সাগর মহাসাগরে সক্রিয় এল নিনো
বর্ষা আসলেও বৃষ্টিপাত কমার আশঙ্কা
শাহীন রহমান

দেশের ৩৪ জেলায় মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার তথ্য দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এ তাপপ্রবাহ আরো তিন দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক। এদিকে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে এই সপ্তাহ শেষে মৌসুমি বায়ু বা বর্ষা দেশে প্রবেশ করতে পারে। তবে বর্ষা আসলেও অন্যবারের চেয়ে এবারে বৃষ্টিপাত তুলনামুলক কম হতে পারে। কারণে আবহাওয়ায় এল নিনোর প্রভাব সক্রিয় হয়ে উঠছে।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে সোমবার টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, নরসিংদী, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, বরিশাল ও ভোলা, রাজশাহী বিভাগের আট জেলা, রংপুর বিভাগের আট জেলা এবং খুলনা বিভাগের ১০ জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এ মৌসুমে তাপপ্রবাহ স্বাভাবিক। এ তাপপ্রবাহ আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল মান্নান বলেন, মৌসুমি বায়ু দেশে আসলে বৃষ্টিপাতে তখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে। প্রাকবর্ষায় প্রতি বছর এ সময় সাধারণত প্রকৃতিতে আদ্রতা বেড়ে ভ্যাপসা অনুভূতি বাড়ে। এবারও এর ব্যতিক্রম নেই। তবে আবহাওয়ায় এল নিনোর প্রভাব সক্রিয় হচ্ছে। ফলে প্রকৃতিতে বিরূপ আচরণ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং আঞ্চলিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বা বর্ষা আগামী ৭ দিনের মধ্যে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল অর্থাৎ টেকনাফ ও কক্সবাজার অঞ্চল দিয়ে দেশে প্রবেশ করতে পারে। মৌসুমি বায়ু দেশে প্রবেশের এই স্বাভাবিক সময়কে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই বঙ্গোপসাগরের বায়ুপ্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, জুনের প্রথম সপ্তাহে মৌসুমি বায়ু উপকূলে আসার পর, জুনের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে তা সারা দেশে বিস্তৃতি লাভ করবে। এর ফলে দেশজুড়ে আনুষ্ঠানিক বর্ষা শুরু হবে। চলমান অস্বস্তিকর গরম থেকে দেশবাসী মুক্তি পাবে। তবে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) সতর্ক করে জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব ও মহাসাগরে ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি সক্রিয় থাকার কারণে এবার বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা কম বৃষ্টিপাত হতে পারে।
আবহাওয়া অফিসের গাণিতিক মডেল ও উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে মৌসুমি বায়ুর যে গতিপ্রকৃতি পাওয়া গেছে, প্রথম পর্যায় ১ থেকে ৩ জুন টেকনাফ, কক্সবাজার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উপকূলে আগমন করতে পারে। দ্বিতীয় পর্যায় ৪ থেকে ৭ জুন চট্টগ্রাম বিভাগ, বরিশাল এবং ঢাকা বিভাগের কিছু অংশে বিস্তার লাভ করবে। তৃতীয় পর্যায় ৮ থেকে ১৫ জুন খুলনা, রাজশাহী, রংপুর ও সিলেটসহ সারা দেশে পূর্ণাঙ্গ বর্ষার সক্রিয় হবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের গত ৩০ বছরের উপাত্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশে মৌসুমি বায়ু প্রবেশের স্বাভাবিক সময়কাল ধরা হয় ১ জুন। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত কয়েক বছর ধরে এর আগমন সময় ২ থেকে ৫ দিনের তারতম্য ঘটছে। এবারও জুন মাসের প্রথম সপ্তাহের প্রথমার্ধেই বর্ষা সম্পূর্ণ কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছে বর্ষার আগমনী বার্তা জনজীবনে স্বস্তি নিয়ে এলেও, কৃষি ও পরিবেশ বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে বৈশ্বিক আবহাওয়ার একটি বিশেষ আচরণ। সাউথ এশিয়ান ক্লাইমেট আউটলুক ফোরাম এবং দেশীয় আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের যৌথ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চলতি বছর প্রশান্ত মহাসাগরে ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
এল নিনো সক্রিয় থাকার অর্থ হলো, মৌসুমি বায়ু স্বাভাবিক সময়ে এলেও জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের সামগ্রিক বর্ষা মৌসুমে দেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কম হতে পারে। আবহাওয়াবিদরা এই পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করে ৩টি প্রধান আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে বর্ষার মূল মাসগুলোতে (আষাঢ়-শ্রাবণ) যদি পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হয়, তবে দেশের উত্তরাঞ্চল ও বরেন্দ্র এলাকায় আমন চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
কম বৃষ্টির কারণে নদী-নালা ও জলাশয়গুলো আশানুরূপভাবে ভরাট না হলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়বে, যা সেচ ব্যবস্থার খরচ বাড়িয়ে দেবে। মৌসুমি বায়ু পুরোপুরি সক্রিয় হওয়ার আগে বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে তীব্র কালবৈশাখী ঝড়, শিলাবৃষ্টি এবং আকস্মিক বজ্রপাতের ঘটনা সাধারণ সময়ের চেয়ে বাড়তে পারে।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, বর্তমানে ভারতের কেরালা উপকূলে মৌসুমি বায়ু বেশ সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে এবং তা দ্রুত গতিতে বঙ্গোপসাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশের উপকূলে এর প্রভাবে ইতিমধ্যেই দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে বাতাস বইতে শুরু করেছে। সাগরে এই মুহূর্তে কোনো গভীর নিম্নচাপ বা লঘুচাপ নেই।
তবে যদি আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বঙ্গোপসাগরে নতুন কোনো লঘুচাপ তৈরি হয়, তবে তা মৌসুমি বায়ুকে আরও দ্রুত টেনে আনবে। এর ফলে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে জুনের ৩ তারিখের আগেই ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে এবং জেলেদের গভীর সাগরে সাবধানে চলাচল করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গত কয়েক দিনের আবহাওয়া উপাত্ত অনুযায়ী, দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। বাতাসে আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৭০ শতাংশের ওপরে থাকায় মানুষের শরীরে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে। বর্ষার প্রথম বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার সাথে সাথেই দেশের তাপমাত্রা ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমে আসবে।
কৃষি ও অর্থনীতিতে বর্ষার প্রভাব: বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা মূলত বর্ষাকালের বৃষ্টিপাতের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। বিশেষ করে দেশের প্রধান দানাদার ফসল আমন ধানের আবাদ সম্পূর্ণ বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করে। বিশেষজ্ঞরা বলছে আমাদের দেশে জুনের প্রথম সপ্তাহে বর্ষা আসাটা অত্যন্ত ইতিবাচক।
এটি কৃষকদের আমন ধানের বীজতলা তৈরি এবং রোপণের জন্য উপযুক্ত সময় দেবে। তবে আমাদের মাথায় রাখতে হবে ‘এল নিনো’র প্রভাবের কথা। যদি মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে বৃষ্টি কমে যায়, তবে কৃষকদের সেচের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা চাষের খরচ বাড়িয়ে দেবে। সরকারকে এখনই সেচ পাম্পগুলো সচল রাখার এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে।
আ.দৈ/আরএস




















