ডিএনসিসিতে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি- পর্ব ১
ই-রিকশা’ চালকদের ডিজিটাল আইন শেখাতেই ২০ কোটি টাকা খরচ, ৩০০ ল্যাপটপ গায়েব
আবুল কাশেম:

কথিত বুয়েটের তৈরি নকশায় ‘অটো রিকশা (ই-রিকশা)’ চালকদের ডিজিটাল আইন শিখানোর নামে প্রায় ২০ কোটি টাকা লোপাট এবং বিনা টেন্ডারে দ্বিগুন সাড়ে ৪ কোটি টাকায় কেনা ৩০০ ল্যাপটপ গায়েব করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তরা। ৩০০ ল্যাপটপ কিভাবে রাতারাতি গায়েব হয়েছে কেউ টেরপেলেন না। আরো পরিতাপের বিষয় হলো, কর্মকর্তারা নব্য বিএনপির লোকজ পরিচয়ে একদিকে কোটি কোটি টাকা লোপট করছেন অপর দিকে তথ্য গোপন করে চলছেন।
আরো গুরুত্ব অভিযোগ উঠেছে, ডিএনসিসির অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ও দপ্তরে বিভিন্ন আইটেমের জিনিসপত্র কেনা কাটা, রাস্তা- গলিপথ,ফুটপাত উন্নয়ন, সংস্কারের নামে গৃহিত নানা প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা লোপাট, মোটা অংকের কমিশন ভাগাভাগি এবং ভয়াবহ দুর্নীতির লাগাম টানার যেন কেউ নেই। এসব লোপাটের ফলে ডিএনসিসিতে ফান্ড সংকট ক্রমেই বাড়ছে। এবার বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পরই প্রকল্পের নামে ‘লোপাট ও দুর্নীতির’ বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন।
যারফলে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া ডিএনসিসিতে জনগণের ট্যাক্সের শত শত কোটি টাকা এবং সরকারের পক্ষ থেকে বরাদ্দ দেওয়া অর্থিক সহায়তা হাজার কোটি টাকা লোপাট বন্ধ হবে না। এমনকি লোপাটকারীদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গহণ কিংবা দুর্নীতি তদন্ত করার সহাস করো নেই। শুধু তাই নয় ডিএনসিসির এই সিন্ডিকেট প্রতিবছর সরকারি অডিট কমিটির কর্মকর্তাদের পর্যন্ত ম্যানেজ করার ক্ষমতা রাখেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ছাত্র জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্টি আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক মেয়র মো.আতিকুল ইসলামের রেখে যাওয়া কতিপয় দুর্নীতি পরায়ন ও লোপাটকারী সিন্ডিকেটের সদস্যরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেন। তার পরর্বতীতে (সাবেক) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের সাথে আতাত করে আগের সিন্ডিকেটকে আরো শক্তিশালী করেন। এই সিন্ডিটের সদস্যরাই নানা কৌশলে অপ্রয়োজনী অনেক কেনা কাটার নামে কোটি কোটি টাকা লোপাট করেন। তারা দ্রুত ডিএনসিসিকে ভয়াবহ দুর্নীতি আখড়ায় পরিনত করেন। ওই আগের সিন্ডিকেটর একটি বড় অংশ বর্তমান প্রশাসক মো.শফিকুল ইসলাম মিলটনের প্রশাসনের সাথে যুক্ত হয়েছেন বলে জানান অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে কথিত বুয়েটের তৈরি নকশায় ‘অটো রিকশা’ চালকদের ডিজিটাল আইন শিখানোর নামে প্রায় ২০ কোটি টাকা লোপাটের বিষয়টি নিয়ে গত বছর ৪ অক্টোবর (২০২৫ সাল) ‘আজকের দৈনিক পত্রিকায়’ একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল “যানজটের মারাত্নক হুমকিতে রাজধানী, বুয়েটের ‘ই-রিকশায়’ শত কোটি টাকার বাণিজ্যের মিশন ডিএনসিসির এবং উপ শিরোনামে ছিল- ‘আরো ২ লাখ ই রিকশা আসছে, যানজটের গ্যারাকলে ফেলার মহাপরিকল্পনা”। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা তো দূরের কথা ডিএনসিসির পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি পর্যন্ত গঠন করা হয়নি।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, রাজধানী ঢাকাকে ভয়ঙ্কর যানজটের গ্যারাকলে ফেলার পাাশাপাশি নিরীহ অটো রিকশা (ই-রিকশা) চালকদের পকেট হাতিয়ে কৌশলে শত কোটি টাকার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের শক্তিশালী সিন্ডিকেট। শত কোটি টাকা লোপাটের শক্তিশালী মিশন রয়েছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্মকর্তা,ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ, তার ভাগ্নে লিটন, আত্মীয় দালাল মাহবুবুর রহমান,পরিবহন বিভাগের জিএম মোহাম্মদ শওকত ওসমান, পরিবহন ম্যানেজার, তৎকালীন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার লোকজন এবং প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা অন্তর্বতীকালীন সরকারের অনেকটা নমনীয়তার সুযোগে রাষ্ট্রীয় আইন,বিধি অমান্য করে নানা কৌশলে সরকারি এবং নিরীহ রিকশা চালকদের পকেট হাতিয়ে শত কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য করার টার্গেট বাস্তবায়নে নেমেছেন।
তবে ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ না করার শর্তে “আজকের দৈনিক পত্রিকাকে” আক্ষেপের সাথে বলেন, পরিবহন বিভাগ এবং তৎকালীন তথ্য প্রযুক্তি বিভাগের (আইটি সেল) দায়িত্ব প্রাপ্ত একাধিক কর্মকর্তা, প্রধান হিসাব রক্ষন কর্মকর্তাসহ প্রশাসকের সিন্ডিকেটের সদস্যরা বোর্ড সভার অনুমোদন ছাড়াই বিনা টেন্ডারে পছন্দের লোকের মাধ্যমে ৩০০ ল্যাপটপ ক্রয় করেন। এছাড়াও রিকশা চালকদের ডিজিটাল আইন শিখানোর জন্য ট্রেনিংয়ের নামে ২০ কোটি লোপাট করেন। বর্তমানে ওই ৩০০ ল্যাপটপের কোন হদিস নেই। দ্বিগুন দামে ৩০০ ল্যাপটপ ক্রয়ের নামে সাড়ে ৪ কোটি টাকা খরচ করেছেন। ওই সব ‘এইচপি’ মডেলের প্রতিটি ল্যাপটপের বাজার মূল্য মাত্র ৬৫/৭০ হাজার টাকা। অথচ কেনা হয়েছে এক লাখ ৩০/৩৫ হাজার টাকা দরে। ডিএনসিসির ফান্ড থেকে তারা প্রায় ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানা যায়।
এদিকে গত বছর (২০২৫ সাল) ২৮ জুলাই তথ্য অধিকার আইনে, ফরম-ক, তথ্য প্রাপ্তির আবেদনপত্রের ছক মোতাবেক, আজকের দৈনিকের এ প্রতিনিধি তার নাম পরিচয় উল্লেখ করে, ডিএনসিসির তথ্য কর্মকর্তার মাধ্যমে অফিসিয়াল তথ্য উপাত্ত্ব পারার জন্য আবেদন করেন। উক্ত আবেদনে জানতে চাওয়া হয়েছে “ ডিএনসিসির ১০টি আঞ্চলিক অফিসে এবং নগর ভবনের নতুন কয়টি কম্পিউটার, কয়টি নতুন লেপটপ ক্রয় করা হয়েছে। কত টাকায় এসব ক্রয় করা হয়েছে। এসব ক্রয়ে ডিএনসিসির বোর্ড মিটিংএর অনুমোদন আছে কিনা, না করো মৌখিক নির্দেশে এবং সিদ্ধান্তে এসব লেপটপ ও কম্পিউটার ক্রয় করা হয়েছে।”
তবে গত ১১ মাসেও ডিএনসিসির জনসংযোগ দপ্তরের তথ্য কর্মকর্তার সাথে বার বার যোগাযোগ করে অফিসিয়াল কোন তথ্য পাওয়া য়ায়নি। আজ মঙ্গলবার (২ জুন) ‘দিপ্ত’নামে এক তথ্য কর্মকর্তা শেষ বারের মতো জানিয়েছেন, তিনি বার বার তাগিদ দেওয়া সত্বেও সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তারা তথ্য দিচ্ছেন না। কর্মকর্তারা তথ্য না দিলে ‘দিপ্তের’ পক্ষে করার আর কিছুই নেই।
উল্লেখ্য গত দেড় বছরে ডিএনসিসিতে আরো ৭/৮ টি বিষয়ে তথ্য অধিকার আইনে, ফরম-ক, তথ্য প্রাপ্তির আবেদনপত্রে ছক মোতাবেক আবেদন জানানো হয়েছে। কিন্তু কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য পেতে সরাসরি ডিএনসিসির একাধিক বিভাগীয় প্রধান, ক্রয় ও ভান্ডার বিভাগ এবং একাধিক প্রকৌশলীর সাথে যোগাযোগ করলে, তারা তথ্য অধিকার আইনে আবেদনের পরামর্শ দেন। কিন্তু আবেদন করলে তারা তথ্য না দিয়ে মাসের পর মাস সময় ক্ষেপন করেন। আগামি পর্বে ডিএনসিসির অন্য বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে।
আ. দৈ./কাশেম




















