গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র
বসবাসের অযোগ্যতার পথে ঢাকা?
শাহীন রহমান

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার সমস্যা শুধু জনসংখ্যার ঘনত্ব নয়; সমস্যা হলো পরিকল্পনাহীন কেন্দ্রীভবন। সরকারি-বেসরকারি অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় অংশ এখনও সীমিত কয়েকটি এলাকায় কেন্দ্রীভূত। ফলে প্রতিদিন লাখো মানুষ একই সময়ে একই দিকে যাতায়াত করে, যা যানজট ও অবকাঠামোগত চাপ বাড়িয়ে দেয়
বিএনপি মহাসচিব স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অনেকটা আপেক্ষ করেই বলেছেন বর্তমান পেক্ষাপটে ঢাকাকে আর বাসযোগ্য মনে হয় না। ইচ্ছে করেই গ্রামের বাড়িতে থাকতে হয়। সরকারের একজন অতিগুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তির মুখ থেকে এমন কথা উচ্চারিত হওয়ার পর স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে সত্যিই ঢাকা বসবাসের অনুপোযুক্ত হয়ে পড়ছে।
শুধু মন্ত্রীর আবেগ নয়। রাজধানী ঢাকা নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে সবগুলো গবেষণায় এমনই ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। এমনকি ২০০৯ সালে হাইকোর্টেও রায়ে বলা হয়েছিল পরিবেশ দুষণসহ জীবনমান উন্নয়নে ব্যবস্থা না নিলে বসবাসের অনুপোযুক্ত হয়ে পড়বে রাজধানী। কিন্তু সরকার আসে যায় এদিকে কারো নজর নেই।
দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন ও শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কোটি মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল এই মহানগরকে ঘিরে এমন প্রশ্ন এখন আর শুধু নাগরিকদের আড্ডা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়। দেশি-বিদেশি গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সমীক্ষা এবং নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণেও উঠে আসছে একই ধরনের উদ্বেগ ঢাকার জীবনমান দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের গবেষকদের পরিচালিত বহুল আলোচিত গবেষণা ‘এ মাল্টিভ্যারিয়েট স্ট্যাটিস্টিক্যাল স্টাডি অব ঢাকা’স কোয়ালিটি অব লাইফ বেইসড অন রেসিডেন্টস পারসেপশন’ বা “বাসিন্দাদের উপলব্ধির ভিত্তিতে ঢাকার জীবনমানের একটি বহুমাত্রিক পরিসংখ্যানভিত্তিক গবেষণায় ২২৪ জন নাগরিকের মতামত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পরিবেশ, পরিবহন, ইউটিলিটি সেবা, বিনোদন, শাসনব্যবস্থা এবং সামাজিক জীবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকে অধিকাংশ উত্তরদাতা ঢাকার অবস্থা ‘পুওর থেকে ভেরী পুওর’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। গবেষকরা উপসংহারে বলেছেন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও জীবনমানের বিচারে ঢাকা এখনও একটি প্রকৃত বাসযোগ্য শহর থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে।
গবেষণাটির প্রধান গবেষকদলের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রাইসা সুলতানা, কাজী ফারহা ফারজানা সুহি, এস এম নাহিয়ান ইসলাম এবং মাইশা মাহবুব। তাঁদের মতে, দ্রুত ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন ঢাকার সামাজিক ও পরিবেশগত সংকটকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনমান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো যানজট। ২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘আরবান কনজেশন অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট ইনএফিশিয়েন্সিজ: ইমপ্লিকেশন্স ফর লিভ্যাবিলিটি ইন ঢাকা সিটি’ বা “নগর যানজট ও পরিবহন ব্যবস্থার অদক্ষতা: ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতার ওপর এর প্রভাব’ শীর্ষক গবেষণায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের গবেষকরা দেখিয়েছেন যে যানজট ও অদক্ষ পরিবহনব্যবস্থা রাজধানীর বাসযোগ্যতাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, দীর্ঘ যানজট শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করছে না; এটি বায়ুদূষণ, মানসিক চাপ, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাসেরও অন্যতম কারণ। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপর্যাপ্ত গণপরিবহন, দুর্বল অবকাঠামো এবং পরিকল্পনাগত সীমাবদ্ধতা এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
তারা বলছেন পরিবেশগত দিক থেকেও ঢাকার অবস্থা উদ্বেগজনক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০২৪ সালের গবেষণা ‘স্পেশিওটেম্পোরাল অ্যানালিসিস অব আরবান ইকোলজিক্যাল লিভ্যাবিলিটি কোয়ালিটি অব ঢাকা সিটি ইউজিং জিআইএস অ্যান্ড রিমোট সেন্সিং টেকনিকস’ বা “জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঢাকা শহরের নগর-পরিবেশগত বাসযোগ্যতার মানের স্থানিক ও সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণ-এ দেখা গেছে, গত এক দশকে দ্রুত নগরায়নের ফলে সবুজ এলাকা কমেছে, তাপমাত্রা বেড়েছে, বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গবেষকরা স্যাটেলাইট তথ্য ও জিআইএস বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে ঢাকার পরিবেশগত বাসযোগ্যতা ধারাবাহিকভাবে চাপের মুখে রয়েছে।
সবুজায়ন সংকটের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯২ সালে ঢাকার প্রায় ৪৭ শতাংশ এলাকা সবুজে আচ্ছাদিত থাকলেও ২০২২ সালে তা নেমে আসে মাত্র ১৬ শতাংশে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খোলা জায়গা ও পার্কের অভাব, পথচারীবান্ধব অবকাঠামোর ঘাটতি এবং তীব্র বায়ুদূষণ বিশেষ করে বয়স্ক নাগরিকদের জীবনকে কঠিন করে তুলছে।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার সমস্যা শুধু জনসংখ্যার ঘনত্ব নয়; সমস্যা হলো পরিকল্পনাহীন কেন্দ্রীভবন। সরকারি-বেসরকারি অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় অংশ এখনও সীমিত কয়েকটি এলাকায় কেন্দ্রীভূত। ফলে প্রতিদিন লাখো মানুষ একই সময়ে একই দিকে যাতায়াত করে, যা যানজট ও অবকাঠামোগত চাপ বাড়িয়ে দেয়। নগর পরিকল্পনাবিদরা বহুদিন ধরেই কর্মসংস্থান ও সেবার বিকেন্দ্রীকরণের সুপারিশ করে আসছেন।
গবেষণাগুলোতে আরও দেখা যায়, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, জলাবদ্ধতা, নিরাপদ হাঁটার পথের অভাব, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের সংকট এবং সেবাখাতের দুর্বলতা নাগরিকদের জীবনমানকে একযোগে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এসব সমস্যা এককভাবে নয়, বরং সম্মিলিতভাবে বাসযোগ্যতাকে কমিয়ে দিচ্ছে। তবে গবেষকরা এখনই ঢাকাকে “সম্পূর্ণ বসবাসের অযোগ্য” শহর বলতে রাজি নন। তাঁদের ভাষায়, ঢাকা এখনও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, কর্মসংস্থান ও সেবার সুযোগের কারণে কোটি মানুষের জন্য আকর্ষণীয়। কিন্তু জীবনমানের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সূচকে অবনতির ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে শহরটির বাসযোগ্যতা আরও কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, উন্নত গণপরিবহন, সবুজ এলাকা সংরক্ষণ, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, সেবার বিকেন্দ্রীকরণ এবং সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই মহানগর ক্রমেই এমন এক অবস্থার দিকে এগোবে, যেখানে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকলেও জীবনমানের সংকট মানুষের দৈনন্দিন অস্তিত্বকে আরও কঠিন করে তুলবে।
আ.দৈ/আরএস




















