স্থানীয় নির্বাচনের সাংবিধানিক ক্ষমতা পাচ্ছে ইসি!
শাহীন রহমান

নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের তৃণমূল গণতন্ত্রের ভিত্তি। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে নির্বাচন কমিশনকে এককভাবে নির্বাচন আয়োজন, তফসিল ঘোষণা এবং ভোটগ্রহণের ক্ষমতা দেয়া হলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা বাড়বে।
সাংবিধানিক দায়িত্ব অনুযায়ি নির্বাচন কমিশনের মুল কাজ চারটি। এর মধ্যে রয়েছে নির্ভুল ভোটার তালিকা করা, জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা করা। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করা। এছাড়াও রয়েছে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণের কাজ। এর বাইরে সারা বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কর্মযজ্ঞ ইসি পালন করলেও সংবিধানে এই দায়িত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই। যদিও ২০০৯ সালে আইনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা দায়িত্ব ইসিকে দেয়া হয়েছে। কিন্ত এই নির্বাচনের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ইসির হাতে নেই। ফলে মন্ত্রনালয়ের নির্দেশনা মেনে নির্বাচন পরিচালনা করতে হয় তাদের।
তবে জানা গেছে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনায় ইসিকে সাংবিধানিক দায়িত্ব দেয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব এখন বিএনপির হাতে। জানা গেছে দলটি স্থানীয় নির্বাচনের সাংবিধানিক দায়িত্ব ইসিকে দেয়ার পক্ষে। যদিও এই বিষয়টি নিয়ে দলের বা সরকারের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে তাদের ৫ বছরের ক্ষমতার মেয়াদের মধ্যেই সংবিধান সংশোধন করে দায়িত্ব ইসিকে দেয়ার পক্ষে রয়েছে দলটি।
গত জাতীয় নির্বাচনের আগে গুলশানের লেকশো’র হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিষয়টি স্পষ্ট করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। ওই অনুষ্ঠানে তিনি জানান বিএনপি ক্ষমতায় গেলে স্থানীয় নির্বাচনের সাংবিধানিক দায়িত্ব ইসির হাতে তুলে দেয়া হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ইসির হাতে এই দায়িত্ব গেলে নির্বাচনে মন্ত্রনালয়ের হস্তক্ষেপ কমবে। নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে ইসির স্বাধীনতা ও ক্ষমতা আরও বড়বে। যা গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকার পরিষদকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখবে। তাদের মতে স্থানীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা থেকে নির্বাচন পরিচালনা সব কিছুর ক্ষেত্রে সরকারের নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকতে হয়। কিন্তু সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকলে মন্ত্রনালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকতে হবে না।
তাদের মতে, বর্তমানে দেশের সংবিধানের ১১৮(৪) অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন বলা হলেও ১১৯ অনুচ্ছেদে প্রধানত রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচনের দায়িত্বই সুনির্দিষ্ট করা আছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়টি ‘আইন দ্বারা নির্ধারিত অন্য যে কোনো নির্বাচন’ হিসেবে ২০০৯ সালের ‘নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন’-এর ওপর নির্ভরশীল।
এই আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বিভিন্ন অজুহাতে নির্বাচন ঝুলিয়ে রাখা, সীমানা পুনর্নিধারণের নামে জটিলতা তৈরি করা কিংবা কমিশনের কাজের ওপর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সময়মতো ভোট করা সম্ভব হচ্ছে না। নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, এতদিন ইসি স্থানীয় নির্বাচন করলেও তার সুতো বাঁধা থাকত মন্ত্রণালয়ের হাতে। এই পরনির্ভরশীলতা কাটানোই এখন প্রধান লক্ষ্য।
দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে খুব বেশি বিতর্ক না থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বহুবার প্রশ্ন উঠেছে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণ, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ প্রায়ই সামনে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং নির্বাচন কমিশনের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের তৃণমূল গণতন্ত্রের ভিত্তি। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে নির্বাচন কমিশনকে এককভাবে নির্বাচন আয়োজন, তফসিল ঘোষণা এবং ভোটগ্রহণের ক্ষমতা দেয়া হলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা বাড়বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচন সংস্কার নিয়ে চলমান আলোচনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে জাতীয় নির্বাচনের মতোই একটি স্বতন্ত্র সাংবিধানিক দায়িত্ব হিসেবে কমিশনের হাতে ন্যস্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে কমিশনের অনুমোদন ছাড়া নির্বাচন পেছানো, প্রশাসনিকভাবে নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিত করা কিংবা রাজনৈতিক বিবেচনায় সময়সূচি পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত করার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও এ বিষয়ে ভিন্নমত থাকলেও একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি তুলেছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা শুধু ভোটগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভোটার তালিকা প্রণয়ন, নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ, নির্বাচনী বিধিমালা বাস্তবায়ন, নির্বাচনী অনিয়ম প্রতিরোধ এবং ফলাফল ঘোষণা সবই কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনও একই ধরনের স্বাধীন কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হওয়া উচিত।
তারা আরও বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে পুরোপুরি নির্বাচন কমিশনের আওতায় আনা হলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ কমবে। একই সঙ্গে নির্বাচনকালীন প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা সহজ হবে। বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনে অতীতে সহিংসতা, প্রভাব বিস্তার এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতের যে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো মোকাবিলায় শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এই সংস্কার বাস্তবায়িত হলে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের ধারণা তখন কেবল জাতীয় নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত সব স্তরের নির্বাচনে একই মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হবে। গণতন্ত্র ও সুশাসন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনও দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে নির্বাচন কমিশনের একক নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের মতে, তৃণমূল পর্যায়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় নির্বাচনকে জাতীয় নির্বাচনের সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতা আরও সুস্পষ্ট করার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন হবে না; বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। একই সঙ্গে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠন এবং তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক চর্চা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এ কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে চলমান সংস্কার আলোচনা এখন শুধু একটি প্রশাসনিক ইস্যু নয়; বরং দেশের ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কাঠামো এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের হাতে স্থানীয় নির্বাচনের সাংবিধানিক ক্ষমতা আরও সুস্পষ্টভাবে ন্যস্ত হলে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আ.দৈ/আরএস




















