হারা আসনের দায়িত্বে নারী এমপি
মাঠে সংগঠন গোছানোর নতুন কৌশলে বিএনপি
শাহীন রহমান

সংসদে সক্রিয় ভূমিকার পাশাপাশি নির্বাচনে পরাজিত আসনগুলোতে সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদারের দায়িত্ব; কেন্দ্রের নির্দেশনায় মাঠে নামছেন সংরক্ষিত নারী সদস্যরা
জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি মাঠের রাজনীতিতে নতুন ভূমিকা পাচ্ছেন বিএনপির সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যরা। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নারী এমপিদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করা হচ্ছে বিভিন্ন সংসদীয় এলাকায়। বিশেষ করে যেসব আসনে বিএনপি নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে বা সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে, সেসব এলাকায় নারী এমপিদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে দলটি।
দলীয় সূত্র বলছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে সংসদে বিএনপির অবস্থান আরও কার্যকর করা, অন্যদিকে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক নজরদারি ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মনে করছে, সংরক্ষিত নারী সদস্যদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি ও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাদের কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে সংসদকেন্দ্রিক বা আনুষ্ঠানিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে। নতুন দায়িত্ব বণ্টনের ফলে তারা সরাসরি মাঠপর্যায়ে দলীয় কার্যক্রম তদারকিতে ভূমিকা রাখতে পারবেন।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, সংসদীয় রাজনীতি এবং সাংগঠনিক রাজনীতির মধ্যে সমন্বয় তৈরির উদ্দেশ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্য, নির্বাচনে যেসব আসনে বিএনপি প্রত্যাশিত ফল পায়নি, সেখানে সাংগঠনিক দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ বিভক্তি কিংবা স্থানীয় পর্যায়ের সমন্বয়হীনতা ছিল কি না সেসব বিষয়ও পর্যবেক্ষণ করবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নারী এমপিরা।
পাশপাশি বিরোধী দলীয় এমপিদের এলাকায় উন্নয়নের তদারকির দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে নারী এমপিদের। এ বিষয়ে বুধবার সংসদেও প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দলের এমপি ঢাকা ১৪ আসনের মীর আহমাদ বিন কাসেম। তিনি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সরকার দলীয় নারী এমপিদের বিরোধী দলের এমপিদের এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তদারকি এবং জিও লেটার ইস্যুর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
তথ্য থেকে মনে হচ্ছে, তাদেরকে এই কাজ কি এইজন্য দেয়া হচ্ছে যাতে আমরা যারা বিরোধীদলীয় এমপি আছি, আমাদের এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আমাদের কোনো হাত থাকবে ননা? জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন,সরকার ও বিরোধী দল থেকে যেসব নারী সদস্যকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে, সংবিধানে বা আইনে নির্দিষ্টভাবে তাদের কোনো আসন নেই।”
সে কারণেই “খুব স্বাভাবিকভাবে আমাদের যে রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কাঠামো আছে, তার ভিত্তিতে দলীয় অবস্থান থেকে তাদের জন্য কিছু জায়গা নির্দিষ্ট করেছি যে তারা কোথায় কোথায় কাজ করবে।” যেহেতু এই সংসদ এই নারী নেতৃবৃন্দকে নির্বাচিত করেছে, সেহেতু খুব স্বাভাবিকভাবেই তাদেরও একইরকমভাবে হক আছে। সেই চিন্তা থেকেই “সরকারের নিয়ম অনুযায়ী আমরা খুব স্বাভাবিকভাবে” এগোচ্ছি বলে জানান তিনি।
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, এই পদক্ষেপ দলের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ। নারী সংসদ সদস্যরা এসব এলাকায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন এবং হাতছাড়া হওয়া আসনগুলোয় দলের জনসম্পর্ক নতুন করে গড়তে তারা সাহায্য করতে পারেন কি না, দল তা মূল্যায়ন করবে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত নারী এমপিদের নিয়মিত সংশ্লিষ্ট এলাকায় সফর করতে হবে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক, সাংগঠনিক কার্যক্রমের অগ্রগতি মূল্যায়ন, জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে নিয়মিত প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের বিভিন্ন সমস্যা, উন্নয়নসংক্রান্ত চাহিদা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করবেন তারা।
বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, “নারী এমপিদের দায়িত্ব শুধু সংসদের ভেতরে সীমাবদ্ধ রাখার চিন্তা থেকে দল বেরিয়ে এসেছে। তারা মাঠে গেলে সংগঠন উপকৃত হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় আমরা পিছিয়ে আছি, সেখানে নতুন উদ্যম তৈরি হবে।”
দলটির নেতারা বলছেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় দলীয় উপস্থিতি দৃশ্যমান রাখা জরুরি হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের পর স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনকে আরও গতিশীল করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এ কারণে সংরক্ষিত নারী এমপিদের একটি সমন্বয়মূলক ভূমিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা রয়েছে। বিএনপির ভেতরের কিছু নেতা মনে করছেন, নারী এমপিদের শুধু সাংগঠনিক তদারকির দায়িত্ব না দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগও তৈরি করা উচিত। অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনে পরাজিত আসনগুলোতে নতুন করে সাংগঠনিক শক্তি গড়ে তুলতে এই উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে সংরক্ষিত নারী সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। অনেক সময় তাদের ভূমিকা সংসদীয় কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। বিএনপির এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নারী এমপিরা সরাসরি মাঠপর্যায়ে কাজ করার সুযোগ পাবেন, যা দলীয় রাজনীতিতে তাদের প্রভাব ও অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে।
এ ছাড়াও নির্বাচনে পরাজিত আসনগুলোতে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের জন্য বিকল্প নেতৃত্ব ও সমন্বয় কাঠামো প্রয়োজন হয়। নারী এমপিদের সম্পৃক্ততা সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের সমন্বয় এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ধারাবাহিক তদারকির ওপর।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত নারী এমপিদের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনাও প্রস্তুত করা হচ্ছে। সেখানে সাংগঠনিক বৈঠকের সময়সূচি, জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি, স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং কেন্দ্রীয় দপ্তরে রিপোর্টিং ব্যবস্থার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক আসনের দায়িত্বও একজন নারী এমপিকে দেওয়া হতে পারে।
দলের নেতারা মনে করছেন, এই উদ্যোগের ফলে সংসদ ও মাঠ দুই ক্ষেত্রেই বিএনপির রাজনৈতিক কার্যক্রমে সমন্বয় বাড়বে। একই সঙ্গে নারী নেতৃত্বকে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এখন দেখার বিষয়, দায়িত্ব বণ্টনের এই নতুন কৌশল মাঠের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে এবং নির্বাচনে পিছিয়ে থাকা এলাকাগুলোতে বিএনপি কতটা সাংগঠনিক সুবিধা অর্জন করতে পারে।
আ.দৈ/আরএস




















