চালু হচ্ছে ডিসেম্বরে, দৈনিক মিলবে ৫০ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পনি
ঢাকা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাবে গন্ধর্বপুর শোধনাগার প্রকল্প
শাহীন রহমান

রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের পানিসংকট নিরসন এবং নিরাপদ পানির টেকসই উৎস নিশ্চিত করতে দেশের অন্যতম বৃহৎ পানি অবকাঠামো প্রকল্প গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার এখন উৎপাদনে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে। আগামী ডিসেম্বর নাগাদ এই প্রকল্প চালু হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নির্মিত এই প্রকল্প চালু হলে প্রতিদিন ৫০ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি ঢাকার সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হবে। এতে রাজধানীর প্রায় ৪৫ লাখ মানুষের পানির চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে বলে আশা করছে ঢাকা ওয়াসা। একই সঙ্গে বহু বছর ধরে চলতে থাকা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে একনেকে পাশ হওয়া প্রকল্পটির প্রথমে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। সংশোধিত ব্যয় বাড়িয়ে ৮ হাজার ১৫১ কোটি টাকায় করা হয়। এ প্রকল্পটির মেয়াদকাল ২০২২ এর জুন মাস পর্যন্ত করা হয়েছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণসহ নানা জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ হয়নি।
যে কারনে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের ৯৭ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আগামী এক বছরের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পুর্ণ চালু করা সম্ভব হবে।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: আমিনুল ইসলাম বলেন, গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগারের প্রথম ধাপে প্রতিদিন ৫০ কোটি লিটার পানি রাজধানীতে সরবরাহ করা হবে। দ্বিতীয় ধাপের কাজ সম্পন্ন হলে আরও ৫০ কোটি লিটার পানি প্রকল্পে যুক্ত হবে। ফলে দুই ধাপ মিলিয়ে প্রকল্পটির দৈনিক পানি সরবরাহ সক্ষমতা দাঁড়াবে ১০০ কোটি লিটারে, যা রাজধানীর ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
রাজধানীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, নগরায়ণ এবং শিল্পায়নের ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে পানির চাহিদা। কিন্তু সেই তুলনায় নিরাপদ পানির উৎস বাড়ানো সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার পানির সিংহভাগ সরবরাহ করা হচ্ছে গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ স্তর থেকে পানি উত্তোলন করে। এতে প্রতিবছরই নিচে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে রাজধানীকে আরও বড় পানি সংকটের মুখোমুখি হতে হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে মেঘনা নদীর পানি শোধন করে রাজধানীতে সরবরাহের লক্ষ্যে গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্প হাতে নেয়া হয়।
প্রকল্পের আওতায় নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার বিষনন্দী এলাকায় মেঘনা নদীতে একটি আধুনিক পানি গ্রহণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে পানি বিশেষ পাইপলাইনের মাধ্যমে রূপগঞ্জের গন্ধর্বপুরে নিয়ে আসা হবে। এরপর অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে পানি শোধন করে তা রাজধানীর বিতরণ ব্যবস্থায় সরবরাহ করা হবে। প্রকল্পের অংশ হিসেবে নির্মিত হয়েছে পানি পরিবহন দীর্ঘ পাইপলাইন, বিশাল শোধনাগার, পাম্পিং স্টেশন এবং ট্রান্সমিশন অবকাঠামো।
ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তারা বলছেন, গন্ধর্বপুর প্রকল্প শুধু একটি নতুন পানি শোধনাগার নয়; এটি রাজধানীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থার একটি কৌশলগত পরিবর্তনের অংশ। গত এক দশকে ওয়াসা ধাপে ধাপে ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে নদীর পানি শোধনের মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর আগে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার রাজধানীর পানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও বর্তমান চাহিদা পূরণে আরও বড় সক্ষমতার প্রকল্পের প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজন থেকেই গন্ধর্বপুর প্রকল্পের বাস্তবায়ন।
পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উদ্বেগজনক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর অনেক এলাকায় প্রতি বছর দুই থেকে তিন মিটার পর্যন্ত পানির স্তর হ্রাস পাচ্ছে। ফলে নতুন নলকূপ স্থাপন এবং বিদ্যমান নলকূপ সচল রাখতে ব্যয়ও বাড়ছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে পরিবেশগত ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প হিসেবে নদীর পানি ব্যবহার ছাড়া কার্যকর কোনো পথ নেই।
তবে নদীর পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দূষণ। রাজধানীর আশপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানিদূষণ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে এসব নদীর পানি সরাসরি শোধন করে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এজন্য তুলনামূলকভাবে কম দূষিত এবং পর্যাপ্ত প্রবাহসম্পন্ন মেঘনা নদীকে পানির উৎস হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতের জন্য এটি একটি বাস্তবসম্মত ও টেকসই সিদ্ধান্ত। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগারের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন লিটার। তবে ভবিষ্যতে দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এর উৎপাদন ক্ষমতা আরও বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে আগামী কয়েক দশকের পানি চাহিদা মোকাবিলার ক্ষেত্রেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
অর্থায়নের ক্ষেত্রেও এটি একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতাভিত্তিক প্রকল্প। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এবং ফ্রান্সের উন্নয়ন সংস্থা এজেন্স ফ্রান্সেজ দ্য ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদার প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার নগর পানি ব্যবস্থাপনায় একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু পানি উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; সরবরাহ ব্যবস্থায় অপচয় কমানো এবং বিতরণ নেটওয়ার্কের আধুনিকায়নও জরুরি। বর্তমানে উৎপাদিত পানির একটি অংশ বিভিন্ন কারণে নষ্ট হয় বা গ্রাহকের কাছে পৌঁছায় না। তাই গন্ধর্বপুর প্রকল্প থেকে উৎপাদিত পানি সর্বোচ্চ দক্ষতার সঙ্গে বিতরণ নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এদিকে রাজধানীবাসীর প্রত্যাশা, নতুন এই প্রকল্প চালু হলে পানির চাপ কমে যাওয়া, সরবরাহে অনিয়ম এবং গ্রীষ্মকালে পানির সংকটের মতো সমস্যাগুলো অনেকটাই হ্রাস পাবে। বিশেষ করে নতুন আবাসিক এলাকা ও দ্রুত সম্প্রসারণশীল নগর অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এর নিয়মিত ও দক্ষ পরিচালনার ওপর। প্রকল্পটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে ঢাকার পানির উৎসে বৈচিত্র্য আসবে, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় রাজধানী আরও সক্ষম হবে। একই সঙ্গে এটি দেশের নগর অবকাঠামো উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবেও বিবেচিত হবে।
রাজধানীর ভবিষ্যৎ পানি নিরাপত্তা নিয়ে যখন উদ্বেগ বাড়ছে, তখন গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগারকে ঘিরে নতুন আশার আলো দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের বিশ্বাস, প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে ঢাকার কোটি মানুষের জন্য নিরাপদ ও টেকসই পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার পথে একটি বড় অগ্রগতি অর্জিত হবে।
শুধু বর্তমান নয়, আগামী প্রজন্মের পানির চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রেও এই প্রকল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। ফলে গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার এখন আর শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি রাজধানীর পানি নিরাপত্তা ও টেকসই নগর ভবিষ্যতের প্রতীক হয়ে উঠছে।
আ.দৈ/আরএস




















