সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নগরের শব্দ দুষণের নতুন উৎস এখন ই-রিকশা
শাহীন রহমান
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬, ৬:৩৬ পিএম   (ভিজিট : ১৮৯)
X

বিশেষজ্ঞরা বলছেন অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা কোনো মানসম্মত প্রকৌশল নকশা বা শব্দ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আওতায় তৈরি নয়। ফলে মোটরের কম্পন, ঢিলা বডি, নিম্নমানের যন্ত্রাংশ এবং অবৈধভাবে সংযোজিত ইলেকট্রনিক হর্ন মিলিয়ে বাস্তবে শব্দের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। এছাড়াও ই-রিকশাগুলোর লাগামহীন হর্ন ব্যবহার, হঠাৎ থেমে যাওয়া এবং একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক যান চলাচল শহরের পরিবেশকে অসহনীয় করে তুলছে

ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর থেকে শুরু করে দেশের ছোট-বড় প্রায় সব শহরেই এখন ব্যাটারিচালিত রিকশার দখল। পরিবেশবান্ধব ও স্বল্প ব্যয়ের এই যান একসময় নগর পরিবহনের বিকল্প সমাধান হিসেবে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। যাত্রী ও চালকদের কাছে সুবিধাজনক হলেও নগরবাসীর একটি বড় অংশ এখন অভিযোগ করছেন ব্যাটারিচালিত রিকশা নতুন ধরনের শব্দ দূষণের উৎস হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে উচ্চস্বরে হর্ন, বেপরোয়া সাউন্ড ডিভাইস, যান্ত্রিক কম্পন এবং অসংখ্য রিকশার একযোগে চলাচলে শহরের অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক পর্যন্ত সৃষ্টি হচ্ছে এক অস্বস্তিকর শব্দ পরিবেশ। গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, সমস্যাটি কেবল একটি যানবাহনের নয়; এটি দ্রুত বিস্তৃত হওয়া নগর শব্দ দূষণের নতুন মাত্রা।

মহানগরগুলোতে বিশেষ করে ঢাকা, সিলেট, রংপুর ও রাজশাহীতে চলাচল করা এসব রিকশার প্রভাব নিয়ে বেশ কয়েকটি গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। সিলেটে নগরে এর প্রভাব নিয়ে ‘ইমপ্যাক্ট অব সিম্পল আনরিলায়েবল টেকনোলজি ইন ট্রান্সপোর্ট: আ স্টাডি অন দ্য ব্যাটারি-ড্রিভেন রিকশাস ইন সিলেট সিটি’ শীর্ষক গবেষণা পরিচালনা করেন সালাউদ্দিন এম. নূর। তিনি ব্যাটারিচালিত রিকশাকে একটি সহজ কিন্তু নির্ভরযোগ্যতা-সংকটপূর্ণ প্রযুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কারণ, এটি স্বল্প খরচে মানুষের যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করলেও এর নকশা, নিরাপত্তা ও পরিচালনা ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানসম্মত নয়। অধিকাংশ রিকশা কোনো প্রকৌশল মানদণ্ড বা সরকারি অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করে তৈরি হয়নি। ফলে যান্ত্রিক ত্রুটি, ব্রেকের অকার্যকারিতা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার জনপ্রিয়তা মূলত নীতিগত পরিকল্পনার ফল নয়; বরং গণপরিবহনের ঘাটতি পূরণের জন্য বাজারনির্ভরভাবে এর বিস্তার ঘটেছে। ফলে এই খাতটি দীর্ঘদিন কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, নিবন্ধন ও মাননিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।

ঢাকা মহানগরে ব্যাটারীচালিত রিকশার প্রভাব নিয়ে গত বছর একটি গবেষণা পরিচালিত হয়। ‘ইলেক্ট্রিফায়েড লাইভলিহুডস অ্যান্ড আরবান টেনশনস আ সোশ্যাল স্টাডি অব ব্যাটারি-ড্রিভেন রিকশা পুলারস অ্যান্ড এভরিডে কনফ্লিক্ট ডায়নামিকস ইন ঢাকা সিটি’ শিরোনামে ওই গবেষণায় বলা হয় ব্যাটারিচালিত রিকশা নিম্নআয়ের মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি করেছে। নারী, বয়স্ক ও শহরতলির বাসিন্দাদের চলাচল সহজ করেছে। তবে অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, প্রশিক্ষণহীন চালক ও অনিরাপদ নকশার কারণে দুর্ঘটনা ঝুঁকি বেড়েছে। ট্রাফিক পুলিশ, চালক ও নগরবাসীর মধ্যে নানা ধরনের দ্বন্দ্ব ও সামাজিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গবেষক নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে নিবন্ধন, নিরাপত্তা মানদণ্ড ও চালক প্রশিক্ষণের সুপারিশ করেছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পরিবহনজনিত শব্দ দূষণ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি। দীর্ঘ সময় উচ্চমাত্রার শব্দের মধ্যে বসবাস করলে ঘুমের ব্যাঘাত, মানসিক চাপ, হৃদরোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং শিশুদের শিক্ষাগত ক্ষতি পর্যন্ত হতে পারে। ডঐঙ-এর পরিবেশগত শব্দ নির্দেশিকায় সড়ক পরিবহনের শব্দকে জনস্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের একটি বড় অংশ ভুল ধারণা এবং বাস্তব সমস্যার মিশ্রণ। কারণ বৈদ্যুতিক মোটরচালিত যানবাহন প্রচলিত পেট্রোল বা ডিজেলচালিত যানের তুলনায় প্রকৃতপক্ষে কম শব্দ উৎপন্ন করে। কিন্তু বাংলাদেশে চলাচলকারী অধিকাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা কোনো মানসম্মত প্রকৌশল নকশা বা শব্দ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আওতায় তৈরি নয়। ফলে মোটরের কম্পন, ঢিলা বডি, নিম্নমানের যন্ত্রাংশ এবং অবৈধভাবে সংযোজিত ইলেকট্রনিক হর্ন মিলিয়ে বাস্তবে শব্দের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, সমস্যার আরেকটি বড় কারণ হলো সংখ্যাগত বিস্ফোরণ। গত এক দশকে দেশের শহরগুলোতে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। রংপুরসহ বিভিন্ন শহর নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, গণপরিবহনের ঘাটতি পূরণে ই-রিকশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের ওপর এর নির্ভরতা ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু সেই সঙ্গে বাড়ছে যানজট, সড়কে বিশৃঙ্খলা এবং শব্দের ঘনত্বও।

শুধু গবেষক নন, সাধারণ নাগরিকদের অভিজ্ঞতাও একই ধরনের ইঙ্গিত দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন জনআলোচনায় মানুষ অভিযোগ করছেন, ই-রিকশাগুলোর লাগামহীন হর্ন ব্যবহার, হঠাৎ থেমে যাওয়া এবং একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক যান চলাচল শহরের পরিবেশকে অসহনীয় করে তুলছে। অনেকেই সরাসরি শব্দের চেয়ে চালনাগত বিশৃঙ্খলাকে বেশি দায়ী করেছেন, তবে শব্দ ও বিশৃঙ্খলা মিলেই নাগরিক অস্বস্তি বাড়ছে বলে মত দিয়েছেন।

পরিবেশবিদরা বলছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশাকে এককভাবে দায়ী করলে সমস্যার প্রকৃত কারণ আড়ালে থেকে যাবে। কারণ শহরের শব্দ দূষণের প্রধান উৎস এখনও মোটরযান, অবাধ হর্ন ব্যবহার, নির্মাণকাজ, লাউডস্পিকার এবং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ। তবে ব্যাটারিচালিত রিকশার দ্রুত বিস্তার এই বিদ্যমান সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে সরু সড়ক ও আবাসিক এলাকায় শত শত রিকশার একযোগে চলাচল মানুষের শ্রবণ আরাম ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাধান নিষেধাজ্ঞায় নয়; প্রয়োজন মান নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর নীতিমালা। তারা বলছেন, সব ব্যাটারিচালিত রিকশার জন্য বাধ্যতামূলক ফিটনেস পরীক্ষা, অনুমোদিত হর্ন ব্যবহার, শব্দমাত্রা পরীক্ষা, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একই সঙ্গে শহরভেদে নির্দিষ্ট রুট ও সংখ্যা নির্ধারণ করা জরুরি। অন্যথায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি হয়েও এই যানবাহন নগর জীবনের নতুন ভোগান্তির কারণ হয়ে থাকবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, শব্দ দূষণকে এখনও বাংলাদেশে অনেকেই তেমন গুরুত্ব দেন না। অথচ আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, দীর্ঘমেয়াদি শব্দ দূষণ শুধু বিরক্তির কারণ নয়; এটি নীরব ঘাতকের মতো কাজ করে। উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, উদ্বেগ, ঘুমের ব্যাঘাত এবং শিশুদের মনোযোগহীনতার সঙ্গে শব্দ দূষণের সম্পর্ক ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। তাই ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে শুধু যানবাহন নয়, বরং নাগরিক জীবনের মান ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।

নগরবাসীর প্রশ্ন এখন একটাই যে প্রযুক্তি পরিবেশ রক্ষার কথা বলে শহরে প্রবেশ করেছিল, তা কি যথাযথ নিয়ন্ত্রণের অভাবে নতুন ধরনের পরিবেশগত সংকটের জন্ম দিচ্ছে? উত্তর খুঁজতে হলে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক গবেষণা, কঠোর নজরদারি এবং নগর পরিবহন ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। নইলে নীরব মোটরের আড়ালে বাড়তেই থাকবে শব্দের অদৃশ্য দখলদারিত্ব।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝