ইরানের প্রত্যাবর্তন, বেলজিয়ামকে আটকাল মিসর, উরুগুয়ের গতি রুখল সৌদি আরব
ড্রয়ের রাতে জমে উঠল বিশ্বকাপ
শাহীন রহমান

ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে এক রাতে তিন ম্যাচ, আর তিনটিতেই ড্র। তবে ফলাফলের চেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল ম্যাচগুলোর নাটকীয়তা, লড়াই আর অঘটনের ইঙ্গিত। গ্রুপ ‘জি’-তে ইরান-নিউজিল্যান্ড ও বেলজিয়াম-মিসর ম্যাচ যেমন সমতায় শেষ হয়েছে, তেমনি গ্রুপ ‘এইচ’-এ শক্তিশালী উরুগুয়েকেও আটকে দিয়েছে সৌদি আরব। ফলে দুই গ্রুপের পয়েন্ট টেবিলে জমে উঠেছে প্রতিযোগিতা, আর শেষ ষোলোতে ওঠার লড়াই পেয়েছে নতুন মাত্রা।
সবচেয়ে নাটকীয় ম্যাচটি হয়েছে ইরান ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দেয় দুই দল। নিউজিল্যান্ড সুযোগ কাজে লাগিয়ে এগিয়ে গেলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ওশেনিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধিদের হাতে। কিন্তু ইরান হাল ছাড়েনি। মাঝমাঠে বল দখল ও দ্রুত পাল্টা আক্রমণের কৌশলে তারা ম্যাচে ফিরে আসে। এক পর্যায়ে দুই দলই জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠা ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ২-২ গোলের সমতা নিয়ে মাঠ ছাড়ে দুই দল। এই ড্রয়ে ইরান যেমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে, তেমনি নিউজিল্যান্ডও দেখিয়ে দিয়েছে তারা কেবল অংশগ্রহণ করতে আসেনি। বিশ্বকাপের মঞ্চে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তাদের আত্মবিশ্বাসী ফুটবল এখন অন্য দলগুলোর জন্যও সতর্কবার্তা। গ্রুপ ‘জি’-তে এখন প্রতিটি পয়েন্টই মূল্যবান হয়ে উঠেছে।
অন্য ম্যাচে বেলজিয়ামকে রীতিমতো চাপে ফেলেছে মিসর। ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে টুর্নামেন্টে এসেছিল বেলজিয়াম। কিন্তু মাঠের খেলায় সেই শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিফলন পুরোপুরি দেখা যায়নি। মিসর শুরু থেকেই শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ এবং দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকের ওপর ভর করে খেলেছে। আফ্রিকান দলটির সংগঠিত ফুটবল বেলজিয়ামের আক্রমণভাগকে বারবার হতাশ করেছে।
ম্যাচে উভয় দলই গোলের দেখা পেলেও শেষ পর্যন্ত কেউ কাউকে হারাতে পারেনি। ১-১ গোলের ড্রয়ে শেষ হওয়া ম্যাচে মিসরের খেলোয়াড়রা মাঠ ছেড়েছেন জয় না পেয়েও বিজয়ীর আত্মবিশ্বাস নিয়ে। অন্যদিকে বেলজিয়াম শিবিরে স্বস্তির চেয়ে হতাশাই বেশি। কারণ টুর্নামেন্টের শুরুতেই সম্ভাব্য দুই পয়েন্ট হারিয়ে ফেলেছে তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, মিসরের বিপক্ষে এই ড্র বেলজিয়ামের জন্য সতর্ক সংকেত। গ্রুপ পর্বে সামান্য ভুলও বড় মূল্য দাবি করতে পারে। আর মিসর প্রমাণ করেছে, তারা শুধু রক্ষণভাগে শক্ত নয়, সুযোগ পেলে বড় দলকে চমকে দেওয়ার সামর্থ্যও রাখে। গ্রুপ ‘এইচ’-এর ম্যাচেও দেখা গেছে একই চিত্র। সৌদি আরবের বিপক্ষে স্পষ্ট ফেবারিট ছিল উরুগুয়ে। দক্ষিণ আমেরিকার দলটি ম্যাচের অধিকাংশ সময় বলের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ফল আদায় করতে পারেনি। সৌদি আরব শুরু থেকেই ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। রক্ষণে শৃঙ্খলা, মাঝমাঠে পরিশ্রম এবং সুযোগ পেলেই দ্রুত আক্রমণে ওঠার পরিকল্পনা তাদের সাফল্য এনে দেয়।
ম্যাচটি ১-১ গোলে শেষ হলেও সৌদি আরবের জন্য এটি অনেকটা জয়ের সমান। কারণ বিশ্বকাপের অন্যতম অভিজ্ঞ ও শক্তিশালী দলের বিপক্ষে একটি পয়েন্ট অর্জন তাদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। উরুগুয়ের জন্য অবশ্য এই ফল কিছুটা হতাশার। জয়ের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামলেও শেষ পর্যন্ত পয়েন্ট ভাগাভাগি করেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে তাদের।
তিন ম্যাচের এই ড্রয়ের রাত বিশ্বকাপে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দিয়েছে—এখন আর কোনো দলকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। র্যাঙ্কিং, ইতিহাস কিংবা তারকাখচিত স্কোয়াড সবসময় ফল নির্ধারণ করে না। সঠিক পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলও বিশ্বমঞ্চে সমানতালে লড়াই করতে পারে। গ্রুপ ‘জি’-তে বেলজিয়াম, ইরান, মিসর ও নিউজিল্যান্ডের লড়াই এখন আরও উন্মুক্ত।
একইভাবে গ্রুপ ‘এইচ’-এ সৌদি আরব ও উরুগুয়ের ড্র স্পেন ও কেপ ভার্দের জন্যও নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। ফলে পরবর্তী ম্যাচগুলোতে প্রতিটি গোল, প্রতিটি পয়েন্ট এবং প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠবে অমূল্য। বিশ্বকাপের শুরুতেই অঘটনের ইঙ্গিত মিলেছে। আর সেই ইঙ্গিতই বলে দিচ্ছে, এবারের আসরে কোনো ম্যাচই আগে থেকে নির্ধারিত নয়। শক্তি ও সামর্থ্যের ব্যবধান যতই থাকুক, মাঠের ৯০ মিনিটেই লেখা হবে শেষ গল্প। সোমবারের তিন ড্র সেই গল্পেরই নতুন অধ্যায় যোগ করল।
আ.দৈ/আরএস




















