রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অল্প সময়ে রায়, দ্রুত তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণে আশার আলো
গতি পাচ্ছে শিশু ধর্ষণ-হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম
শাহীন রহমান
প্রকাশ: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ৬:৩০ পিএম   (ভিজিট : ১০৫)
X

সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত শিশু নির্যাতন ও হত্যা মামলাগুলোতে তদন্ত সংস্থা, প্রসিকিউশন ও আদালতের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির ফলে বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত এগিয়েছে। বিশেষ করে জনমনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী মামলাগুলোতে প্রশাসনিক অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়টি দৃশ্যমান হয়েছে। আদালতগুলোও ধারাবাহিক শুনানির মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছেন।

বুধবার চট্টগ্রামের আলোচিত দুটি শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ২৬ দিনের মাথায় বাকলিয়ায় চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের মামলায় আসামি মনির হোসেনকে (৩০) যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। অপর ঘটনাটি প্রায় সাড়ে তিন বছর আগের। চট্টগ্রাম নগরে ৫ বছর বয়সী শিশু আলিনা ইসলাম আয়াতকে অপহরণ ও খুনের ঘটনায় আসামি মো. আবিরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

বুধবার দুপুরে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল (মহানগর) চট্টগ্রামের বিচারক সৈয়দা হাফসা ঝুমা বাকলিয়ার চার বছওে শিশু ধর্ষন মামলার এই রায় দেন। বিচার শুরু হওয়ার আট কার্যদিবসের মধ্যে ও মামলার ২৬ দিনের মাথায় এ রায় ঘোষণা করলেন আদালত। বেলা একটার দিকে ষষ্ঠ অতিরিক্ত চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ মুহাম্মদ আলী আক্কাস ৫ বছর বয়সী শিশু আলিনা ইসলাম আয়াতকে অপহরণ ও খুনের ঘটনায় মামলার রায় ঘোষণা করেন। 

এর আগে গত ৭ জুন শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। আদালত মামলাটি মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করে রায় দেন। প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এই নিয়ে মাত্র ১১ দিনের মাথায় দেশের তিনটি শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় রায় ঘোষণা করা হলো। অথচ আলোচিত এসব ঘটনায় বিচার পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।
 
দেশে শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা ও শিশু হত্যা মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যমান গতি এসেছে। কয়েকটি বহুল আলোচিত মামলায় অল্প সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন, দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল, স্বল্প সময়ে সাক্ষ্যগ্রহণ এবং রায় ঘোষণার ঘটনা বিচারপ্রার্থী পরিবারগুলোর মধ্যে নতুন আশা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে গত কয়েক সপ্তাহে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের আদালতে আলোচিত তিনটি মামলার রায়কে কেন্দ্র করে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বুধবার চট্টগ্রামের দুটি আলোচিত মামলার রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। এর আগে ঢাকায় শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দ্রুত রায় দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও বিচার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এসব রায় দেখিয়েছে যে রাষ্ট্র চাইলে নারী ও শিশু নির্যাতনের গুরুতর মামলাগুলোতে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, বিচ্ছিন্ন কয়েকটি মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নয়, বরং সব মামলায় একই ধরনের গতি ও মান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বাকলিয়ার চার বছর বয়সী এক শিশু ধর্ষণ মামলাটি বিশেষভাবে আলোচিত হয় বিচারিক কার্যক্রমের গতির কারণে। ঘটনার মাত্র ২৬ দিনের মধ্যে মামলার বিচার সম্পন্ন হয়ে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। অভিযোগপত্র দাখিলের পর অল্প সময়ের মধ্যেই সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করে আদালত রায় দেন। একই দিনে চট্টগ্রামের আরেক আলোচিত শিশু হত্যা মামলায়ও রায় ঘোষণা করা হয়। 

২০২২ সালে সংঘটিত পাঁচ বছর বয়সী শিশু আলিনা ইসলাম আয়াতের এই নির্মম হত্যাকাণ্ড দেশব্যাপী আলোড়ন তুলেছিল। অপহরণের পর শিশুটিকে হত্যা করে মরদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ করে আদালত এ রায় দেন। দীর্ঘদিন ধরে বিচারপ্রক্রিয়ার দিকে নজর ছিল সাধারণ মানুষের। অপর দিকে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকান্ড দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। যার রেশ এখনো শেষ হয়নি।  আইন অঙ্গনে মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। তদন্ত, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক সব ধাপ দ্রুত সম্পন্ন হওয়ায় এটি দেশের বিচারিক ইতিহাসে অন্যতম দ্রুত নিষ্পত্তিকৃত মামলার তালিকায় স্থান পায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত শিশু নির্যাতন ও হত্যা মামলাগুলোতে তদন্ত সংস্থা, প্রসিকিউশন ও আদালতের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির ফলে বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত এগিয়েছে। বিশেষ করে জনমনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী মামলাগুলোতে প্রশাসনিক অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়টি দৃশ্যমান হয়েছে। আদালতগুলোও ধারাবাহিক শুনানির মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম এবিষয়ে বলেন রায়ের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা মানুষের কাছে গেছে-অপরাধীকে শনাক্ত করে বিচার করা কোনো কঠিন কাজ নয়। দ্রুততম সময়ে অপরাধী চিহ্নিত ও বিচার হয়েছে। তিনি বলেন, তবে শুধু দ্রুত রায় দিলেই হবে না। বিচারপ্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপগুলোও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে। আপিল নিষ্পত্তি হতে কত সময় লাগবে, সেটাও নির্দিষ্ট থাকতে হবে।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফলাফল দিতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় কার্যকর মনিটরিং থাকতে হবে। এ ধরনের মামলার রায় দ্রুত কার্যকর হলে অপরাধীদের মধ্যে কিছুটা হলেও ভীতি তৈরি হতে পারে। তবে দেশের বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বিপুলসংখ্যক মামলার প্রতিও নজর দিতে হবে। শুধু আলোচিত মামলার বিচার নয়, বিচারপ্রত্যাশী সব মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

শিশু অধিকারকর্মীদের একাংশের মতে, দ্রুত বিচার অবশ্যই ইতিবাচক; কিন্তু তা যেন ন্যায়বিচারের মান ক্ষুন্ন না করে। তারা বলছেন, দ্রুততার পাশাপাশি তদন্তের গুণগত মান, ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষী সুরক্ষা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো ত্রুটি থাকলে উচ্চ আদালতে তা দীর্ঘসূত্রতায় পড়তে পারে।

আইন বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে এখনো বিপুলসংখ্যক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর শুনানি ঝুলে থাকে। ফলে সাম্প্রতিক কয়েকটি দ্রুত রায় ইতিবাচক বার্তা দিলেও বিচারব্যবস্থার সামগ্রিক চিত্র পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। তদন্ত কর্মকর্তার সংকট, ফরেনসিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, সাক্ষীর অনুপস্থিতি এবং মামলার জট এখনো বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে রয়ে গেছে।

সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আগ্রহ থাকলে অল্প সময়ে তদন্ত, বিচার ও রায় সম্ভব হয়। গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও তুলে ধরে-রাষ্ট্র চাইলে দ্রুত বিচার করা সম্ভব। এর ফলে পরোক্ষভাবে এমন প্রশ্নও সামনে আসছে, দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকা অসংখ্য মামলার নিষ্পত্তি কেন হচ্ছে না। আদালতে লাখ লাখ মামলা বছরের পর বছর ঝুলে আছে। অনেক ভুক্তভোগী মামলার চূড়ান্ত ফলাফল দেখার আগেই মারা যায়। ফলে অপরাধ করলে বিচার হবে সেটা অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে পড়ে। যখন বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায় তখন সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিচারব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি, ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় দ্রুত বিচারের পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। তাদের মতে, কেবল কঠোর শাস্তি নয়, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত নজরদারি বাড়ানো গেলে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা কমানো সম্ভব।

এদিকে সাম্প্রতিক রায়গুলোকে স্বাগত জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরাও। তাদের বক্তব্য, বিচার বিলম্বিত হলে অপরাধীরা উৎসাহ পায় এবং পরিবারগুলো দীর্ঘ মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে থাকে। দ্রুত বিচার অন্তত ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা জাগিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রামিসা, আয়াত এবং চট্টগ্রামের শিশু ধর্ষণ মামলার রায় দেশের বিচারব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। 

এসব মামলায় দেখা গেছে, প্রশাসনিক সদিচ্ছা, দক্ষ তদন্ত এবং ধারাবাহিক বিচারিক কার্যক্রম থাকলে গুরুতর অপরাধের বিচার অল্প সময়েও সম্পন্ন করা সম্ভব। এখন নজর থাকবে, এই গতি কেবল আলোচিত কয়েকটি মামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি নারী ও শিশু নির্যাতনের সব মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় একইভাবে প্রতিফলিত হয়। দেশের হাজারো বিচারপ্রার্থী পরিবার সেই উত্তরই খুঁজছে।

আ.দৈ/আরএস





Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝