শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে হিংস্র দানবে পরিনত বেনজীর
দুদকের মামলায় সাবেক আইজিপি বেনজীর দুবাইয়ে গ্রেফতার, দেশে আনার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে !
আবুল কাশেম:

বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত প্রভাবশালী,ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি তাকে সন্তষ্ট করতে গিয়ে তৎকালীন আইজিপি বেনজীর আহমেদ হিংস্র দানবে পরিনত হয়ে ছিলেন।
অবশেষে দুদকের দুই মামলার আসামি এই হিংস্র মানব বেনজীর আহমেদকে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেফতার করেছে ওই দেশের পুলিশ। ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতারের জন্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির আদেশ দিয়েছিলেন ঢাকার একটি আদালত।
জানা যায়, পরে দুদকের ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ঢাকা কর্তৃক ইন্টারপোলে আবেদন করা হয়। ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল এ আবেদনটি পাঠানো হয়েছিল। ইন্টারপোল ২০২৫/২৩৯ নম্বর ফাইল ও ৫৭৪/২০২৫ কন্ট্রোল নম্বরের মাধ্যমে বেনজীর আহমেদের প্রতি রেড নোটিশ জারি করে। উক্ত রেড নোটিশের মাধ্যমে ইন্টারপোল কর্তৃক সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অনুরোধ জানান। অবশেষে তাকে গ্রেফতার করে গত ১২ জুন বাংলাদেশকে অবগত করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপি, জামায়াত, আলেম- ওলামা, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং সরকারি চাকরিজীবীসহ নানা শ্রেনি ও পেশার অসংখ্য মানুষকে ধরে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন করে মেরে লাশ পর্যন্ত গায়েব করে ফেলার অভিযোগ রয়েছে।
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি ছিলেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার ও র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্বপালন করেন।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র্যাবের ৭ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তারমধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল।
এছাড়াও অনেক ধনাঢ়্য ব্যক্তিদের ধরে নিয়ে তাদের স্থাবর ও স্থাবর সম্পদ লিখে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে অনেক সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক। এছাড়াও দেশের বাইরে দুবাই, আমেরিকাসহ অনেক দেশেই অর্থ পাচার করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত করছে দুদক।
এদিকে আজ রোববার (১৪ জুন) বিকেলে দুদকের মুখপাত্র ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দুদকের মামলায় ইন্টারপোলের সহযোগিতায় সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সাবেক আইজিপিকে গ্রেফতারের বিষয়টি দুবাইয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গত ১২ জুন এক চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশকে অবহিত করেছে ।
দুদক মুখপাত্র বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের একটি মামলায় আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। চার্জশিটে বেনজীর আহমেদের দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ৬ কোটি ৪৫ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৫ টাকার স্থাবর সম্পদ ও ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের ঘোষণা দেন। তবে দুদকের তদন্তে তার নামে ৭ কোটি ৫২ লাখ ৬৮ হাজার ৯৮৭ টাকার স্থাবর এবং ৮ কোটি ১৫ লাখ ৩১ হাজার ২৬৪ টাকার অস্থাবর সম্পদের সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়। এতে মোট ১৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের প্রমাণ মিলেছে।
তার বৈধ আয়ের উৎস হিসেবে পাওয়া গেছে ৬ কোটি ৫৯ লাখ ৪২ হাজার ৬৬৮ টাকা। ব্যয় বাদে নিট সঞ্চয় দাঁড়ায় ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৫৬ হাজার ৬৭৫ টাকা।ফলে বেনজীর আহমেদ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ১১ কোটি ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৬ টাকার সম্পদ অর্জন করেন। এই মামলাটি ঢাকায় বিশেষ জজ আদালতে বিচারিক কার্যক্রম চলছে।
আরেকটি মামলায় হলো; সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ সরকারি কর্মকর্তার পরিচয় গোপন করে সাধারণ নাগরিক হিসেবে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে পাসপোর্ট তৈরি করেছেন। দুদক এই দুই টি মামলায় তাকে গ্রেফতার করার জন্য দুদকের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতারের আবেদন জানানো হয়েছে। ওই আদেনের প্রেক্ষিতেই আইনী প্রক্রিয়ায় দুবাই পুলিশ বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতার করেছে।
দুদকের মুখপাত্র বলেন, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আরো ৪টি মামলা দায়ের করেছে দুদক। ওইসব মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। দুবাইয়ে গ্রেফতার বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ জানতে চাইলে, তিনি বলেন,দুদকের পক্ষ থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরও মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় বেনজীর আহমেদকে আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। এছাড়া এই বিষয়েটি নিয়ে সরকার ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে।
এদিকে বেনজীর আহমেদের বিষয়ে আজ রোববার (১৪ জুন) সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য,২০২৪ সালে ছাত্র জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের এক পর্যায়ে ওই বছর ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয়। এই গণঅভ্যুত্থানের কয়েক মাস আগে সাবেক বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা নিয়ে তদন্ত শুরু করে দুদক। তখনই তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশে পালিয়ে যান। এরপর তার বিরুদ্ধে দুদকের পক্ষ থেকে ৬টি মামলা দায়ের করা হয়। তার বিরুদ্ধে আদালত দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।
আ. দৈ./কাশেম




















