ফুটবল বিশ্বকাপে বাড়ছে নাটকীয়তা
স্পোর্টস ডেস্ক

২-২ গোলের ড্রয়ে এক পয়েন্ট নিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু নেদারল্যান্ডস-জাপানের। সুইডেনের গোল উৎসব, শেষ মুহূর্তে আইভরি কোস্টের জয়, নাটকীয় ড্র। সাত গোলের ঝড়ে বিশ্বকাপ শুরু জার্মানির
ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে এক রাতেই দেখা মিলল তিন ভিন্ন গল্পের। কোথাও ছিল গোল উৎসব, কোথাও শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা, আবার কোথাও ছিল দুই শক্তিশালী দলের সমানে সমান লড়াই। নেদারল্যান্ডস ও জাপানের রোমাঞ্চকর ২-২ গোলের ড্র, ইকুয়েডরের বিপক্ষে আইভরি কোস্টের শেষ মুহূর্তের জয় এবং তিউনিসিয়াকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দেয়া সুইডেনের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে জমে উঠেছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
দিনের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচ ছিল গ্রুপ ‘এফ’-এর নেদারল্যান্ডস ও জাপানের মুখোমুখি লড়াই। শুরু থেকেই আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠে ম্যাচটি। বল দখলে এগিয়ে ছিল নেদারল্যান্ডস, কিন্তু দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণে বারবার ডাচ রক্ষণে চাপ তৈরি করে জাপান। দুই দলই দুইবার করে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত কেউই জয় তুলে নিতে পারেনি। ২-২ গোলের এই ড্রয়ে উভয় দলই এক পয়েন্ট নিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে। ম্যাচটিতে জাপানের শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছে, তেমনি নেদারল্যান্ডসও দেখিয়েছে কেন তারা এখনও ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল। যদিও ম্যাচ শেষে দুই শিবিরেই কিছুটা আক্ষেপ ছিল, তবু গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে হার এড়াতে পারায় সন্তুষ্ট থাকার কারণ রয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের কোচ ম্যাচ শেষে বলেন, বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে চাপ থাকাটা স্বাভাবিক, তবে তার দল পরের ম্যাচগুলোতে আরও কার্যকর ফুটবল খেলবে। অন্যদিকে জাপানের কোচও দলের লড়াকু মানসিকতার প্রশংসা করেন। তবে দিনের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তটি আসে গ্রুপ ‘ই’-এর আইভরি কোস্ট ও ইকুয়েডর ম্যাচে। পুরো ম্যাচজুড়ে দুই দলই গোলের সুযোগ তৈরি করলেও কোনো দলই জালের দেখা পাচ্ছিল না। মাঝমাঠে লড়াই, রক্ষণে দৃঢ়তা এবং গোলরক্ষকদের অসাধারণ সেভে ম্যাচটি যখন গোলশূন্য ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছিল, তখনই আসে নাটকীয় মোড়।
নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটে বদলি হিসেবে নামা তরুণ ফরোয়ার্ড আমাদ দিয়ালো ডি-বক্সের ভেতরে সুযোগ পেয়ে নিখুঁত শটে বল জালে পাঠিয়ে দেন। সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়ে আইভরি কোস্টের সমর্থকরা। ১-০ গোলের এই জয় শুধু তিন পয়েন্টই এনে দেয়নি, বরং গ্রুপে শক্ত অবস্থানও তৈরি করেছে আফ্রিকার প্রতিনিধিদের জন্য।
ম্যাচ শেষে দিয়ালো বলেন, বিশ্বকাপে দেশের জন্য গোল করা তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মুহূর্তগুলোর একটি। কোচও তার প্রশংসা করে বলেন, শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস ধরে রাখার ফলই এই জয়। অন্যদিকে ইকুয়েডরের জন্য এটি ছিল হতাশার এক সন্ধ্যা। পুরো ম্যাচে সমানতালে লড়াই করেও শেষ মুহূর্তে গোল হজম করে মাঠ ছাড়তে হয়েছে তাদের। ফলে পরের ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর চাপ বেড়ে গেল দক্ষিণ আমেরিকার দলটির ওপর। তবে রাতের সবচেয়ে একতরফা ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় গ্রুপ ‘এফ’-এ। সেখানে তিউনিসিয়াকে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত করে বিশ্বকাপে দুর্দান্ত সূচনা করেছে সুইডেন। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দলটি।
সুইডেনের আক্রমণভাগ ছিল অসাধারণ ছন্দে। ম্যাচের শুরুতেই গোল করে এগিয়ে যায় তারা। এরপর একের পর এক আক্রমণে তিউনিসিয়ার রক্ষণভাগকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। দলের হয়ে জোড়া গোল করেন মিডফিল্ডার ইয়াসিন আয়ারি। এছাড়া গোল করেন আলেকজান্ডার ইসাক, ভিক্টর গিওকেরেস এবং ম্যাটিয়াস স্বানবার্গ। তিউনিসিয়া একবার ব্যবধান কমালেও সেটি ম্যাচে ফেরার জন্য যথেষ্ট ছিল না। বরং দ্বিতীয়ার্ধে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে সুইডেন এবং শেষ পর্যন্ত ৫-১ গোলের বড় জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই এমন দাপুটে পারফরম্যান্সে সুইডেন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে তারা শুধু গ্রুপপর্ব পার হওয়ার জন্য নয়, আরও দূর যাওয়ার লক্ষ্য নিয়েই টুর্নামেন্টে এসেছে। দলের গতি, আক্রমণভাগের সমন্বয় এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ দেখে অনেক বিশ্লেষকই সুইডেনকে এবারের আসরের সম্ভাব্য চমক হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছেন।
এই তিন ম্যাচের ফলাফলে গ্রুপ ‘এফ’-এ সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে চলে গেছে সুইডেন। প্রথম ম্যাচেই বড় ব্যবধানে জয়ের কারণে গোল ব্যবধানেও এগিয়ে তারা। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডস ও জাপান এক পয়েন্ট করে নিয়ে পরবর্তী ম্যাচের অপেক্ষায়। তিউনিসিয়ার সামনে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর কঠিন চ্যালেঞ্জ। গ্রুপ ‘ই’-তে আইভরি কোস্টের জয় তাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। শেষ মুহূর্তের জয় অনেক সময় একটি দলের পুরো টুর্নামেন্টের গতিপথ বদলে দিতে পারে। একই সঙ্গে ইকুয়েডরের জন্য পরবর্তী ম্যাচগুলো হয়ে উঠেছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বকাপের প্রথম সপ্তাহেই ফুটবলপ্রেমীরা পেয়েছেন নাটকীয়তা, গোল এবং অনিশ্চয়তার স্বাদ। একদিকে সুইডেনের গোল উৎসব, অন্যদিকে আমাদ দিয়ালোর শেষ মুহূর্তের নায়কোচিত গোল এবং নেদারল্যান্ডস-জাপানের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ যে এবারও তার ঐতিহ্য ধরে রাখতে চলেছে, তার ইঙ্গিত মিলেছে স্পষ্টভাবেই। এখন দেখার বিষয়, গ্রুপপর্বের পরবর্তী ম্যাচগুলোতে এই দলগুলো নিজেদের অবস্থান কতটা শক্ত করতে পারে এবং কারা শেষ পর্যন্ত নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করে।
এদিকে আগের দিন রাত ১১টায় অনুষ্ঠিত খেলায় বিশ্বকাপের শুরুতেই নিজেদের শক্তিমত্তার ঘোষণা দিল জার্মানি। গ্রুপ ‘ই’-এর ম্যাচে তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষ কুরাসাওকে ৭-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত সূচনা করেছে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। একতরফা এই জয়ে শুধু পূর্ণ তিন পয়েন্টই নয়, গোল ব্যবধানেও বড় সুবিধা অর্জন করেছে জার্মানরা। ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে জার্মানি। বলের দখল, পাসিং এবং আক্রমণ গঠনে প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল ইউরোপের অন্যতম সফল দলটি। প্রথম গোল পাওয়ার পর তাদের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায় এবং একের পর এক আক্রমণে কুরাসাওর রক্ষণভাগকে বিপর্যস্ত করে তোলে।
বিশেষ করে মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের সমন্বয় ছিল চোখে পড়ার মতো। দ্রুতগতির আক্রমণ, নিখুঁত পাস এবং ফিনিশিংয়ে বারবার কুপোকাত হয় কুরাসাও। ম্যাচের বেশিরভাগ সময়ই নিজেদের অর্ধে রক্ষণ সামলাতে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে দলটিকে। জার্মানির হয়ে সবচেয়ে আলোচিত পারফরম্যান্স এসেছে তরুণ তারকা জামাল মুসিয়ালার কাছ থেকে। আক্রমণভাগে তার সৃজনশীলতা ও গতিময়তা কুরাসাওর রক্ষণে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করে। গোলের পাশাপাশি আক্রমণ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে দলের অন্যতম ভরসা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এই তরুণ ফুটবলার।
প্রথমার্ধেই একাধিক গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় জার্মানি। দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবধান আরও বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয় তারা। অন্যদিকে কুরাসাও একটি সান্ত্বনাসূচক গোল পেলেও ম্যাচে ফেরার মতো কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। জার্মান কোচ ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, টুর্নামেন্টের শুরুতে বড় জয় আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়, তবে সামনে আরও কঠিন প্রতিপক্ষ অপেক্ষা করছে। তাই এই জয়কে পুঁজি করে দলকে আরও উন্নতি করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, জার্মানির এই পারফরম্যান্স প্রতিপক্ষ দলগুলোর জন্যও একটি সতর্কবার্তা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে কিছুটা ওঠানামার মধ্য দিয়ে গেলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে তারা যে এখনও অন্যতম শক্তিশালী দল, সেটি আবারও প্রমাণ করল। এই জয়ের ফলে গ্রুপ ‘ই’-এর শীর্ষে উঠে এসেছে জার্মানি। একই সঙ্গে নকআউট পর্বে যাওয়ার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাও পেয়ে গেছে তারা। বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে গোল ব্যবধান অনেক সময় বড় ভূমিকা রাখে। সেই বিবেচনায় সাত গোলের এই জয় জার্মানির জন্য বাড়তি প্রাপ্তি।
তবে কোচিং স্টাফ ও খেলোয়াড়রা এখনই উচ্ছ্বসিত হতে চান না। কারণ সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন পরীক্ষা। গ্রুপের পরবর্তী ম্যাচগুলোতেই বোঝা যাবে এই দাপুটে সূচনা ধরে রাখতে পারে কি না জার্মানি। তবে প্রথম ম্যাচ শেষে একটি বিষয় পরিষ্কার শিরোপার লড়াইয়ে নিজেদের নাম আবারও জোরালোভাবে ঘোষণা করেছে জার্মানি। বিশ্বকাপের শুরুতেই সাত গোলের ঝড়ে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, এবারের আসরেও ট্রফির অন্যতম দাবিদার তারা।
আ.দৈ/আরএস




















