সেপ্টেম্বরে তফসিলের প্রস্তুতি
ইউপি দিয়ে শুরু হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন
শাহীন রহমান

জাতীয় নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। প্রচারণার ধরনে আসবে বড় পরিবর্তন। ডিজিটাল প্রচার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, উঠান বৈঠক এবং সরাসরি গণসংযোগের ওপর নির্ভরতা বাড়বে।
জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। এখন আইন বিধি সংশোধনের কাজ চলছে। তবে নির্বাচনের চ’ড়ান্ত প্রস্তুতির জন্য সরকার নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছে আইনে স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনার ভার ইসির উপর দেয়া হলেও মুলত স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ি কাজ করে ইসি। বিশেষ করে কোন নির্বাচন আগে হবে বা স্থানীয সরকার পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মেয়াদের বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে থাকে। এ কারণে জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয সরকার নির্বাচনের জন্য সরকারের সিদ্ধান্তের অপক্ষোয় রয়েছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে জানা গেছে আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে চূড়ান্ত প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশন সূত্র, নির্বাচন কমিশনারদের বক্তব্য এবং চলমান আইন ও বিধিমালা সংস্কার কার্যক্রমের তথ্য বিশ্লেষণে ইঙ্গিত মিলছে দীর্ঘ বিরতির পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন দিয়েই। যদিও কোন স্তরের নির্বাচন আগে হবে সে বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি, তবু কমিশনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ইউপিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
আগামী সেপ্টেম্বর অক্টোবর থেকে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে সংসদে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান। মির্জা ফখরুল বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাজেটের প্রাপ্যতার ওপর ভিত্তি করে পর্যায়ক্রমে এই নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হবে। এ ক্ষেত্রে প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে অন্যান্য স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন হবে। মির্জা ফখরুল বলেন, নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনসহ দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনও একই সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করা হবে।
জানা গেছে ইসি ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, আইন ও বিধিমালা সংশোধন, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, বাজেট এবং মাঠপর্যায়ের নির্বাচন ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। কমিশনের লক্ষ্য আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন এই পাঁচ স্তরের নির্বাচন ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা।
সূত্র জানিয়েছে ইসি থেকেও বর্ষাকাল শেষ হওয়ার পর নির্বাচন আয়োজনের জন্য অক্টোবরকে সবচেয়ে উপযোগী সময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে আগস্টে তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতিও চলছে। কমিশন চায় নতুন বিধিমালা ও আইনগত সংস্কারের কাজ শেষ করে একটি নতুন কাঠামোর অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে।
ইউপি দিয়েই শুরু হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সম্প্রতি বলেছেন, কোন নির্বাচন আগে হবে সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কমিশনের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সুষ্ঠু ও সংঘাতমুক্ত নির্বাচন আয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের সবচেয়ে বড় ভোটযজ্ঞ হলো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়নে নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে কমিশন মাঠপর্যায়ে নতুন নির্বাচনী ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করতে পারবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিত্বের শূন্যতা পূরণেও এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিভিন্ন জেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও ইউপি নির্বাচন আগে আয়োজনের পক্ষে মতামত পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
আসছে বড় ধরনের পরিবর্তন
এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু সময়সূচির কারণেই নয়, নির্বাচনী ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তনের কারণেও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ নির্দলীয় ভিত্তিতে। দলীয় প্রতীক ব্যবহার করা হবে না এবং সব প্রার্থী স্বতন্ত্র পরিচয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ২০১৫ সালের পর প্রথমবারের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচন আবার নির্দলীয় ধারায় ফিরছে।
এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। প্রচারণার ধরনে আসবে বড় পরিবর্তন। ডিজিটাল প্রচার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, উঠান বৈঠক এবং সরাসরি গণসংযোগের ওপর নির্ভরতা বাড়বে।
ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্তও প্রায় চূড়ান্ত। সব ভোট গ্রহণ হবে কাগুজে ব্যালটে। পাশাপাশি পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা বাতিল, অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ বন্ধ, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার এবং নির্বাচনী জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়েও কাজ করছে কমিশন।
সংঘাতমুক্ত নির্বাচনই প্রধান চ্যালেঞ্জ
স্থানীয় সরকার নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং সহিংসতাপ্রবণ নির্বাচন হিসেবে পরিচিত। অতীতের বহু নির্বাচনে প্রাণহানি, সংঘর্ষ ও কেন্দ্র দখলের ঘটনা ঘটেছে। এ কারণেই এবার সংঘাত কমানোকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সারা দেশে একদিনে নির্বাচন না করে ধাপে ধাপে ভোট আয়োজন করা হবে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বেশি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। আপাতত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা নেই বলেও কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এমপিদের প্রভাব কমানোর উদ্যোগ
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আরও স্বাধীন ও প্রতিযোগিতামূলক করতে সংসদ সদস্যদের প্রভাব সীমিত করার বিষয়টিও বিবেচনা করছে নির্বাচন কমিশন। বিশেষ করে উপজেলা পরিষদে এমপিদের প্রভাব ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের প্রেক্ষাপটে নতুন নীতিগত সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জানা গেছে।
আগস্টে তফসিল, অক্টোবরে ভোট?
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, জুন-জুলাইয়ের মধ্যে বিধিমালা সংশোধনের কাজ শেষ হলে আগস্টে প্রথম দফার তফসিল ঘোষণা করা সম্ভব হতে পারে। এরপর সেপ্টেম্বরের শেষ ভাগ অথবা অক্টোবর থেকে মাঠে ভোট শুরু হতে পারে। তবে আবহাওয়া, বন্যা পরিস্থিতি, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং আইনগত সংস্কারের অগ্রগতির ওপর চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ভর করবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনই হবে দেশের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক পরীক্ষা। নতুন নিয়ম, নির্দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পোস্টারবিহীন প্রচারণা এবং কাগুজে ব্যালটে ভোট সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। আর সেই অধ্যায়ের প্রথম পাতা খুলতে পারে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়েই।
আ.দৈ/আরএস




















