রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি দুর্বল ভবন ও অপরিকল্পিত নগরায়ন
ঢাকার দুয়ারে ভূমিকম্পের উৎস, বাড়ছে শঙ্কা
শাহীন রহমান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ৬:৫০ পিএম   (ভিজিট : ৭১)
X

সোমবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে ঢাকার কাছে নারায়ণগঞ্জ থেকে উৎপত্তি হওয়া ভুকিম্পের কেপে ওঠে দেশের বিভিন্ন এলাকা। ঢাকার অতি নিকট থেকে বারবারই মাঝাররি মাত্রার ভুকিম্পের উৎপত্তি হচ্ছে। ফলে বিশেষজ্ঞরা ঢাকার ঝুকির নিয়ে অনেকটাই চিন্তিত। 

তারা মনে করছেন  ঢাকা বিশেষভাবে মধুপুর ফল্টের কাছাকাছি অবস্থিত। গবেষকরা বলছেন, এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভে চাপ সঞ্চিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক কম্পনগুলো সেই চাপের কিছু অংশের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। আবার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ দেশের কিছু অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে নতুন বা সুপ্ত ফল্ট সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত থাকতে পারে।

ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের বড় শহরগুলোর তালিকায় বহুদিন ধরেই ঢাকার নাম উচ্চারিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যে কারণে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে, তা হলো ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বা উপকেন্দ্র রাজধানীর ক্রমশ কাছাকাছি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে নরসিংদীর মাধবদী ও ঘোড়াশাল অঞ্চলে সংঘটিত ভূমিকম্পগুলো ভূতত্ত্ববিদ ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তারা বলছেন, কেবল ভূমিকম্পের মাত্রা নয়, উপকেন্দ্রের অবস্থানও ঢাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দূরের বড় ভূমিকম্পের চেয়ে কাছের মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও রাজধানীতে ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।

গত কয়েক বছরে ঢাকাবাসী একাধিকবার মাঝারি মাত্রার কম্পন অনুভব করলেও ২০২৫ সালের নভেম্বরে নরসিংদীর মাধবদীকেন্দ্রিক ৫.৫ থেকে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উপকেন্দ্র ছিল ঢাকার অতি নিকটে। রাজধানীর বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে এত তীব্র কম্পন তারা অনুভব করেননি। ভবনে ফাটল, আতঙ্কে রাস্তায় নেমে আসা মানুষ এবং বিভিন্ন স্থানে আহত হওয়ার ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ঢাকা কি বড় ধরনের ভূমিকম্পের জন্য প্রস্তুত?

বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মধুপুর ফল্ট বা মধুপুর ভূ-চ্যুতি অঞ্চল। এই ফল্টের প্রভাববলয়ের খুব কাছেই অবস্থিত ঢাকা। দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভে সঞ্চিত টেকটোনিক চাপ ধীরে ধীরে জমা হচ্ছে বলে গবেষকরা মনে করেন। সাম্প্রতিক কম্পনগুলো সেই চাপের আংশিক বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকম্পকে সরাসরি ভবিষ্যৎ বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস বলা যায় না। তবু ঘন ঘন কম্পন এবং উপকেন্দ্রের নৈকট্যকে তারা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন।

ভূমিকম্প গবেষক অধ্যাপক হুমায়ুন আখতারের মতে, সাম্প্রতিক কম্পনগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে অঞ্চলের কিছু ফল্ট সক্রিয় রয়েছে এবং সেখানে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে। তবে এ নিয়ে অযথা আতঙ্ক নয়, বরং বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তুতি বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, দেশের ভূমিকম্প ঝুঁকির পেছনে রয়েছে ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং বার্মা টেকটোনিক প্লেটের জটিল আন্তঃক্রিয়া। ঢাকা একাধিক সক্রিয় ফল্ট ব্যবস্থার প্রভাব বলয়ের মধ্যে অবস্থান করছে। মধুপুর ফল্ট ছাড়াও ডাউকি ফল্ট এবং ইন্দো-বার্মা আর্ক অঞ্চলের ভূকম্পন ঢাকার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে রাজধানীকে একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ভূমিকম্প অঞ্চলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ভূগর্ভে নয়, ভূপৃষ্ঠে। অর্থাৎ ভূমিকম্পের চেয়ে বেশি ভয়াবহ হতে পারে দুর্বল অবকাঠামো। রাজধানীতে লক্ষাধিক ভবন নির্মিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে, যার বড় অংশ ভূমিকম্প-সহনশীল নকশা অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন, বিল্ডিং কোড অমান্য, অপরিকল্পিত উচ্চ ভবন এবং সংকীর্ণ সড়ক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তারা বলছেনব মধুপুর ফল্টে প্রায় ৬.৯ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে ঢাকার বিপুলসংখ্যক ভবন মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। সম্ভাব্য হতাহতের সংখ্যাও হতে পারে কয়েক লাখ। যদিও এটি একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতিভিত্তিক মডেল, তবুও বিশেষজ্ঞরা এটিকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনমনে আরেকটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ছোট ছোট কম্পন কি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস? 

এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে সতর্ক অবস্থান দেখা যায়। কিছু গবেষক মনে করেন, বড় কম্পনের পর একই অঞ্চলে ছোট ছোট কম্পন হওয়া স্বাভাবিক আফটারশক হতে পারে। আবার অন্যরা মনে করেন, দীর্ঘদিনের সঞ্চিত চাপের একটি অংশ ধীরে ধীরে মুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াও হতে পারে। তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই একমত যে বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে বড় ভূমিকম্পের নির্দিষ্ট সময় বা সম্ভাবনা নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব নয়।

নরসিংদী অঞ্চলে মূল ভূমিকম্পের পর একাধিক ক্ষুদ্র কম্পন রেকর্ড হওয়ায় বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে। ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিশেষজ্ঞরা অবশ্য জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর মাটিতে দেখা দেয়া কিছু ফাটল বা ধসকে প্রধান ফল্টের সক্রিয়তা বলে ভুল ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। অনেক ক্ষেত্রে জলাশয়ের আশপাশের আলগা মাটিতে তরলীকরণ বা লিকুইফ্যাকশনের কারণে এমন ঘটনা ঘটতে পারে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ভবন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা শনাক্ত করা, জরুরি উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো। ভূমিকম্প কবে হবে তা কেউ বলতে না পারলেও ক্ষয়ক্ষতি কতটা কমানো যাবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করছে বর্তমান প্রস্তুতির ওপর। এদিকে ঘন ঘন ভুমিকম্পের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন ফোরামগুলোতে অনেকেই সাম্প্রতিক কম্পনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। কেউ কেউ বলছেন, জীবনে এত ঘন ঘন কম্পন আগে অনুভব করেননি। আবার অনেকের মতে, আতঙ্কের চেয়ে প্রস্তুতির ওপর জোর দেওয়া উচিত।

বিশেষজ্ঞদের সামগ্রিক মূল্যায়ন হলো, ঢাকার কাছাকাছি ভূমিকম্পের উৎপত্তি বাড়তি সতর্কতার কারণ হলেও তাৎক্ষণিক আতঙ্কের নয়। তবে এটি একটি স্পষ্ট বার্তা—রাজধানীকে ভূমিকম্প-সহনশীল নগরীতে রূপান্তরের কাজ আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। কারণ প্রকৃত ঝুঁকি শুধু ভূগর্ভের ফল্ট লাইনে নয়, বরং কোটি মানুষের শহর ঢাকার দুর্বল ভবন, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং সীমিত দুর্যোগ প্রস্তুতিতেই লুকিয়ে আছে। আর সেই বাস্তবতায় একটি বড় ভূমিকম্পের আগেই প্রস্তুতির পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে।

আ.দৈ/আরএস





Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝