রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অঙ্গীভূত ৬৭২ নারী আনসার সদস্যের ভাগ্যে কালো ছায়া
ইসমাঈল হুসাইন ইমু
প্রকাশ: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ৮:১৫ পিএম   (ভিজিট : ১১৫)
X

অঙ্গীভূত ৬৭২ জন মহিলা আনসার সদস্যের চাকরি স্থায়ী ও নিয়মিতকরণের বিধিমালা বা গেজেট প্রকাশ হয়েছে প্রায় এক দশক আগে। গেজেট প্রকাশের তিন বছর পরে তাদের চাকরি স্থায়ীকরণে অফিস আদেশও জারি করে আনসার ও ভিডিপি। বিধিমালা লংঘন তো করছেই, একইসঙ্গে নিজেদের আদেশও আমলে নিচ্ছে না নিরাপত্তা বাহিনীটি। 

সংবিধান পরিপন্থি জেনেও অদৃশ্য কারণে ও কালো হাতের কারসাজিতে চিঠি চালাচালি করে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। করা হচ্ছে সময় ক্ষেপণ। সৃষ্টি করা হয়েছে বৈষম্যও। এই অবস্থায় চাকরির শেষ বয়সে এসে সরকার নির্দেশিত প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় এসব আনসার সদস্য মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না হলে প্রায় খালি হাতেই চাকরি থেকে বিদায় নিতে হবে তাদের। তাদের ভাগ্যে পড়েছে ভূতের আঁচড়। দপ্তরে দপ্তরে ধরনা দিয়েও কোনো সুরাহা পাচ্ছেন না তারা। বিষয়টির প্রতি সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা। 

সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অর্থকষ্ট থেকেই স্বচ্ছলতার আশায় বুক বেঁধে দৈনিক হাজিরা ভিত্তিতে ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে (আনসার ও ভিডিপি) যোগ দিয়েছিলেন ৬৭২ জন মহিলা। কম বেতন হলেও চাকরি করে আসছেন তারা। তাদের প্রত্যাশা ছিল চাকরি স্থায়ীকরণ হবে। বয়সও বেড়ে যাচ্ছে, চাকরি স্থায়ীকরণ হচ্ছে না। অবশেষে দীর্ঘ বছর পর তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের আগস্টে অঙ্গীভূত মহিলা আনসার সদস্যদের চাকরি স্থায়ীকরণ ও নিয়মিতকরণের গেজেট প্রকাশের জন্য অনাপত্তিপত্র দেয় অর্থমন্ত্রণালয়। এরপর সংশ্লিষ্ট সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ২০১৭ সালের ২৫ মে গেজেট জারি করে সরকার। গেজেটের বিধিমালা ২ এর উপবিধি ১-এ বলা হয়, অঙ্গীভূত মহিলা আনসারদের বেতন, ছুটি, পেনশন এবং আনুষঙ্গিক সুবিধাদি নির্ধারণের ক্ষেত্রে চাকরি স্থায়ী হবার পূর্বের চাকরিকাল গণনা করতে হবে। 

গেজেটের আলোকে আনসার ভিডিপি ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর ৬৭২ জন মহিলা আনসার সদস্যের চাকরি স্থায়ীকরণ ও নিয়মিতকরণ করে অফিস আদেশ জারি করে। এই আদেশে বলা হয়, বিধিমালা অনুযায়ী মহিলা আনসারদের চাকরিতে যোগদানের তারিখ থেকে স্বপদে চাকরিতে নিয়মিত ও স্থায়ীকরণ করা হলো। 

কিন্তু তাদের ভাগ্য অসহায়; গেজেট প্রকাশের প্রায় তিন বছর পরে তাদের চাকরি স্থায়ী ও নিয়মিত করার আদেশ জারি করা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এর এক বছর পরে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন অনুবিভাগ থেকে অঙ্গীভূত ৬৭২ জন মহিলা আনসারের বেতন নির্ধারণের মতামত দিয়ে একটি পত্র দেয় হিসাব মহানিয়ন্ত্রক বরাবর। গেজেট পরিপন্থি এই চিঠিতে ‘বেতন’ শব্দটি বাতিল করে ‘শুধু ছুটি, পেনশন ও আনুষঙ্গিক সুবিধাদি নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে’ বলে উল্লেখ করা হয়। এতে ১৮তম গ্রেড নির্ধারণেরও কথা বলা হয়। এর আগে তাদের চাকরি ২০১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রাজস্ব খাতে অস্থায়ীভাবে স্থানান্তর করা হয় বলেও উল্লেখ করা হয়।

উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ২০১৫ সালে জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট জারি করে সরকার। কিন্তু এই গেজেট প্রকাশের পর অর্থ মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর একটি পরিপত্র জারি করে। এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি রিট হয়। ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের রায়ে  গেজেট প্রকাশের পর পরিপত্র জারিকে সংবিধান পরিপন্থি বলে আদেশ দেয়া হয়। 

এবিষয়ে পরিবর্তনে আর কোনো মামলা না করারও নির্দেশনা দেয়া হয়। এছাড়া হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে অর্থ মন্ত্রণালয় সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছিল ২০২০ সালে। আপিল বিভাগ ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল এক আদেশে আপিলটি খারিজ করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে। সর্বোচ্চ আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে হিসাব মহানিয়ন্ত্রক ২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর একটি অফিস আদেশ জারি করে। এতে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেয়া হয়। 

এরপরেও ভাগ্য প্রসন্ন হয়নি ভুক্তভোগী অঙ্গীভূত মহিলা আনসরা সদস্যদের। পরবর্তীতে তারা ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর বেতন নির্ধারণের নির্দেশনা চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার কাছে আবেদনপত্র দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই বছরের ৩১ অক্টোবর একটি পত্র দেয় আনসার ভিডিপির ডিজির কাছে মতামত চেয়ে। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সংস্থাটি। 

এরপরেও কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব বিভাগ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং অঙ্গীভূত মহিলা আনসারদের বেতন বৈষম্য নিরসনের জন্য বেতন কাঠামো পদ্ধতি বা পৃষ্ঠাঙ্কন করে। এতে উল্লেখ করা হয়, অঙ্গীভূত মহিলা আনসার সদস্যরা চাকরিতে স্থায়ী ও নিয়মিতকরণের তারিখ অনুযায়ী বেতনসহ সব সুবিধা প্রাপ্য হবেন। কিন্তু এই চিঠিও আটকে আছে অদৃশ্য কারণে। জেলা কমান্ড্যান্টদের কাছে বেতন বাস্তবায়নের এই নির্দেশনা এখনো পাঠানো হয়নি বলে জানা গেছে। অথচ ২০১৯ সাল থেকে অন্তত ১০টি জেলার মহিলা আনসার সদস্যদের গোপনে বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে।

অভিযোগ করা হয়েছে, ইচ্ছাকৃত এই জটিলতার মূলে রয়েছেন আনসার ও ভিডিপির রেকর্ড শাখার পরিচালক নুরুল আমিন। তিনি আর্থিক ফায়দা লুটার জন্য চিঠিপত্র ধামাচাপা দিয়ে রাখছেন। সংস্থাটির ডিজিকেও ভুল বুঝিয়েছেন। এমনকি সংক্ষুব্ধ অঙ্গীভূত মহিলা আনসার সদস্যদের মধ্যে কিছু জেলার সদস্যদের চাকরি স্থায়ী করে বেতন নির্ধারণ করেছেন তিনি। একই সঙ্গের হয়েও কিছু আনসার সদস্যকে বেতন কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে এবং বেশিরভাগ বঞ্চিত রাখা হয়েছে- এ ধরণের দ্বিাচারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে তিনি এসব করছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। 

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আনসার ভিডিপি) মহাপরিচালকের (ডিজি) সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি সাক্ষাৎকার দেননি। ডিজির বরাতে সংস্থাটির সদর দপ্তরের গণসংযোগ কর্মকর্তা ও গণসংযোগ মুখপাত্র মো. আশিকুজ্জামান সাংবাদকিদের বলেন, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর গত ২০ মে অনুষ্ঠিত জাতীয় সমাবেশের সময় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সংস্থাটির সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের সংস্কারের প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। সেখানে অঙ্গীভূত মহিলা আনসার সদস্যদের বিষয়টিও উত্থাপন করা আছে। এই সংস্কার বাস্তবায়ন হলে তাদের বিষয়টিরও সমাধান হবে বলে আশা করেন তিনি। তবে নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝