হামে বেড়েই চলেছে মৃত্যু
তিন মাসেও নিয়ন্ত্রণ না আসায় জনস্বাস্থ্য সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের
শাহীন রহমান

চলতি বছরের মার্চে প্রাদুর্ভাব ঘটার পর গত তিন মাসে হামে ও হাম সন্দেহে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ইতোমধ্যেই পৌনে এক লাখে পৌঁছেছে। সেইসঙ্গে, নিহতের সংখ্যা বেড়ে সাড়ে ছয়শ’ ছাড়িয়ে গেছে। দেশের হাম প্রাদুর্ভাব তিন মাস পার হলেও পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি সরকার।
প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে শত শত শিশু, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু একটি রোগের প্রাদুর্ভাব নয়; বরং জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, টিকা সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এবং সময়মতো জরুরি পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ার সম্মিলিত ফল।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া হামের বিস্তারে আক্রান্ত ও উপসর্গযুক্ত রোগীর সংখ্যা ইতোমধ্যে ৮৫ হাজার ছাড়িয়েছে। অধিকাংশ আক্রান্ত শিশু। বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য ভিড় বাড়লেও সংক্রমণের গতি কমছে না। তিন মাস ধরে চলা এই সংকট এখন দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. বে-নজির আহমেদ এ বিষয়ে বলেছেন, এত মৃত্যুর জন্য সরকারের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী। “সরকারের মিস ম্যানেজমেন্টের জন্যই এত মৃত্যু হয়েছে। যদি ম্যানেজমেন্টটা ভালো করা যেত, তাহলে এত মৃত্যু হতো না,” ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পরও হামকে মহামারি ঘোষণা করে সারা দেশে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারি না করাটা সরকারের একটা ‘বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল’ বলেও মনে করেন তিনি।
তবে অব্যবস্থাপনার কারণে হামে মৃত্যু বেড়েছে- এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। সেইসঙ্গে দাবি করেছেন, সরকার যথাসময়ে ব্যবস্থা নেয়ার কারণে হামে তুলনামূলক কম শিশু মারা গেছে। আমরা রাষ্ট্র ক্ষমতার দায়িত্ব নেয়ার ১৫ দিন পরেই হামের এটা শুরু হলো। আমরা যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নিতাম, তাহলে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু হতো বলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুহিত।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে টিকাদান কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের বিঘ্ন। বাংলাদেশ একসময় দক্ষিণ এশিয়ায় সফল টিকাদান কর্মসূচির উদাহরণ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু কোভিড-পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং সরবরাহ সংকট। ফলে হাজার হাজার শিশু নির্ধারিত সময়ে হামের টিকা পায়নি। বছরের পর বছর জমতে থাকা এই ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ বা রোগপ্রতিরোধ ঘাটতিই বর্তমান সংকটের ভিত্তি তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম এমন একটি সংক্রামক রোগ যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একজন আক্রান্ত শিশু থেকে একসঙ্গে বহু শিশু সংক্রমিত হতে পারে। তাই টিকাদানের হার সামান্য কমে গেলেও এর প্রভাব কয়েক বছর পর বড় আকারে দেখা দেয়। বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটি হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি; বরং বহুদিনের অব্যবস্থাপনার ফল এখন একযোগে দৃশ্যমান হচ্ছে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আক্রান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে এবং অতিরিক্ত টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়াও চলছে। কিন্তু বাস্তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। অনেক এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত টিকা পৌঁছেনি। কোথাও কোথাও স্বাস্থ্যকর্মীদের জনবল সংকট রয়েছে। আবার অনেক অভিভাবক জানেনই না কোথায় গিয়ে শিশুকে টিকা দিতে হবে। ফলে সংক্রমণ রোধের মূল অস্ত্র টিকাদান কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গত কয়েক বছরে কোনো বড় জাতীয় হাম টিকাদান অভিযান পরিচালিত হয়নি। কোভিড মহামারির সময় কর্মসূচি স্থগিত ছিল। পরবর্তীতে নতুন করে পূর্ণমাত্রার ক্যাম্পেইন শুরু করার পরিকল্পনা থাকলেও নানা কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। চলতি বছরের এপ্রিলেও একটি বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল বলে জানা যায়, কিন্তু সেটিও শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে যায়। এর ফলে ঝুঁকিতে থাকা লাখো শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যায়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো আক্রান্তদের বয়সের ধরণ। সাধারণত নয় মাস বয়সের পর শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে আক্রান্তদের একটি বড় অংশ এমন শিশু, যাদের বয়স টিকা গ্রহণের নির্ধারিত সময়েরও কম। অর্থাৎ পরিবার ও সমাজে সংক্রমণ এতটাই বিস্তৃত হয়েছে যে ছোট শিশুরাও নিরাপদ থাকছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি পরিস্থিতির ভয়াবহতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
এদিকে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হয়, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। পরবর্তীতে বাস্তবেও টিকার ঘাটতি দেখা দেয় এবং কয়েকটি নির্ধারিত কর্মসূচি পিছিয়ে যায়। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে প্রশাসনিক সমন্বয়ের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, সমালোচকরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
স্বাস্থ্য খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল অনেকটাই বিলম্বিত। মার্চে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করলেও এপ্রিল ও মে মাসের বড় অংশজুড়ে পরিস্থিতিকে স্থানীয় সমস্যা হিসেবেই দেখা হয়েছে। জাতীয় জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত গণটিকাদান কর্মসূচি চালু করা হলে হয়তো সংক্রমণের বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। কিন্তু সেই সুযোগ হারিয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন শুধু চিকিৎসা নয়, প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা কার্যক্রম। কারণ অনেক পরিবার এখনো হামকে সাধারণ জ্বর বা চর্মরোগ ভেবে অবহেলা করছে। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকা নিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্যও ছড়ানো হচ্ছে। ফলে কিছু এলাকায় টিকা গ্রহণে অনীহাও দেখা যাচ্ছে।
এ অবস্থায় জনস্বাস্থ্যবিদদের সুপারিশ হলো অবিলম্বে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ হাম টিকাদান অভিযান শুরু করা, পর্যাপ্ত টিকা আমদানি নিশ্চিত করা, ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যকর্মী মোতায়েন করা এবং প্রতিটি আক্রান্ত এলাকার জন্য পৃথক জরুরি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা। পাশাপাশি সংক্রমণ পর্যবেক্ষণের জন্য রিয়েল-টাইম ডেটা ব্যবস্থাও চালু করতে হবে।
তিন মাসের অভিজ্ঞতা বলছে, হাম পরিস্থিতি এখন আর কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একক চ্যালেঞ্জ নয়। এটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা যখন প্রতিদিন বাড়ছে এবং মৃত্যু থামছে না, তখন প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সফল টিকাদান কর্মসূচি কীভাবে এমন দুর্বল অবস্থায় পৌঁছাল? এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে। কারণ বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র এখনো টিকাই। আর সেই অস্ত্র সময়মতো ব্যবহার করতে না পারার মূল্য দিচ্ছে দেশের হাজার হাজার শিশু।
আ.দৈ/আরএস




















