রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিএসএফের ‘পুশ-ইন’ কর্মকাণ্ডে সীমান্তজুড়ে আতঙ্ক
শূন্যরেখায় বাড়ছে মানবেতর জীবন
বাড়ছে অনিশ্চয়তা ও মানবিক সংকট
শাহীন রহমান
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, ৭:২৯ পিএম   (ভিজিট : ৮০)
X

দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক কথিত ‘পুশ-ইন’ কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাওয়ায় শূন্যরেখাজুড়ে তৈরি হয়েছে নতুন মানবিক সংকট। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ বহু মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। 

এতে সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ড বা শূন্যরেখায় দিনের পর দিন অনিশ্চয়তার মধ্যে অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও নিরাপত্তাহীনতায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন এসব মানুষ। সীমান্তে উত্তেজনা, স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক এবং দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এ ঘটনার সর্বশেষ সংযোজন নওগাঁর সাপাহার সীমান্ত। এই সীমান্ত দিয়ে নারী-শিশুসহ নয় জনকে পুশইনের চেষ্টা চালিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের তৎপরতায় বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেননি তার। এ অবস্থায় বর্তমানে শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন ওই নয় জন। বুধবার  ভোর ৪টার দিকে উপজেলার আদাতলা সীমান্তের ২৪৪/এমপি সীমান্ত পিলার এলাকা দিয়ে তাদের ঠেলে দেয়া হয়। বিকাল ৫টা পর্যন্ত প্রায় ১৩ ঘণ্টা তাদের সীমান্তের খোলা আকাশের নিচে শূন্যরেখায় অবস্থান করতে দেখা যায়। বর্তমানে তপ্ত রোদে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর অবস্থায় আছেন তারা।

বিজিবি সূত্র জানায়, গত কয়েক মাসে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে কথিত পুশ-ইনের ঘটনা বেড়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গভীর রাতে কিংবা ভোরের দিকে কয়েকজন থেকে শুরু করে দলবদ্ধভাবে মানুষকে সীমান্তের কাঁটাতারের কাছে এনে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ব্যক্তির পরিচয়, নাগরিকত্ব কিংবা বাংলাদেশে তাদের কোনো স্থায়ী ঠিকানা আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।

বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, মাসের শুরু থেকে বিএসএফের অন্তত ২১টি পুশ-ইনের চেষ্টা নস্যাৎ করা হয়েছে, যেখানে শিশুসহ দুই শতাধিক মানুষকে পুশ-ইন করার চেষ্টা চালানো হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির অধীনে প্রায় ৫,০০০ মানুষকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকারকর্মী ও সংস্থা তথ্য দিয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অবিলম্বে এই ধরনের বেআইনি পুশ-ইন প্রক্রিয়া বন্ধ করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সীমান্ত এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, হঠাৎ করেই অপরিচিত লোকজনকে সীমান্তের কাছে অবস্থান করতে দেখা যাচ্ছে। 

তাদের মধ্যে অনেক নারী ও শিশু রয়েছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, তারা দীর্ঘদিন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাস করছিলেন; আবার কেউ বলছেন, কাজের সন্ধানে সীমান্ত অতিক্রম করেছিলেন। তবে তাদের প্রকৃত পরিচয় যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।

নওগার পাতাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ভোররাত থেকেই সীমান্তে পুশ ইনের শিকার ৯ জন খোলা আকাশের নিচে রয়েছেন। খাবার বা পানি কিছুই তাদের সঙ্গে নেই। খুব মানবেতর অবস্থায় আছেন। তাদের সঙ্গে তিনটি শিশু আছে। তপ্ত রোদের মধ্যে এভাবে থাকলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই সীমান্ত সমস্যা যেন দ্রুত সমাধান করা হয়।’

সম্প্রতি সময়ে সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে পড়া মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশে প্রবেশের অনুমতি না পেয়ে এবং ভারতীয় অংশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় তারা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করতে বাধ্য হন। শিশুদের কান্না, বৃদ্ধদের অসুস্থতা এবং নারীদের নিরাপত্তাহীনতা সীমান্ত এলাকায় হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, মানবিক বিবেচনায় অনেক সময় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হলেও দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে একতরফাভাবে অন্য দেশে পাঠানো হলে তা আন্তর্জাতিক রীতি ও পারস্পরিক সমঝোতার পরিপন্থী হতে পারে। এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব যাচাই, পরিচয় নিশ্চিতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত বলে তারা মনে করেন।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, সীমান্তে আটকে পড়া মানুষের বিষয়টি শুধু নিরাপত্তা নয়, একই সঙ্গে মানবাধিকারের প্রশ্ন। 

যেসব নারী, শিশু ও পরিবার শূন্যরেখায় দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে, তারা চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। খাদ্যাভাব, অসুস্থতা, আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব এবং নিরাপত্তাহীনতা তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালা অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষের মর্যাদাপূর্ণ আচরণ পাওয়ার অধিকার রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।

সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা জানান, অতীতে বিচ্ছিন্নভাবে এমন ঘটনা ঘটলেও বর্তমানে এর মাত্রা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, পরিচয় যাচাই ছাড়া বড় সংখ্যায় মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করলে সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত নানা সমস্যা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়েও দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি উঠেছে।

তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে শূন্যরেখায় আটকে পড়া ব্যক্তিদের বিষয়ে মানবিক ও আইনসম্মত সমাধান নিশ্চিত করা হবে। অন্যথায় সীমান্তে মানবেতর জীবনযাপনের এই চিত্র আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। বর্তমানে সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানরত নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের দুর্দশা দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তাদের প্রশ্ন—রাষ্ট্রের সীমারেখার মাঝখানে আটকে পড়া এসব মানুষের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত কে নেবে?

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝