বিশেষ অভিযান কাজে আসছেনা
খুলনার অলিগলিতে মিলছে মাদক
ইসমাঈল হুসাইন ইমু

ইসমাঈল হুসাইন ইমু খুলনা থেকে ফিরে
শিল্প নগরী খুলনায় চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও সন্ত্রাস দমনে চলছে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান। গত তিনদিনে ২২২ জন অপরাধীকে বিভিন্নস্থান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে খুলনার অলিগলিতে মিলছে মরন নেশা ইয়াবা বিকিকিনি। বিশেষ করে টুটপাড়া, চানমারি, জিন্নাহপাড়া, মোল্লাপাড়া, মোক্তার হোসেন সড়ক, খালপাড়সহ আশাপাশের এলাকায় অনেকটা প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সব গলি পাহারা দেওয়া সম্ভব না।
তাছাড়া যেসব অলিগলিতে চিহ্নিত মাদক কারবারিদের আনাগোনা সেসব এলাকায় নিয়মিত টহল কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পুলিশ গলিতে ঢুকলে মাদক বিক্রেতারা পালাচ্ছে। আবার চলে গেলে প্রকাশ্যে আসছে। তবে মাঝেমধ্যে ধরাও পড়ছে এরা। কিন্তু শুধু পুলিশের পক্ষে মাদক কারবারি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না। এক্ষেত্রে স্থানীয়দের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
গত ৫ জুন বিকেল ৪টা। জিন্নাহপাড়া বৌ বাজারের সামনে ছোট একটি জটলা। ১২ থেকে ১৫ বছরের কিশোরদের একটি দল। প্রায় সবার হাতে দেশিয় অস্ত্র। প্রকাশ্যে মহড়া দিচ্ছে বাজারে। এটা সিনেমার মত মনে হলেও এটাই চলছে ওখানে। ওই দৃশ্য দেখে বাজারের বা স্থানীয় কোন বাসিন্দাদের মধ্যে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। কারণ হিসেবে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এটা দেখতে দেখতে তারা অভ্যস্ত। এসব কিশোরদের প্রতিবাদ করলে প্রাণও চলে যেতে পারে।
এ প্রসঙ্গে খুলনা মহানগর গোয়েন্দার একজন কর্মকর্তা জানান, তারাও জানেন কোন গলিতে কারা আড্ডা দেয়। কাদের কাছে অস্ত্র আছে। তবে স্থানীয়দের অসহযোগিতার কারণে এসব অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়না। তাছাড়া কাউকে আটক করলে অনেক সময় দেখা যায়, খুলনা সদর থানা বা লবনচরা থানার বাসিন্দা। আর জিন্নাহপাড়া হলো থানার সীমান্ত। থানা নির্ধারণ করতেই সময় চলে যায়। তবে অপরাধীদের গ্রেপ্তারে তৎপর আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ-কেএমপি সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ জুন থেকে খুলনায় বিশেষ অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৮৪ জন অপরাধী গ্রেপ্তার হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দিনে খুলনার বিভিন্নস্থান থেকে ৬৩ জন, দ্বিতীয় দিনে ৫৯ জন এবং তৃতীয় দিন শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১০০ জন গ্রেপ্তার হয়েছে।
গত ২৪ ঘন্টার বিশেষ অভিযানে খুলনা সদর থানায় ৩২ জন, খালিশপুর থানায় ১৮ জন, সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় ১৩ জন, লবণচরা থানায় ১৪ জন, হরিণটানা থানায় ৪ জন, দৌলতপুর থানায় ৫, আড়ংঘাটা থানায় ২ জন, খানজাহান আলী থানায় ১০ জন এবং গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) ২ জনকে গ্রেপ্তার করা করে। অভিযানকালে মদ, গাজা, ইয়াবার মত মাদক কারবারি, ছিঁচকে চোরসহ ছোটোখাটো অপরাধীরা ধরা পড়েছে।
জানা গেছে, ঢাক ঢোল পিটিয়ে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করায় অভিযানের আগাম খবর সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যাচ্ছে। ফলে সন্ত্রাসীদের আত্মগোপনে চলে যাওয়া খুবই সহজ হচ্ছে। সে কারণে এসব শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা যৌথ বাহিনীর অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার পর বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে অভিযান চালাচ্ছেন যৌথবাহিনীর সদস্যরা। কয়েকজন ছিঁচকে চোর ছাড়া বড় কোনো সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার করতে পারেনি তারা।
এই দুই থানার বিভিন্ন অলিগলিতে প্রতিদিন মাদকের হাট বসে। অভিযান শুরু হলে তাদের দেখা যায় না। কিন্তু শেষ হওয়ার সাথে সাথে তারা পুনরায় আবারও পয়েন্টগুলোতে এসে মাদক বিক্রি করে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় শেখপাড়া চামড়া পট্টি অভিযান চালায় পুলিশ। সেখানকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, তিন পুরিয়া গাঁজাসহ দু’জন আটক করা হয় সেখান থেকে। যারা বিক্রি করে তারা কেন গ্রেপ্তার হয় না। অভিযানের আগাম খবর পেয়ে মাদককারবারীরা স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়। রাত সাড়ে ৯টার কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে তারা আবারও কার্যক্রম শুরু করে।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব বাবুল হাওলাদার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা পুলিশের কাছে আছে। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারের নামে পুলিশ চুনোপুঁটিদের ধরছে। যেটা এক ধরনের আইওয়াশ। রাঘব বোয়াল ও অস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা ব্যর্থ হলে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, খুলনায় এক সময়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি ছিল। প্রকাশ্যে কুপিয়ে গুলি করে হত্যার ঘটনা ছিল নৈমিত্তিক। তবে ২০০৪ সালে র্যাব প্রতিষ্ঠার পর কিছুটা কমে যায় সন্ত্রাসীদের দাপট। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর আত্মগোপনে থাকা সন্ত্রাসীরা আবারো মাথাচড়া দিয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময় এসব সন্ত্রাসীরা দুটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ও মাদক কারবার চালিয়ে আসছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসব সন্ত্রাসীদের দাপট কমেনি বরং মাদক কারবার বেড়ে গেছে। অলিগলিতে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করায় নষ্ট হচ্ছে এখানকার উঠতি বয়সি তরুন যুবকরা।
কেএমপি কমিশনার মোহম্মাদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত বুধবার থেকে পুলিশ, র্যাব ও এপিবিএনের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী নগরীর বিভিন্নস্থানে অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত ২২২ জন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে। এদের মধ্যে সন্ত্রাসী লিটন, রিফাত, আযম খান, মিরাজ মৃধা, রাব্বিসহ আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। খুলনা শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় বাইরে থেকে সন্ত্রাসীরা এসে খুলনায় অপরাধমূলক কার্যক্রম করে চলে যাচ্ছে। সেগুলো প্রতিহত করার জন্য প্রবেশদ্বারে চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে। আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে অনেক সন্ত্রাসী কারাগার থেকে বের হচ্ছে। তাদের ওপরও নজরদারি রাখা হয়েছে। কোনো ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আ.দৈ/আরএস




















