্ষা মৌসুমে। বিশেষ করে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। বৃষ্টির পানিতে জমে থাকা ছোট ছোট জলাধার এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অস্বাভাবিক আবহাওয়া, দীর্ঘ উষ্ণ সময় ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে ডেঙ্গুর মৌসুমি ধারা বদলে যাচ্ছে। এখন সংক্রমণ আগেভাগে শুরু হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে।

এদিকে বর্ষা মৌসুমে এডিস মশা নিধনে জাতীয় টাস্কফোর্স কমিটির মনিটরিং কার্যক্রম চলবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার,পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, ডেঙ্গু মশা নিধনে জাতীয় টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করেছে সরকার। এ কমিটি সিটি করপোরেশনসহ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করবে। পাশাপাশি ঢাকা শহরের বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও স্থাপনায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা তদারিক করবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের সংক্রমণ বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি। আক্রান্তদের অধিকাংশের মধ্যে জ্বর, শরীরে লালচে দানা, কাশি ও চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা দেরিতে হাসপাতালে আসায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

এদিকে বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গু পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও বিভিন্ন জেলা শহরে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। হাসপাতালগুলোতে জ্বর নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ডেঙ্গুর উপস্থিতি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। ইতোমধ্যে ডেঙ্গুতে দুইজনের মৃত্যুর খবর স্বাস্থ্য বিভাগ নিশ্চিত করেছে। আক্রান্তদের মধ্যে শিশু, নারী ও বয়স্ক নাগরিকও রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম ও ডেঙ্গু দুই রোগের প্রকৃতি ভিন্ন হলেও একসঙ্গে সংক্রমণ বৃদ্ধির ঘটনা স্বাস্থ্যসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে ডেঙ্গু ছড়ায় এডিস মশার কামড়ে। ফলে দুটি রোগ নিয়ন্ত্রণে আলাদা ধরনের প্রস্তুতি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন।

চিকিৎসকদের মতে, হাম প্রতিরোধে টিকাদান সবচেয়ে কার্যকর উপায়। দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নিয়মিত টিকা গ্রহণ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাম প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু অনেক এলাকায় টিকাদানে অনিয়ম, সচেতনতার অভাব কিংবা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা না নেওয়ার কারণে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, সাম্প্রতিক আক্রান্তদের একটি অংশের পূর্ণাঙ্গ টিকাদান ইতিহাস পাওয়া যায়নি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, হামকে সাধারণ জ্বর বা চর্মরোগ ভেবে অবহেলা করলে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং মস্তিষ্কের প্রদাহসহ নানা জটিলতার ঝুঁকি থাকে। শিশুদের ক্ষেত্রে এসব জটিলতা প্রাণঘাতী হতে পারে।

অন্যদিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুধুমাত্র হাসপাতালে চিকিৎসা বাড়িয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, নির্মাণাধীন ভবন এবং জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। তাই ব্যক্তি, পরিবার এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

রাজধানীর কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, গত কয়েক সপ্তাহে জ্বরজনিত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। অনেক রোগী প্রথমে সাধারণ ভাইরাল জ্বর মনে করে চিকিৎসা না নিয়ে পরে হাসপাতালে আসছেন। ফলে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসায় বিলম্ব হচ্ছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ, জ্বর তিন দিনের বেশি স্থায়ী হলে কিংবা শরীরে র‌্যাশ, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা রক্তক্ষরণের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাম ও ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। হাসপাতালগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে জনগণকে সতর্ক করা হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, ঘনবসতি, নগরায়ণ এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি সংক্রামক রোগ বিস্তারের অন্যতম কারণ। তারা বলছেন, রোগ দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে টিকাদান কর্মসূচির আওতা বৃদ্ধি এবং মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে কার্যকর করতে না পারলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হতে পারে।

দেশে বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই হাম ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বৃদ্ধির এই প্রবণতা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে আগামী সপ্তাহগুলোতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝