প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর ঘিরে বাড়ছে আগ্রহ
মালয়েশিয়া-চীন সফরে শ্রমবাজারের নতুন দিগন্তের প্রত্যাশা
শাহীন রহমান

এই সফওে মালয়েশিয়া ও চীনের সাথে সম্পর্কের গতি আরও বাড়বে, যার মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে জটিলতার অবসান ও বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর ক্ষেত্র তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ঘিরে দেশের কূটনৈতিক অঙ্গন, ব্যবসায়ী মহল এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আগামী ২১ ও ২২শে জুন মালয়েশিয়া সফর করবেন। এরপর ২৩শে জুন তিনি কুয়ালালামপুর থেকেই বেইজিং যাবেন এবং ২৬শে জুন ঢাকায় ফিরবেন। তার এই প্রথম সফরের গন্তব্য মালয়েশিয়া ও চীনকে ঘিরে ইতোমধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়গুলোকে সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে নতুন করে সচল ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ এই সফরের অন্যতম প্রধান অর্জন হতে পারে। অন্যদিকে চীন সফরে অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়ও গুরুত্ব পেতে পারে। এছাড়াও মালয়েশিয়া ও চীনের সাথে সম্পর্কের গতি আরও বাড়বে, যার মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে জটিলতার অবসান ও বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর ক্ষেত্র তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মালয়েশিয়া কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার। দেশটিতে কয়েক লাখ বাংলাদেশি বিভিন্ন খাতে কর্মরত রয়েছেন। নির্মাণ, উৎপাদন, কৃষি, সেবা এবং পাম অয়েল শিল্পে বাংলাদেশি শ্রমিকদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে গত কয়েক বছরে শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা জটিলতা, কোটা সংকট, নিয়োগে সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে এই বাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশ অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে শ্রমবাজারকে স্বাভাবিক ও টেকসই পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা এখন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে শ্রমবাজার ইস্যু অগ্রাধিকার পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা, নতুন শ্রমচুক্তি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
শ্রমবাজারের বর্তমান বাস্তবতা
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়। অনেক শ্রমিক বিদেশে যেতে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে বাধ্য হন। বিদেশে গিয়ে প্রত্যাশিত কাজ বা বেতন না পাওয়ার ঘটনাও রয়েছে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে কর্মীদের ভিসা জটিলতা, নিয়োগকর্তার চুক্তি লঙ্ঘন এবং আবাসন সমস্যা নিয়ে অভিযোগ পাওয়া যায়। শ্রম অধিকারকর্মীরা বলছেন, শুধু শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানো নয়, তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, সফরের সময় বাংলাদেশ যদি সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থার ওপর জোর দেয়, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং কর্মীদের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
অনিয়মিত কর্মীদের বৈধতার প্রশ্ন
মালয়েশিয়ায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি বিভিন্ন কারণে অনিয়মিত বা অবৈধ অবস্থায় রয়েছেন। তাদের অনেকেই কর্মসংস্থান হারানো, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া অথবা নিয়োগসংক্রান্ত জটিলতার কারণে আইনি সমস্যায় পড়েছেন। প্রবাসী বাংলাদেশি সংগঠনগুলো আশা করছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরে এসব কর্মীর বৈধতা প্রদান, জরিমানা কমানো কিংবা বিশেষ পুনর্বাসন কর্মসূচির বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হতে পারে। এতে হাজার হাজার বাংলাদেশি নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন।
দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বর্তমানে শুধু সাধারণ শ্রমিক নয়, দক্ষ ও কারিগরি কর্মীদের চাহিদাও বাড়ছে। শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে বৈদ্যুতিক, যান্ত্রিক, ওয়েল্ডিং, তথ্যপ্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে প্রশিক্ষিত জনবলের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ যদি দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে, তাহলে মালয়েশিয়ার পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী হবে। সফরে কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
চীন সফরে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য চীন সফরকে অর্থনৈতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগকেন্দ্রিক। বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের সঙ্গে নতুন শিল্পাঞ্চল, উৎপাদন খাত এবং প্রযুক্তি স্থানান্তর বিষয়ে সমঝোতা হলে দেশে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে চীনা বিনিয়োগ বাড়লে লাখো তরুণের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হবে। চীনের বিভিন্ন কারিগরি ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করার বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি তরুণরা আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবেন।
রেমিট্যান্স অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস রেমিট্যান্স। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি মালয়েশিয়া থেকেও প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসে। শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মী নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়তে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখতে নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি এবং বিদ্যমান বাজারগুলোকে কার্যকর রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সফরে শ্রমবাজার বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হলে দেশের অর্থনীতিতেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
কূটনৈতিক বার্তা
পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীনকে গুরুত্ব দেওয়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবধর্মী দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন। একদিকে শ্রমবাজার ও প্রবাসী স্বার্থ, অন্যদিকে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা দুই ক্ষেত্রেই সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে এই সফরের মাধ্যমে বার্তা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে শ্রমবাজার, বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক আরও গভীর করা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রত্যাশার কেন্দ্রে শ্রমবাজার
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে। নতুন কর্মী নিয়োগ, অভিবাসন ব্যয় কমানো, অনিয়মিত কর্মীদের বৈধতা এবং দক্ষ জনশক্তির জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি—এসব বিষয় সফরের সফলতার অন্যতম সূচক হিসেবে বিবেচিত হবে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে সফরটি শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর দেশ দুটির সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং সম্পর্কে নতুন গতি আনবে। দুই দেশেই সহযোগিতা বৃদ্ধির অনেক ক্ষেত্র আছে, যা প্রধানমন্ত্রীর সফরে গুরুত্ব পাবে। তার মতে, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে বাণিজ্য ও অর্থনীতিসহ অনেক বিষয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সাথেও সুসম্পর্কের জন্য দুই পক্ষকেই উদ্যোগী হতে হবে নিজ স্বার্থেই।
আঞ্চলিক রাজনীতির বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. ফরিদ হোসেন বলছেন, প্রথম সফরের জন্য মালয়েশিয়াকে বেছে নেয়া প্রধানমন্ত্রীর একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যা আঞ্চলিক রাজনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিনিয়োগ ও শ্রমবাজার বিষয়ে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আবার আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে দেশটির নিরপেক্ষ ভূমিকা রয়েছে।
পাশাপাশি চীন ও পশ্চিমাদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে দেশটির। আবার চীন বাংলাদেশে ভারতের তুলনায় বড় বিনিয়োগকারী। পাশাপাশি বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ রাজনৈতিক দল, এমনকি ছাত্র প্রতিনিধিদেরও চীন সফর করতে দেখছি নিয়মিত। পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণী পেশার সফর বিনিময় বেড়েছে। এসব কিছুই চীন সফরে যেতে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্বুদ্ধ করে থাকতে পারে।
আ.দৈ/আরএস




















