মোটরসাইকেল এখন ‘মৃত্যুফাঁদ’
সড়কে প্রতি ৩ জন নিহতের ১ জনই বাইক আরোহী
শাহীন রহমান

এবারে ঈদযাত্রায় ৩৯৪ সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০২ জনের মৃতু হয়েছে। বেশিরভাগ প্রাণহানি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, অতিরিক্ত গতি, স্টান্ট বা কসরত প্রদর্শন, রেসিং প্রবণতা এবং হেলমেট ব্যবহারে অবহেলা উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে। গবেষণা বলছে, অল্পবয়সী চালকদের মধ্যে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি এবং এসব আচরণ সরাসরি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
ঈদুল আজহার ছুটির আগে ও পরে ১৫ দিনে সারা দেশে ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৪০২ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৯৪ জন আহত হয়েছেন। যাত্রী কলাণ সমিতি প্রতিবেদনের বলা হয়েছে অন্যবারের তুলনায় এবার সড়কে মটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার অনেক বেশি ছিল। সংগঠনটির জরিপ অনুয়াযি সড়ক দুর্ঘটনার ৩৮ দশমিক ৮৩ শতাংশই ছিল মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট। এ সময়ে ১৫৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় অন্তত ১৫৯ জন নিহত এবং ১৮০ জন আহত হয়েছেন।
একাধিক গবেষণাও দেখা গেছে সড়কে প্রতি তিন জনের মধ্যে একজনের প্রাণহানি হচ্ছে মটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। সম্প্রতি সময়ে এই দুর্ঘটনা দেশে আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। এতে বেশিরভাগই প্রাণ হারাচ্ছে কম বয়সি তরুণরা। গবেষণায় উঠে এসেছে সন্তানের আবদার মেটাতে মটরসাইকেল কিনে দিতে বাধ্য হচ্ছেন পিতা মাতা। শখ পুরণ করতে নিজের অজান্তেই ডেকে আনছে সন্তানের জন্য করুণ পরিণতি। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ঈদের সময় ঘরমুখো বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল থাকে। এই বিশাল চাপ সামাল দিতে ও যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে ১০ থেকে ১২ দিনের নজরদারি যথেষ্ট নয়। তিনি গণপরিবহনব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি দুর্ঘটনা কমাতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
এদিেেক গবেষণায় উঠে এসছে দেশের সড়কে মোটরসাইকেল যেন ধীরে ধীরে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বাহনে পরিণত হয়েছে। গত এক দশকে মোটরসাইকেলের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানিও। সাম্প্রতিক গবেষণা, দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ এবং সড়ক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, অতিরিক্ত গতি, অনভিজ্ঞ ও অল্পবয়সী চালক, লাইসেন্সবিহীন চালনা, হেলমেট ব্যবহারে অনীহা এবং দুর্বল আইন প্রয়োগের কারণে বাংলাদেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা এখন জননিরাপত্তার অন্যতম বড় সংকটে রূপ নিয়েছে। এক দশকে মোটরসাইকেলের সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়লেও নিরাপদ চালনা, প্রশিক্ষণ ও আইন প্রয়োগ সে অনুপাতে বাড়েনি। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর তালিকায় এখন শীর্ষে মোটরসাইকেল আরোহীরা।
গত ২০২৪ সালের সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে ৬ হাজার ৯২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ২৯৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২ হাজার ৬০৯ জন, যা মোট সড়ক-মৃত্যুর প্রায় ৩৬ শতাংশ। একই বছরে ২ হাজার ৭৬১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান মোটরসাইকেলকে দেশের সবচেয়ে প্রাণঘাতী যানবাহন হিসেবে চিহ্নিত করছে।
সড়কে কেন মটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও মৃত্যু বাড়ছে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এবছর ইনভেস্টিগেটিং রিস্কি রাইডিং বিহেভিয়র্স অ্যামাং ইয়াং মোটরসাইক্লিস্টস ইন বাংলাদেশ বা “বাংলাদেশের তরুণ মোটরসাইকেল আরোহীদের ঝুঁকিপূর্ণ চালনা-আচরণ অনুসন্ধান”মুলক এক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ট্রান্সপোর্টেশন রিসার্চ পার্ট এফ: ট্রাফিক সাইকোলজি এন্ড বিহ্যাভিয়ার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেশের ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী ৫০৮ জন তরুণ মোটরসাইকেল আরোহীর আচরণ বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটি পরিচালনা করেন আবদুল্লাহ আল নাফিস ও মাহবুব হাসান।
গবেষণায় মোটরসাইকেল চালকের আচরণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, অতিরিক্ত গতি, স্টান্ট বা কসরত প্রদর্শন, রেসিং প্রবণতা এবং হেলমেট ব্যবহারে অবহেলা উদ্বেগজনক মাত্রায় রয়েছে। গবেষণাটি বলছে, অল্পবয়সী চালকদের মধ্যে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি এবং এসব আচরণ সরাসরি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। গবেষণাটি আরও দেখিয়েছে, বৈধ লাইসেন্সধারী এবং উচ্চশিক্ষিত চালকদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ তুলনামূলক কম। বিপরীতে লাইসেন্সবিহীন ও কমবয়সী চালকদের মধ্যে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেশি।
গত ২০২৪ সালে ‘অ্যানালাইজিং দ্য প্রিভ্যালেন্স অব অ্যান্ড ফ্যাক্টরস অ্যাসোসিয়েটেড উইথ রোড ট্রাফিক ক্র্যাশেস অ্যামাং মোটরসাইক্লিস্টস ইন বাংলাদেশ’ বা “বাংলাদেশে মোটরসাইকেল আরোহীদের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার ব্যাপকতা ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত কারণসমূহের বিশ্লেষণ” নিয়ে একটি গবেষণা করা হয়। গবেষণাটি দ্যা সায়েন্সটিফিক ওয়ার্ল্ড জার্নালে প্রকাশিত হয়। গবেষণায় বাংলাদেশের চারটি বড় শহরের ৪০২ জন মোটরসাইকেল চালকের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষক ছিলেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের গবেষক মো. মামুন মিয়া, বিতন চাকমা ও কবির হোসেন।
গবেষণায় দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী চালকদের প্রায় ৬৯ শতাংশ গত এক বছরে অন্তত একবার সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। গবেষণাটি দুর্ঘটনার প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে ২০ বছরের কম বয়স, লাইসেন্স না থাকা, অতিরিক্ত গতি, হেলমেট ব্যবহার না করা, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে মোটরসাইকেল চালানো। গবেষকদের মতে, এসব কারণ একসঙ্গে কাজ করে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে মোটরসাইকেল ব্যবহারের বিস্ফোরণ ঘটেছে মূলত রাইড-শেয়ারিং সেবা, সহজ ঋণ সুবিধা এবং তুলনামূলক কম খরচের কারণে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি প্রশিক্ষণ, দক্ষতা কিংবা ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতনতা। ফলে নতুন চালকদের একটি বড় অংশ পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ছাড়াই ব্যস্ত মহাসড়ক ও নগর সড়কে ঝুঁকিপূর্ণভাবে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন। গবেষণাগুলো আরও বলছে, বৈধ লাইসেন্সধারী এবং উচ্চশিক্ষিত চালকদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ তুলনামূলক কম। অন্যদিকে লাইসেন্সবিহীন চালক, কম বয়সী রাইডার এবং উচ্চক্ষমতার মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের মধ্যে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, মোটরসাইকেলের কাঠামোগত দুর্বলতাও প্রাণহানির বড় কারণ। ব্যক্তিগত গাড়ির মতো এখানে যাত্রীকে রক্ষার জন্য কোনো শক্ত বডি, এয়ারব্যাগ বা সিটবেল্ট নেই। ফলে সামান্য সংঘর্ষও মারাত্মক আঘাতে রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাতজনিত মৃত্যুর হারও উদ্বেগজনক। বিভিন্ন চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মাথা ও মস্তিষ্কে আঘাত প্রাণহানির অন্যতম প্রধান কারণ।
২০২৪ সালে বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনায় মস্তিষ্কে আঘাতজনিত ফলাফল নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রাণঘাতী মাথার আঘাতের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিশেষ করে রাতের বেলা, গ্রামীণ সড়কে এবং অতিরিক্ত গতিতে সংঘটিত দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার বেশি পাওয়া গেছে। গবেষণায় আরও দেখা যায়, কম দৃশ্যমানতা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং উচ্চগতি প্রাণঘাতী আঘাতের অন্যতম কারণ।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, চালকের আচরণের পাশাপাশি সড়ক অবকাঠামোও দায়ী। দেশের অধিকাংশ মহাসড়কে মোটরসাইকেলের জন্য আলাদা লেন নেই। একই সড়কে ভারী ট্রাক, বাস, তিন চাকার যান এবং মোটরসাইকেল চলাচল করে। ফলে গতি ও আকারের বৈষম্যের কারণে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ে। বিপজ্জনক মোড়, অপরিকল্পিত সংযোগ সড়ক এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও দুর্ঘটনা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
গবেষণাগুলোর অভিন্ন উপসংহারে বলা হয়েছে দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কেবল একটি পরিবহন সমস্যা নয়, এটি এখন একটি জনস্বাস্থ্য সংকট। আইন প্রয়োগ, বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, লাইসেন্সিং ব্যবস্থার সংস্কার, মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং তরুণ চালকদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা কর্মসূচি ছাড়া এই মৃত্যুমিছিল থামানো কঠিন হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরে মোটরসাইকেল-সংশ্লিষ্ট মৃত্যু দেশের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
আ.দৈ/আরএস




















