অভিন্ন নীতিমালায় আসছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল
বিশেষ প্রতিনিধি

নিবন্ধন, পাঠ্যসূচি, নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতায় কঠোর নজরদারি;
‘নিয়ন্ত্রণহীন শিক্ষা ব্যবস্থার’ অবসান চায় সরকার
দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি কারিকুলামে পরিচালিত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোকে প্রথমবারের মতো একটি অভিন্ন নীতিমালার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, নিবন্ধন, প্রশাসনিক কাঠামো, শিক্ষার মান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ফি নির্ধারণ, জাতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য শিক্ষা এবং সরকারি তদারকির ক্ষেত্রে একই ধরনের ন্যূনতম মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। সরকারের দাবি, এতদিন অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যত আলাদা ব্যবস্থায় পরিচালিত হলেও এখন সেগুলোকে জাতীয় শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা হবে।
বিষয়টি নিয়ে বুধবার কথা বলেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা শিক্ষাপ্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। এর আগে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুলন হক মিলন এ বিষয়ে একাধিকবার ইঙ্গিত দিয়েছে। বুধবার ববি হাজ্জাজ বলেন, দেশের সব শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার একটি সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তুলতে কাজ করছে। সেই লক্ষ্যে দেশের সব ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলকে একটি অভিন্ন নীতিমালার আওতায় আনা হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বিভিন্ন সভা ও বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়েছে, ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাব্যবস্থা বন্ধ করা নয়; বরং এটিকে একটি সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় আনা সরকারের লক্ষ্য। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সম্প্রতি বলেছেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোকে ‘রেগুলেটরির আন্ডারে’ আনতে হবে এবং এ বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে দেশে শত শত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল পরিচালিত হলেও তাদের অনেকের নিবন্ধন, অবকাঠামোগত মান, শিক্ষক নিয়োগ, ফি কাঠামো এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে অভিন্ন কোনো কার্যকর কাঠামো নেই। ফলে একই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরিচালনাগত বৈষম্য তৈরি হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় মনে করছে, এই পরিস্থিতি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে এবং রাষ্ট্রীয় তদারকিকেও দুর্বল করে তুলছে।
সরকারি সূত্র জানায়, নতুন নীতিমালায় নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হবে এবং নিবন্ধন নবায়নের ক্ষেত্রেও কঠোরতা আরোপ করা হবে। ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর নিবন্ধন ও নবায়ন কার্যক্রমে জোর দিয়েছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিবন্ধন হালনাগাদ করার নির্দেশনা দিয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশি কারিকুলাম অনুসরণ করলেও বাংলাদেশে পরিচালিত যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দেশের আইন ও নীতিমালার প্রতি জবাবদিহি থাকতে হবে। সে কারণে অগ্নিনিরাপত্তা, ভবন নিরাপত্তা, শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা, শিক্ষক-কর্মচারীদের যোগ্যতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার বিষয়গুলো নতুন নীতিমালায় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করেন, ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ দেশের জাতীয় ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এ কারণে জাতীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কিত কিছু বিষয় বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রশ্নও আলোচনায় রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে সরকারের বিভিন্ন বক্তব্যে জাতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল কর্তৃপক্ষের একটি অংশ সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক কারিকুলামের মৌলিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুন্ন রেখে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যেতে পারে। তবে কারিকুলামের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হলে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক ও অনলাইন আলোচনাতেও দেখা যাচ্ছে, একদিকে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার দাবি থাকলেও অন্যদিকে অতিরিক্ত সরকারি হস্তক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
শিক্ষাবিদদেরা মনে করেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বর্তমানে বাংলা মাধ্যম, ইংলিশ ভার্সন, ইংলিশ মিডিয়াম, মাদ্রাসা ও কারিগরি ধারার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুযোগ ও মানের বৈষম্য তৈরি হয়। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোকে অভিন্ন নীতিমালার আওতায় আনার উদ্যোগ সেই বৈষম্য কমানোর একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে অংশীজনদের মতামত গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নীতিমালার খসড়া প্রস্তুতের কাজ চলছে এবং এ বিষয়ে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সরকার চায়, বিদেশি কারিকুলাম অব্যাহত থাকলেও প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, নিবন্ধন, নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে একটি একক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হোক।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীনতার পর থেকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো একটি বিশেষ ধারা হিসেবে বিকশিত হয়েছে। কিন্তু দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির প্রশ্নও সামনে এসেছে। সরকারের নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রথমবারের মতো এই খাত একটি সুসংহত প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আসবে। তবে নীতিমালার সফলতা নির্ভর করবে কতটা ভারসাম্যপূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার স্বাধীনতার মধ্যে সমন্বয় করা যায় তার ওপর।
আ.দৈ/আরএস




















