সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৭ দিনে ২১ পুশ-ইনের চেষ্টা
বাঙালি মুসলমানদের জোর করে বাংলাদেশে পাঠানোর অভিযোগ সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
শাহীন রহমান
প্রকাশ: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ৭:৫৭ পিএম   (ভিজিট : ৬৭)
X

জুনের প্রথম দিন থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে একের পর এক কথিত পুশ-ইনের চেষ্টার ঘটনা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিজিবির হিসাব অনুযায়ী, ১ জুন থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত অন্তত ২১টি পৃথক ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বাংলাদেশে লোকজন ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে। 

এসব ঘটনায় নারী, শিশু ও পুরুষসহ দুই শতাধিক ব্যক্তিকে সীমান্ত অতিক্রম করিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে দাবি করেছে বিজিবি। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সীমান্তে অতিরিক্ত সতর্কতা ও টহলের কারণে এসব প্রচেষ্টা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।

সীমান্তে পুশ-ইনের অভিযোগ নতুন নয়। তবে একের পর এক ঘটনার ধারাবাহিকতা এবং অল্প সময়ে প্রচেষ্টার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি এবার নিরাপত্তা, কূটনীতি ও মানবাধিকার তিন ক্ষেত্রেই গুরুত্ব পেয়েছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরে এত ঘনঘন পুশ-ইনের অভিযোগ খুব কমই দেখা গেছে।

এদিকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে মূলত বাঙালি মুসলমানদের জোর করে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটি জানিয়েছে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, ঠেলে পাঠানো ওই ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ঢুকতে বাধা দিচ্ছে বাংলাদশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি)। এতে করে বহু পরিবার দুই দেশের সীমান্তের শূন্য রেখায় (জিরো লাইন) আটকা পড়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরও জানায়, তারা এমন নয়জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে, যারা দেখেছেন যে বিএসএফ রাতের অন্ধকারে লোকজনকে সীমান্তে এনে কাঁটাতারের বেড়ার কাটা অংশ দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। কয়েকটি ঘটনায় বিজিবি প্রবেশে বাধা দিলে বিএসএফ শেষ পর্যন্ত ওই ব্যক্তিদের আবার ফিরিয়ে নেয়।

বিজিবি সূত্রে জানা যায়, জুনের শুরুতেই যশোরের বেনাপোল সীমান্তে প্রথম আলোচিত ঘটনাটি ঘটে। সেখানে নারী ও শিশুসহ কয়েকজনকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। বিজিবির সদস্যরা সীমান্তে অবস্থান নিয়ে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে বাধা দেন। এরপর কয়েক দিনের ব্যবধানে কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর ও লালমনিরহাট সীমান্তে একই ধরনের আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুশ-ইনের জন্য আনা ব্যক্তিদের অধিকাংশই নিজেদের বাংলাদেশি বলে দাবি করতে পারেননি কিংবা তাদের পরিচয় যাচাইয়ের মতো কোনো কাগজপত্রও ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে তারা দীর্ঘদিন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে। ফলে তাদের প্রকৃত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।

এদিকে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যকে উল্লেখ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে যে বিজেপি সরকারের “ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট” নীতির আওতায় শত শত “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে” আটক করা হয়েছে এবং প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে “ফিরে যেতে” বাধ্য করা হয়েছে। 

সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের উপ-পরিচালক মীনাকশী গাঙ্গুলী বলেন, “মৌলিক মানবাধিকারকে উপেক্ষা করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নির্মমভাবে পরিবারগুলোকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে বা সীমান্তে আটকে রাখছে”। তিনি আরও বলেন যে ভারত সরকারের উচিত এই জোরপূর্বক বহিষ্কার বন্ধ করা, আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, নাগরিকত্ব যাচাইয়ে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা ও মুসলমানদের প্রতি বৈরিতাপূর্ণ আচরণ বন্ধ করা।

জুনের প্রথম সপ্তাহেই পরিস্থিতি নতুন মাত্রা পায়। বিজিবি জানায়, মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সাতটি সীমান্ত জেলার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ১০০ জনের বেশি মানুষকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা হয়েছে। এসব ব্যক্তির মধ্যে নারী ও শিশুদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত কার্যক্রমের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়।

সীমান্তের বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের আঁধার কিংবা ভোরবেলায় অধিকাংশ ঘটনা ঘটার চেষ্টা করা হয়েছে। অনেক সময় সীমান্তের শূন্যরেখার কাছাকাছি লোকজনকে রেখে যাওয়া হয়। পরে তারা বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা করে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় জনগণও বিজিবিকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছেন।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে ফেরত পাঠাতে হলে দুই দেশের মধ্যে স্বীকৃত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকত্ব যাচাই, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং কূটনৈতিক সমন্বয়ের মাধ্যমেই প্রত্যাবাসন সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু সীমান্তে সরাসরি লোকজনকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা আন্তর্জাতিক রীতিনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এদিকে জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে পুশ-ইন ইস্যু কূটনৈতিক পর্যায়েও গুরুত্ব পায়। দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করে। বিজিবি প্রতিনিধিদল সীমান্তে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ বন্ধ করার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে উভয় পক্ষ বিদ্যমান যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার বিষয়ে আলোচনা করে।

সীমান্ত বিশ্লেষকদের মতে, ১ জুন থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত ২১টি পুশ-ইন প্রচেষ্টার তথ্য শুধু সংখ্যাগত দিক থেকে নয়, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এসব ঘটনা এমন সময়ে ঘটছে যখন দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অবৈধ অভিবাসন এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চলছে।

সীমান্তে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে পুশ-ইন ইস্যু এখন কেবল সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি মানবাধিকার, কূটনীতি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। আগামী দিনে দুই দেশের আলোচনায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান করতে হলে উভয় দেশকেই স্বীকৃত আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। অন্যথায় সীমান্তে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে। আর সেই কারণে জুনের প্রথমার্ধে ঘটে যাওয়া ২১টি পুশ-ইনের প্রচেষ্টা শুধু একটি সীমান্ত ঘটনা নয়; বরং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝