রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মূল্যস্ফীতির কোপে মধ্যবিত্ত
এবারে কোরবানি কমেছে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ
শাহীন রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন, ২০২৬, ৬:৩৮ পিএম  আপডেট: ০২.০৬.২০২৬ ৪:৪৮ পিএম  (ভিজিট : ৯৫)
X

পকেট খালি মধ্যবিত্তের, অবিক্রীত লাখ লাখ পশু, খামারিদের মাথায় হাত 
টানা কয়েক বছরের লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় এবং সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দার সরাসরি কোপ পড়েছে দেশের পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানির বাজারে। ধর্মীয় আবেগ ও ত্যাগী মনোভাব অক্ষুন্ন থাকলেও, পকেটের নিষ্ঠুর বাস্তবতার কাছে হার মেনেছেন দেশের একটি বড় অংশের মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং দেশের পশুর হাটগুলোর সাম্প্রতিকতম সংগৃহীত তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার দেশে পশু কোরবানির সংখ্যা কমে গেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে দেশে কোরবানি কমেছে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ। যেখানে ২০২৪ সালে দেশে কোরবানি হয়েছিল ১ কোটি ৪ লাখেরও বেশি গবাদিপশু, সেখানে অর্থনৈতিক সংকটের ধারাবাহিকতায় তা এবার প্রায় ৯০ থেকে ৯১ লাখের ঘরে এসে ঠেকেছে। এর ফলে দেশের হাজার হাজার প্রান্তিক খামারি অবিক্রীত পশু নিয়ে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামার সংকেত দিচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের গত তিন বছরের তুলনামূলক ডাটাবেজ এবং বাজার বিশ্লেষকদের প্রতিবেদন আমলে নিলে কোরবানির এই নিম্নমুখী প্রবণতা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালে কোরবানি হয়েছিল ১ কোটি ৪ লাখ ২০ হাজার গবাদি পশু। এই হার কোভিড-পরবর্তী সময়ে বাজার স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ ছিল। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার। এক বছরেই কোরবানি কমে যায় প্রায় ১৩ লাখ। এ বছর কোরবানি হয়েছে ৯০ লাখের নিচে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১০-১২ লাখ কম কোরবানি হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন ও মাঠপর্যায়ের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৯ সালের করোনা-পূর্ববর্তী সময়ে যেখানে শুধু গরুর কোরবানির সংখ্যাই ছিল প্রায় ৫৬ লাখ, সেখানে বর্তমানে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে ৪২ থেকে ৪৫ লাখের ঘরে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, মধ্যবিত্তের মাংসের প্রধান উৎস গরুর কোরবানি সবচেয়ে বেশি মার খেয়েছে।

কোরবানির বাজার সংকুচিত হওয়ার প্রধান ৪ কারণ
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে কোনো ঘাটতি না থাকলেও, মূলত চারটি প্রধান কারণে এবার কোরবানি দেওয়ার হার এতটা কমে গেছে। প্রথমত গত দুই বছর ধরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ৯.৫%-এর ওপরে অবস্থান করছে। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় মেটাতেই সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। সঞ্চয় শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় মধ্যবিত্তদের বড় অংশ এবার কোরবানি দেয়ার সামর্থ্য হারিয়েছেন। দ্বিতীয়ত খামারিদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, খৈল, ভুষি, খড় এবং ওষুধের দাম গত এক বছরে ৪০ শতাংশ থেকে ৫০শতাংশ বেড়েছে। ফলে একটি গরু বা ছাগল লালন-পালনের খরচ অনেক বেশি। স্বাভাবিকভাবেই বাজারে এবার পশুর দাম ছিল সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।

এর বাইরে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় বড় শহরের প্রধান পশুর হাটগুলোতে দেখা গেছে, আগে যারা একা একটি গরু দিতেন, তারা এবার ৩ থেকে ৪ জন মিলে ভাগে কোরবানি দিয়েছেন। আর যারা আগে ভাগে দিতেন, তাদের অনেকেই এবার পুরোপুরি কোরবানি থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়েছেন। বাজেটের সাথে মেলাতে না পেরে এবার অনেক পরিবার গরুর পরিবর্তে ছাগল বা ভেড়া কোরবানি দিয়েছেন। তবে ছাগলের বাজারও চড়া থাকায় সামগ্রিক কোরবানির সংখ্যায় এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এবারও দেশের খামারিদের কাছে প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ থেকে ১ কোটি ২৪ লাখ কোরবানিযোগ্য গবাদিপশু প্রস্তুত ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে আশা করা হয়েছিল, এবার চাহিদা কিছুটা বাড়বে। কিন্তু বাস্তবতার চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। রাজধানীর গাবতলী ও আফতাবনগর পশুর হাটে এবার শত শত ব্যাপারী ও খামারি তাদের পশু বিক্রি করতে না পেরে ফেরত নিয়ে গেছে।  কুষ্টিয়া থেকে আসা খামারি আবদুর রহমান বলেন, “পাঁচটা বড় গরু নিয়ে এসেছিলাম, মাত্র দুইটা বিক্রি করতে পেরেছি পানির দামে। বাকি তিনটা ফেরত নিতে হয়েছে। যে টাকা লস হলো, তাতে আগামী বছর খামার চালানো সম্ভব না।

বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা অনুযায়ী, এবার পশুর হাটে আসা মোট পশুর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ অবিক্রীত রয়ে গেছে। এই বিপুল পরিমাণ অবিক্রীত পশুর পেছনে খামারিদের প্রতিদিন যে বাড়তি খাদ্য ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ হবে, তাতে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামার ব্যাংক ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। রাজধানীর ভাটারার ছোলমাইদ এলাকার নর্থ বেঙ্গল ডেইরি ফার্মের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইঞ্জিনিয়ার মকবুল হোসেন বলেন, ‘এবার ভাগে কোরবানি বেড়েছে। গতবার আমাদের খামার থেকে যে পরিমাণ ভাগে কোরবানি হয়েছিল তার তুলনায় এবার হয়েছে দ্বিগুণের বেশি। এছাড়া অনেকে কোরবানিও করেননি। আমার খামার থেকে প্রতিবার গরু নেন কিংবা ভাগে কোরবানি করতেন এমন অনেক ক্রেতাকে পেয়েছি যারা এবার কোরবানি করেননি।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘লম্বা সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতির মন্দা ভাব মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় প্রভাব ফেলেছে। যার কারণে মানুষকে কোরবানির পশু কিনতে গিয়েও ভাবতে হয়েছে। গত কয়েক মাসে যে হারে মূল্যস্ফীতি হয়েছে সেভাবে মজুরি বাড়েনি, এটি একটি কারণ। 

গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা:  এছাড়াও এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, চামড়া শিল্প এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন কোরবানির অর্থনীতি বাংলাদেশের গ্রামীণ ক্যাশ ফ্লো (নগদ টাকার প্রবাহ) সচল রাখার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। চামড়া শিল্প, পরিবহন খাত, কসাইদের পারিশ্রমিক এবং মসলার বাজার সবকিছুই এই সময়টাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। কোরবানি ১৫ লাখ কমে যাওয়া মানে অর্থনীতি থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাওয়া হয়ে যাওয়া। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা আরও কমিয়ে দেবে। একই কারণে চামড়া ব্যবসায়ীরাও চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। কোরবানি কম হওয়া মানে কাঁচা চামড়ার সরবরাহ কমে যাওয়া। এর ফলে দেশের ট্যানারি শিল্প কাঁচামাল সংকটে পড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে দ্রুত দুটি পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখতে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা অবিক্রীত পশু নিয়ে দেউলিয়া হয়ে না যান। দ্বিতীয়ত, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান শত্রু ‘মূল্যস্ফীতি’ নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি ও বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের পকেটে টাকা না ফিরলে, আগামী বছরগুলোতে কোরবানির এই নিম্নমুখী প্রবণতা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝