জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক প্রস্তাব
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা
বাংলাদেশের, পোশাক, শিল্প, বড়, ধরনের, ক্ষতির, মুখে, পড়ার, আশঙ্কা
শাহীন রহমান

বিশেষজ্ঞরা বলছেন শুল্ক এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। শ্রম অধিকার ও সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও বড় বাণিজ্যিক বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।
জোরপূর্বক শ্রম বা ফোর্সড লেবার প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (টঝঞজ) প্রস্তাবিত এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হতে পারে। যদিও এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয় এবং আগামী জুলাই পর্যন্ত জনমত গ্রহণ ও শুনানির প্রক্রিয়া চলবে, তবু দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ ৬০টি অর্থনীতি জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি কার্যকরভাবে নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে মার্কিন ব্যবসা ও শ্রমিকরা অন্যায্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্বের বৃহত্তম পোশাক আমদানিকারক বাজারগুলোর অন্যতম যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নতুন করে চাপে পড়তে পারে। বিশেষ করে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত ও অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সঙ্গে বাজার প্রতিযোগিতায় রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের পদক্ষেপ একাধিক দেশের বিরুদ্ধেও প্রস্তাব করেছে, তবুও অতিরিক্ত শুল্কের ফলে ক্রেতারা মূল্য কমানোর চাপ বাড়াতে পারে।
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল এ বিষয়ে তার প্রতিক্রিয়ায় বলছেন, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন কোনো পরিকল্পনা নয়, বৃহৎ পরিকল্পনারই অংশ। ট্যারিফ আদায়ের যে পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে নিয়েছিল সেটিই আইনের মারপ্যাচে ভিন্ন আঙ্গিকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। অতীতে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া ট্যারিফের সিদ্ধান্ত আদালতে বাতিল হলেও সেটাকেই আবার শক্ত করে আইনি প্রক্রিয়ায় আনা হচ্ছে। ওরা বলছে যে আপনি ফোর্স লেবার এবং এক্সেস প্রোডাকশনের জন্য দায়ি, এগুলোতো খুবই আপেক্ষিক ব্যাপার। এগুলো আপনি প্রমাণ করতে পারবেন না, ওরাও পারবে না। আসলে ওরা যে মাত্রায় ট্যারিক কলেকশনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আইনের মারপ্যাঁচে সেটাই করছে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। যুক্তরাষ্ট্র এই খাতের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। ফলে শুল্ক বৃদ্ধি কার্যকর হলে প্রথম ধাক্কা আসবে পোশাক শিল্পে। রপ্তানিকারকদের আশঙ্কা, ক্রেতারা অতিরিক্ত শুল্কের ব্যয় বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে। এতে কারখানার মুনাফা কমবে, নতুন বিনিয়োগে ধীরগতি আসবে এবং কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ সরাসরি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে কেন্দ্র করে নয়; বরং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য প্রবেশ রোধে বিভিন্ন দেশের নীতিগত অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। তারপরও বাংলাদেশকে দ্রুত কূটনৈতিক ও নীতিগত উদ্যোগ নিতে হবে।
তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা মনে করেন, গত এক দশকে শ্রম অধিকার, কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে কারখানার নিরাপত্তা, শ্রমিক কল্যাণ ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। সে বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে।
জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুতে যেসব দেশে বাড়তি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করার হয়েছে সেখানে বাংলাদেশের নাম থাকায় এর প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সংগঠন। বুধবার দুপুরেই সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশের নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলছেন, মার্কিন আদালত আগের ট্যারিফ বাতিল করলেও নতুন অজুহাতে আরও ট্যারিফ আরোপের চেষ্টা করছে। জোরপূর্বক শ্রমের যে অজুহাত তারা দিয়েছে এর একটা প্রমাণও কি তারা দিতে পারবে? বাংলাদেশের শ্রমিকদের জোর করে কাজ করানো হচ্ছে, প্রশ্নই আসেনা। তিনি বলেন, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করেই কাজ হচ্ছে বাংলাদেশে।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য তা সরাসরি আর্থিক চাপ তৈরি করবে। তবে একই সঙ্গে তারা উল্লেখ করছেন, প্রস্তাবটি এখনো আলোচনাধীন এবং চূড়ান্ত হওয়ার আগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যুক্তি ও তথ্য তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। ইউএসটিআর আগামী ৬ জুলাই পর্যন্ত লিখিত মতামত গ্রহণ করবে এবং ৭ জুলাই শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, এই উদ্যোগকে কেবল শ্রম অধিকার ইস্যু হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর বাণিজ্যনীতি ও দেশীয় শিল্প সুরক্ষার বিষয়ও জড়িত। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, অনেক দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে উৎপাদন ব্যয় কমে যায় এবং মার্কিন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মনে করেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে তুলা, সুতা ও কাঁচামালের উৎস সম্পর্কে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করতে হবে। কারণ বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে ‘ট্রেসেবিলিটি’ বা উৎস শনাক্তকরণ একটি বড় বাণিজ্যিক শর্তে পরিণত হয়েছে।
ঢাকার একজন বাণিজ্য গবেষক বলেন, “এটি শুধু শুল্কের প্রশ্ন নয়। ভবিষ্যতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে টিকে থাকতে হলে শ্রম অধিকার, মানবাধিকার ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে আরও কঠোর মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য এটি সতর্কবার্তা। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডি এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ বিষয়ে বলেন, স্বাভাবিক শুল্কের ওপর লেবার স্ট্যান্ডার্ডের ইস্যু এনে তারা বাড়তি শুল্ক আরোপের চেষ্টা করছেন, কিন্তু আগেই এই ধরণের শুল্কের বিষয়টি অগ্রহণযোগ্য বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল মার্কিন আদালত, এবারও বিষয়টি মার্কিন আদালতে প্রশ্নের মুখে পড়বে। যদিও তিনি মনে করেন, মার্কিন ট্যারিফের দিকে না তাকিয়ে বাংলাদেশের বরং উচিৎ হবে শ্রম অধিকারের বিষয়ে যদি কোনো প্রশ্ন থাকে সেখানে নজর দেওয়া।
শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতের বিষয়টি নিয়ে অনেকদিন আগে থেকেই আমাদের ওপর চাপ রয়েছে, আমাদের উচিৎ হবে ট্যারিফের দিকে না তাকিয়ে এক্ষেত্রে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকলে নিজেদের তাগিদেই সেটি ঠিক করা। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলেও এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বিপর্যয়কর হবে না। কারণ একই তদন্তের আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ভারত, জাপান, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনামসহ বহু দেশ এসেছে।
ফলে বাংলাদেশের প্রতিযোগীরা একই ধরনের চাপের মুখে পড়বে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাজার ধরে রাখতে হলে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। বাংলাদেশের জন্য এখন তিনটি কাজ গুরুত্বপূর্ণ প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার করা; দ্বিতীয়ত, শ্রম অধিকার ও জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন ও বাস্তব অগ্রগতি আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরা; এবং তৃতীয়ত, রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্য বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমানো।
তাদের ভাষ্য, বিশ্ব বাণিজ্যে মানবাধিকার ও শ্রম অধিকারের প্রশ্ন দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্ক প্রস্তাব শুধু একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার নতুন বাস্তবতারও ইঙ্গিত বহন করছে। আর সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে আরও প্রস্তুত ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে হবে।
আ.দৈ/আরএস




















