রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিশুমৃত্যু ৬০০ ছাড়াল
হাম মোকাবেলায় কয়েক দশকের মধ্যে বড় সংকটে দেশ
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬, ৮:৫৮ পিএম   (ভিজিট : ৮১)
X

দেশের জনস্বাস্থ্য খাতে এক গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব। গত প্রায় আড়াই মাসে সারা দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মিলিয়ে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়ে গেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক দশকের মধ্যে এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে ভয়াবহ হাম সংকটগুলোর একটি। টিকাদান কর্মসূচিতে তৈরি হওয়া ফাঁক, বিপুলসংখ্যক টিকাবঞ্চিত শিশু এবং দ্রুত সংক্রমণের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাব ইতোমধ্যে দেশের প্রায় সব বিভাগ ও অধিকাংশ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৫৮ জেলায় সংক্রমণ শনাক্ত হয় এবং পরিস্থিতিকে জাতীয় পর্যায়ে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে মূল্যায়ন কওে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মিলিয়ে হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ৬০০-এর ঘর অতিক্রম করেছে। মে মাসের শেষ দিকে মৃত্যুর সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার পরও সংক্রমণ অব্যাহত থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক হাজার থেকে বেড়ে কয়েক দশ হাজারে পৌঁছেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আক্রান্তদের বড় অংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হওয়া রোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশই পাঁচ বছরের নিচের শিশু এবং উল্লেখযোগ্য অংশের বয়স দুই বছরেরও কম। আক্রান্তদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক শিশু কখনোই হাম-রুবেলা টিকার আওতায় আসেনি অথবা নির্ধারিত দুই ডোজ সম্পন্ন করেনি।

রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় শিশু হাসপাতাল ও সংক্রামক রোগ হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক শিশু নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, মারাত্মক পানিশূন্যতা এবং অপুষ্টিজনিত জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে হাসপাতালে আনার কারণে মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। গত কয়েক বছরে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘ্ন, টিকার ঘাটতি, শহরের বস্তি ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকা কাভারেজের বৈষম্য এবং বিপুলসংখ্যক ‘জিরো-ডোজ’ শিশুর কারণে ধীরে ধীরে রোগপ্রতিরোধের ফাঁক তৈরি হয়েছে। সেই ফাঁকই এবার বড় আকারের প্রাদুর্ভাবের রূপ নিয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। কোনো এলাকায় টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশ একসময় টিকাদানে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু এলাকায় সেই সাফল্য ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে থেকে যায়।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও, ইউনিসেফ ও গাভি-এর সহায়তায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। প্রথমে উচ্চ ঝুঁকির ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় অভিযান চালানো হয়। পরে তা পর্যায়ক্রমে দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা হয়। সরকার জানিয়েছে, লক্ষাধিক নয়, কোটি সংখ্যক শিশুকে টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে যাতে সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙা যায়। বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থার এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ড. আহমেদ জামশেদ মোহাম্মদ বলেছেন, দ্রুত টিকাদান সম্প্রসারণ না করা গেলে আরও প্রাণহানি ঘটতে পারে। ইউনিসেফও সতর্ক করে বলেছে, রোগপ্রতিরোধের যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে তা পূরণে জরুরি পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

চিকিৎসকরা বলছেন, হামকে অনেক পরিবার এখনো সাধারণ জ্বর বা শিশুর স্বাভাবিক অসুখ হিসেবে দেখে। ফলে রোগের শুরুতে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরিবর্তে স্থানীয় ওষুধের দোকানের ওপর নির্ভর করা হয়। এতে জটিলতা বাড়ে। সংক্রমিত শিশুর জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া কিংবা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রাদুর্ভাব শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়; এটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্যও বড় সতর্কবার্তা। একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে শত শত শিশুর মৃত্যু প্রমাণ করে যে টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা, রোগ নজরদারির সীমাবদ্ধতা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। তারা বলছেন, জরুরি টিকাদান অভিযান সফল হলেও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আবারও দেখা দিতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্ষা মৌসুমে জনসমাগমপূর্ণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে বস্তি, দুর্গম গ্রাম এবং স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনতে না পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে। একসময় নির্মূলের পথে থাকা হাম আজ আবার জাতীয় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ৬০০ ছাড়ানোর এই বাস্তবতা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন প্রশ্নের প্রতীক। এখন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটাই বার্তা প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনা না গেলে এই মৃত্যু মিছিল থামানো যাবে না।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝