ফুটবল বিশ্বকাপ
শক্তিধর দলগুলোকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলছে কম আলোচিত দলগুলো
শাহীন রহমান

প্রথম দিকের ম্যাচগুলোই স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে এবারের আসরে বড় দলগুলোর জন্য পথ মোটেও সহজ হবে না
ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের শুরুতেই দেখা মিলছে চমক, উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার। ফুটবলবিশ্বের শক্তিধর দলগুলোকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলছে অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত দলগুলো। বিশ্বকাপের প্রথম দিকের ম্যাচগুলোই স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে এবারের আসরে বড় দলগুলোর জন্য পথ মোটেও সহজ হবে না। গত কয়েক বছরে এশিয়া, আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকার দলগুলো নিজেদের মান অনেক উন্নত করেছে। ফলে ব্রাজিল, জার্মানি, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স কিংবা ইংল্যান্ডের মতো ঐতিহ্যবাহী শক্তিগুলোকেও প্রতিটি ম্যাচে শতভাগ মনোযোগ দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ফুটবলে দলগত সংগঠন, শৃঙ্খলা এবং কৌশলগত পরিকল্পনা এখন ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মরক্কো ও অস্ট্রেলিয়ার পারফরম্যান্স সেই বাস্তবতারই প্রমাণ। বিশ্বকাপের মঞ্চে এখন আর কোনো ম্যাচকে সহজ বলা যায় না। ছোট দলগুলোর আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, আর বড় দলগুলোর ওপর চাপও আগের চেয়ে অনেক বেশি।
গ্রুপপর্বের শুরুতেই যে নাটকীয়তা ও চমকের দেখা মিলেছে, তাতে ফুটবলপ্রেমীরা আশা করছেন সামনের দিনগুলোতে আরও রোমাঞ্চকর লড়াই উপভোগ করবেন। বিশ্বকাপের প্রকৃত সৌন্দর্যই হলো অনিশ্চয়তা, আর এবারের আসর সেই অনিশ্চয়তাকে নতুন মাত্রা দিতে শুরু করেছে। ফেবারিটদের হোঁচট এবং আন্ডারডগদের সাহসী লড়াই বিশ্বকাপকে ইতোমধ্যেই করে তুলেছে আরও আকর্ষণীয় ও উপভোগ্য।
ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের শুরুতেই দেখা মিলছে চমক, উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার। ফুটবলবিশ্বের শক্তিধর দলগুলোকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলছে অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত দলগুলো। টুর্নামেন্টের সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে যেমন দেখা গেছে মরক্কোর দুর্দান্ত লড়াইয়ে ব্রাজিলের পয়েন্ট হারানো, তেমনি অস্ট্রেলিয়ার কাছে তুরস্কের অপ্রত্যাশিত পরাজয়। একই সঙ্গে স্কটল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ জয় এবং কাতার-সুইজারল্যান্ডের ড্র বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলেছে।
দিনের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচ ছিল ব্রাজিল ও মরক্কোর মধ্যকার লড়াই। কাগজে-কলমে ব্রাজিল ছিল স্পষ্ট ফেবারিট। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি আক্রমণভাগে তারকাসমৃদ্ধ খেলোয়াড়দের নিয়ে মাঠে নামলেও মরক্কো শুরু থেকেই ভয়ডরহীন ফুটবল খেলেছে। আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী এই দলটি বল দখলে পিছিয়ে থেকেও দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণে ব্রাজিলের রক্ষণকে বারবার বিপদে ফেলেছে। ম্যাচের এক পর্যায়ে মরক্কো গোল করে এগিয়ে গেলে পুরো স্টেডিয়াম স্তব্ধ হয়ে যায়। ব্রাজিল এরপর আক্রমণের গতি বাড়িয়ে সমতায় ফিরলেও জয়সূচক গোল আদায় করতে পারেনি।
ম্যাচজুড়ে মরক্কোর রক্ষণভাগ ছিল অসাধারণ সংগঠিত। ব্রাজিলের আক্রমণভাগের তারকাদের জন্য জায়গা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। মাঝমাঠেও মরক্কোর খেলোয়াড়রা শারীরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত শৃঙ্খলার দারুণ প্রদর্শন করেছেন। শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলের ড্র হলেও এই ফলকে মরক্কোর জন্য জয়ের সমান অর্জন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে ব্রাজিলের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা যে শুধুমাত্র তারকাখ্যাতি দিয়ে বিশ্বকাপ জেতা সম্ভব নয়।
অন্য ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া দেখিয়েছে অসাধারণ বাস্তববাদী ফুটবল। তুরস্কের বিপক্ষে ম্যাচে বলের নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণের সংখ্যা দুই ক্ষেত্রেই এগিয়ে ছিল ইউরোপীয় দলটি। কিন্তু গোলের সামনে কার্যকারিতার অভাব তাদের বড় মূল্য দিতে হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া রক্ষণে ছিল দৃঢ় এবং সুযোগ পেলেই দ্রুত আক্রমণে উঠে এসেছে। সেই কৌশল থেকেই দুটি গোল আদায় করে নেয় তারা। ২-০ গোলের এই জয় শুধু তিন পয়েন্টই এনে দেয়নি, বরং গ্রুপের বাকি দলগুলোর জন্যও একটি বার্তা দিয়েছে যে অস্ট্রেলিয়াকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
তুরস্কের জন্য অবশ্য এই হার হতাশার। দীর্ঘদিন পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে আসা দলটি সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। মাঝমাঠে ভালো খেললেও শেষ তৃতীয়াংশে সৃজনশীলতার অভাব ছিল স্পষ্ট। গোলের বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করেও সেগুলো কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। ফলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেও খালি হাতে মাঠ ছাড়তে হয়েছে।
এদিকে স্কটল্যান্ড তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে জয় দিয়ে। হাইতির বিপক্ষে ১-০ গোলের ব্যবধানে পাওয়া জয়টি সহজ ছিল না। ক্যারিবীয় দেশটি পুরো ম্যাচে লড়াকু মনোভাব দেখিয়েছে। তবে স্কটল্যান্ডের সংগঠিত রক্ষণ ও কার্যকর আক্রমণ শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয়। এই জয়ে স্কটিশরা গ্রুপের পরবর্তী ম্যাচগুলোর আগে আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে।
আরেক ম্যাচে স্বাগতিক অঞ্চলের প্রতিনিধি কাতার এবং ইউরোপের শক্তিশালী দল সুইজারল্যান্ড ১-১ গোলে ড্র করেছে। ম্যাচটি ছিল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। দুই দলই জয় পাওয়ার মতো সুযোগ তৈরি করেছিল। তবে গোলরক্ষকদের দক্ষতা এবং কিছু সুযোগ নষ্ট হওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত কোনো দলই পূর্ণ তিন পয়েন্ট পায়নি। এই ড্র গ্রুপের লড়াইকে আরও উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
এদিকে আগের দিন ১৩ জুনের খেলা ঘিরে বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনে ছিল ব্যাপক আগ্রহ। গ্রুপ ‘বি’-তে কানাডা ও বসনিয়া-হারজেগোভিনার ম্যাচটি শেষ হয়েছে ১-১ গোলের ড্রয়ে। দুই দলই বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করে একটি করে পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ে। ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে দেখা যায় উভয় দলকে।
কানাডা বলের দখল ও আক্রমণে কিছুটা এগিয়ে থাকলেও বসনিয়া-হারজেগোভিনা দ্রুত পাল্টা আক্রমণে বেশ কয়েকবার প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে চাপ সৃষ্টি করে। দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং দুই দলই গোলের সুযোগ তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত সমতায় সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এই ড্রয়ের ফলে গ্রুপ ‘বি’-এর লড়াই আরও জমে উঠে। স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রও দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দিয়ে প্যারাগুয়েকে ৪-১ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্টে নিজেদের শক্ত অবস্থানের জানান দেয়।
আ.দৈ/আরএস




















