রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সীমান্তে পুশ-ইন উত্তেজনা, মুখোমুখি বিজিবি-বিএসএফ
দিল্লিতে চার দিনের ডিজি পর্যায়ের বৈঠকে সমাধান মিলবে কি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬, ৭:৫৭ পিএম   (ভিজিট : ১০৫)
X

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সাম্প্রতিক পুশ-ইন ও পুশ-ব্যাক উত্তেজনার মধ্যেই নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে বিজিবি ও বিএসএফের ৫৭তম মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন। চার দিনব্যাপী এই বৈঠকে সীমান্ত হত্যা, কথিত অবৈধ পুশ-ইন, অনুপ্রবেশ, কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানসহ একাধিক স্পর্শকাতর বিষয় আলোচনায় আসছে। 

তবে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সম্মেলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সীমান্তে মানুষ ঠেলে দেয়া বা ‘পুশ-ইন’ ইস্যু, যা গত কয়েক সপ্তাহে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে একাধিক স্থানে কার্যত মুখোমুখি অবস্থানে নিয়ে গেছে। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সীমান্তে অবৈধ পুশ-ইন, সীমান্ত হত্যা এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ইস্যু দিল্লির বৈঠকে অগ্রাধিকার পাবে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, বিজিবি সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং অবৈধভাবে কাউকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা হলে তা প্রতিরোধ করা হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। 

বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঝিনাইদহ এবং সিলেট সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে বিএসএফের বিরুদ্ধে লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় বিজিবি বাধা দিলে কয়েকটি এলাকায় দুই বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। কিছু ক্ষেত্রে পতাকা বৈঠকও ফলপ্রসূ হয়নি এবং সীমান্তের শূন্যরেখায় নারী-শিশুসহ কয়েকজনকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকার ঘটনাও ঘটে।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে ঠাকুরগাঁও সীমান্তে। সেখানে ৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে শূন্যরেখায় আটকে থাকা ১১ জনকে শেষ পর্যন্ত বিএসএফ নিজেদের ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয় বলে জানা গেছে। ওই দলে একজন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ও তার অন্তঃসত্ত্বা মাও ছিলেন। সীমান্তে দীর্ঘ অচলাবস্থার পর ঘটনাটি দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রতীকী উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে অবশ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তাদের দাবি, সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় অবস্থানরত অনেক ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিক এবং তাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের কিছু রাজনৈতিক নেতা দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে হাজার হাজার অবৈধ অভিবাসীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং আরও অনেকে হোল্ডিং সেন্টারে রয়েছে।

বাংলাদেশ অবশ্য এ ধরনের একতরফা পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে। ঢাকা বলছে, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নির্ধারণ এবং প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন, বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রটোকল ও যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। কাউকে সীমান্তে এনে জোরপূর্বক ঠেলে দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়। 

দিল্লির বৈঠকে সীমান্ত হত্যার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করছে বাংলাদেশ। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে ৩৪ বাংলাদেশি নিহত হন, যা আগের কয়েক বছরের তুলনায় বেশি। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩০ এবং ২০২৩ সালে ৩১। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছে।

এবারের বৈঠকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সীমান্তে নজরদারির জন্য ভারতীয় ড্রোন ব্যবহারের প্রশ্ন। বাংলাদেশ এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বিজিবির মতে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। 

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এই ৫৭তম ডিজি পর্যায়ের সম্মেলনে বাংলাদেশের ১৫ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। ভারতের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার। দুই দেশের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরাও বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। 

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সম্মেলন শুধু নিয়মিত সীমান্ত বৈঠক নয়; বরং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে তৈরি হওয়া অবিশ্বাস ও উত্তেজনা নিরসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। পুশ-ইন, সীমান্ত হত্যা, কাঁটাতারের বেড়া, অনুপ্রবেশ এবং সীমান্তে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে চলমান বিরোধের সমাধানে কোনো কার্যকর অগ্রগতি না এলে দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে।

তবে কূটনৈতিক মহল মনে করছে, দীর্ঘদিনের সীমান্ত সহযোগিতার অভিজ্ঞতা এবং বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কারণে উভয় দেশ শেষ পর্যন্ত আলোচনার পথেই সমাধান খুঁজবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দিল্লির এই বৈঠককে আগামী দিনের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝