সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় পুশইনের চেষ্টা
বিজিবির কঠোর প্রতিরোধের মুখে পিছু হটলো বিএসএফ
ইসমাঈল হুসাইন ইমু

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর রাজ্য সরকারের দায়িত্ব নেয় বিজেপি। এ সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের আন্তর্জাতিক সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। পরে বেড়া নির্মাণ করতে এলে বিএসএফ-বিজিবি মুখোমুখী অবস্থান নেয়। বিজিবির তোপের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয় বিএসএফ।
এছাড়া বিধানসভা নির্বাচনে প্রায় ৯১ লাখ মুসলিমকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। ধারণা করা হচ্ছে যাদের বাদ দেয়া হচ্ছে তাদের উপর নির্যাতন নেমে আসতে পারে। পাশাপাশি ওই মুসলিমদের পুশইনের মাধ্যমে বাংরাদেশে পাঠানো হতে পারে। গত কয়েকদিনে একাধিক সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা করলেও তা রুখে দিয়েছে সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি।
ভারত এর আগেও তারা সীমান্তে বেড়া দেওয়ার নামে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করে আসছে। যদিও আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে এসব নিয়ে তেমন কোনো কথা হয়নি। তবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে পরিবেশ সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। তখন থেকে বাংলাদেশ তার ন্যায্য অধিকারের বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দেয়। ফলে সেই থেকে দেশের সার্বভৌত্ব রক্ষায় ও সীমান্তের প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার মনোভাব স্পষ্ট করেছে বাংলাদেশ।
অন্যদিকে সীমান্তে গুলি করে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর বিষয়ে বারবার আলোচনা হলেও তারা তা মানছে না। একের পর এক সীমান্তে গুলি করে তারা মানুষ হত্যা করছে। রাতের আঁধারে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে তাদের দেশে বসবাস করা মানুষকে কথিত বাংলাদেশি বলে ঠেলে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে সীমান্তে তারা কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করছে। আর এসব নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এরই মধ্যে বিএসএফ-বিজিবি মহাপরিচালক পর্যায়ে সীমান্ত সম্মেলন ডাকা হয়েছে। আগামী ৮ জুন নয়াদিল্লীতে চারদিনব্যাপী এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করবেন। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে বিজিবি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ ছাড়াও প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর ও যৌথ নদী কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ প্রতিনিধিত্ব করবেন। অপরদিকে, বিএসএফ মহাপরিচালক এর নেতৃত্বে ভারতীয় প্রতিনিধিদল সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন। ভারতীয় প্রতিনিধিদলে বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ ছাড়াও ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়/সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার কর্মকর্তাবৃন্দ প্রতিনিধিত্ব করবেন।
বিজিবি জানায়, দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ কর্তৃক অবৈধভাবে পুশইনের ১০টি পৃথক অপচেষ্টা সফলভাবে রুখে দিয়েছে বিজিবি। একইসঙ্গে সম্ভাব্য পুশইন প্রতিরোধে সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
ঝিনাইদহের যাদবপুর সীমান্ত এলাকায় ৪-৫ জন ব্যক্তি বাংলাদেশে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করলে বিজিবি টহলদল তাৎক্ষণিকভাবে বাঁধা প্রদান করে। বিজিবির দৃঢ় অবস্থানের মুখে তারা ভারতের অভ্যন্তরে ফিরে যায়। এছাড়া মহেশপুর সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের একটি প্রিজন ভ্যানে করে প্রায় ৩০-৩৫ জন ব্যক্তিকে সীমান্ত গেট খুলে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। বিজিবি টহলদল ও স্থানীয় জনসাধারণের তাৎক্ষণিক প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ ওই ব্যক্তিদের পুনরায় ভ্যানে তুলে অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
যশোরের গোগা ও রুদ্রপুর সীমান্ত এলাকায় কয়েকজন নারী-পুরুষকে পুশইনের উদ্দেশ্যে সীমান্তের কাছে অবস্থান করতে দেখা যায়। বিজিবির প্রতিরোধমূলক তৎপরতার ফলে বিএসএফ তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। জয়পুরহাট কয়া ও বাসুদেবপুর সীমান্তের বিপরীতে ভারতের অভ্যন্তরে প্রায় ১০ জন ব্যক্তিকে একত্রিত করে পুশইনের প্রস্তুতির তথ্য পায়। পুশইন প্রতিরোধে বিজিবির তাৎক্ষণিক সতর্কতামূলক প্রস্তুতি গ্রহণ এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করার ফলে বিএসএফের পুশইন অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের বিপরীতে ১৪৯ ও ৭১ ব্যাটালিয়ন বিএসএফ ক্যাম্পের নিকটবর্তী ৩টি হোল্ডিং সেন্টারে ঝওজ তালিকা থেকে বাদ পড়া ৪ জন মুসলিম নাগরিককে বাংলাদেশে পুশইনের উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে বলে গোয়েন্দা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সূত্রে জানা যায়। বিজিবি সেখানে কঠোর অবস্থান ও গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে।
অপরদিকে ঠাকুরগাঁও হরিপুর সীমান্তের বিপরীতে ৮৭ ব্যাটালিয়ন বিএসএফের কাকরমনি ক্যাম্পের টহলদল ২ জন বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করে নিজেদের হেফাজতে রেখেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি পঞ্চগড়ের রওশনপুর সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক এক ব্যক্তিকে পুশইন করা হলে স্থানীয় জনগণ তাকে আটক করে বিজিবিকে অবহিত করে। পরবর্তীতে বিজিবি ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাকে ভারতের অভ্যন্তরে ফেরত পাঠায়। একইদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ সীমান্তের বিপরীতে ভারতের মালদা জেলার ইংলিশ বাজার থানাধীন চন্দনপার্ক নামক স্থানে ভারতীয় পুলিশ কর্তৃক স্থাপিত একটি হোল্ডিং সেন্টারে আটক ২২ জনকে পুশইনের লক্ষ্যে বিএসএফের কাছে হস্তান্তরের তথ্য পাওয়া যায়।
বিজিবি সেখানে কড়া নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। সিলেটের উৎমাছড়া সীমান্ত এলাকায় সন্দেহভাজন দুজনকে স্থানীয় জনগণ আটক করে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করার পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ভারতে পুশব্যাক করা হয়।
এছাড়া নেত্রকোনার কচুগড়া সীমান্তের বিপরীতে ভারতের আসাম রাজ্যের মহাদেব থানাধীন বলিশী গীতারাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫-২০ জন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পুশইনের উদ্দেশ্যে একত্রিত করে রাখা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সীমান্তের একটি অংশে প্রাকৃতিক কারণে কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় ওই এলাকা দিয়ে পুশইনের সম্ভাবনা বিবেচনায় বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বিজিবি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানায়, সীমান্ত দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যমান আইন এবং দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার পরিপন্থী যেকোনো পুশইন প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। সীমান্তে বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও অপারেশনাল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সর্বদা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
আ.দৈ/আরএস




















