বর্জ্য অপসারণ, ময়লা স্থান পরিস্কার ডেঙ্গু প্রতিরোধ পরিদর্শনে মাঠে রয়েছে ২০টি টিম
ডিএনসিসিতে কোরবানির বর্জ্য নিয়ে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত চলছে , বিভাগীয় প্রধান বিদেশ ভ্রমণে ব্যস্ত
আবুল কাশেম

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) আর্থিকভাবে অত্যন্ত দৃর্বল ,সত্বেও কতিপয় পদস্থ কর্মকর্তা বিদেশ ভ্রমণে বেশ আগ্রহী। গত দুই বছরে শুধু বিদেশ ভ্রমণেই ডিএনসিসির কর্মকর্তারা প্রায় শত কোটি টাকা খরচ করেছেন। এই টাকার মধ্যে রয়েছে জনগণের ট্যাক্সের টাকা, সরকারের অর্থ এবং পছন্দের ঠিকাদারের বিশেষ সহয়তা। ওইসব কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ও অফিসিয়াল পাসপোর্ট জমা নিয়ে পরীক্ষ করলে চাঞ্চল্যকর অনেকতথ্য বেরিয়ে আসবে বলে অনেকের অভিমত রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডিএনসিসির প্রশাসকের দপ্তরসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একাধিক প্রতিনিধিসহ ‘কয়েক ডজন’ প্রভাবশালী পদস্থ কর্মকর্তা দফায় দফায় ঘুরে ফিরে কখনো বিদেশে প্রশিক্ষণ, কখনো সেমিনা, আবার কখনো কোটি কোটি টাকার ওয়ুধ ,মালামাল ও যন্ত্রপাতি কেনা কাটার দলবলে বিদেশে বিলাশী ভ্রমণ করেছেন। তাদের এসব ভ্রমণে লাখ লাখ খরচ হচ্ছেন। শুধু তাইনয়, এইসব ভ্রমণে দফায় দফায় অপ্রেয়োজনীয় এবং পছন্দের লোকজনকেই বেশি সুযোগ দেওয়া হচ্ছেন। ফলে অভিযোগ উঠেছে বিদেশ ভ্রমণে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচের। কিন্তু ফলাফল শূণ্য। ডিএনসিসিতে চলমান সংকট সত্বেও কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ হচ্ছে না।
একদিকে প্রধানমন্ত্রীর আকষ্মিক নগরীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন নিয়ে ঢাকা দুই সিটির ২০টি আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকতা, আঞ্চলিক সহকারী প্রধান বর্জ্য ব্যবস্তাপনা কর্মকর্তা এবং স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের যেন ঘুম নেই। ঠিক সেই পরিস্থিতিতে ডিএনসিসিতে কোরবানি ও পশুর হাটের বর্জ্য ফেলে রেখেই ইতালি ভ্রমণে গেলেন বেশ কয়জন দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা।
এদিকে নাম নাম না প্রকাশের শর্তে ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তা ‘আজকের দৈনিক পত্রিকাকে’ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় এবার কোরবানির বর্জ্য অপসারণ, ময়লা পানি দ্রুত নিষ্কাশন, ওই ময়লা স্থান পরিস্কার এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে গৃহিত ব্যবস্থা সম্পর্কে সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য ২০টি টিম গঠন করা হয়েছে।
ওই নিদের্শনার আলোকে ঢাকার দুই সিটিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সিনিয়র সহকারী সচিব, সহকারী সচিব ও উপ সচিব পদ মর্যাদার ২০ জন কর্মকর্তার সমন্বয়ে পৃথক ২০টি মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিকে আজ ১ জুনের ( সোমবার) প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ের গঠিত মনিটিরিং টিম সরেজমিন পরিদর্শন শুরু করেছেন ।
ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তা আরো জানান, ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীরের নেতৃত্বে একটি টিম ইতালি ভ্রমণে গেছেন । এই টিমে রয়েছেন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগরে নির্বাহী প্রকৌশলী (সিএন্ডটি) (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফজলে রাববী, বর্তমান প্রশাসকের সহকারী একান্ত সচিব আল-আমীন আলম প্লাবন এবং মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা। এবার প্রশ্ন দাড়িয়েছে উক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত স্থায়ী চাকরিজীবীদের বিদেশ ভ্রমণ পরিবর্ততে অস্থায়ী চাকরিজীবীরা কেনো যাচ্ছেন। কারণ রাজনৈতিক বিবেচনায় সহকারী একান্ত সচিব আল-আমীন আলম প্লাবনের মেয়াদও ঠিক এক বছরই। তার বিদেশ ভ্রমণ ডিএনসিসি কতটুকু লভেবান হবে। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের যে কর্মকর্তা এই ভ্রমণে থাকছেন, তার অভিজ্ঞতাই বা ডিএনসিসির কি উপকারে আসবে। এধরনের অনেক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ডিএনসিসির কর্মকর্তারা আক্ষেপ করে “ঐতিহাসিক একটি প্রবাদ বাক্য বলেছেন, ‘এক সময় রোম শহর আগুনে পোড়ছিল, আর ওই সময় নিরু নামে একজন নিরবে করুন সুরে বাঁশি বাজাচ্ছিল।’ এই প্রবাদ বাক্যটি আজ ডিএনসিসিতে মিলে যাচ্ছে।” কারণ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ডিএনসিসিতে কোরবানির বর্জ্য অপসারণের ব্যর্থতায় একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা,প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ও সহকারী প্রধান প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঢাকা দুই সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকতাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতেতে কিভাবে ডিএনসিসির কর্মকর্তারা ইতালি ভ্রমণে যাবার সাহস পেলেন। নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে প্রতিবছর লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে দফায় দফায় দলবলে বড় বড় টিম নিয়ে চীন, জাপান, আমেরিকা, সিংগাপুর, মালয়েশিয়া, জার্মান, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণে যান।
মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে যখন ডিএনসিসিতে কোরবানির হাট ও কোরবানরি বর্জ্য অপসারণ নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। ঠিক সে সময়ে প্রতিটি অফিসার কোরবানির সময় মাঠ পর্যায়ে নিয়োজিত ছিল। এ পরিস্থিতিতে ডিএনসিসির একটি টিম ইতালিতে অবস্থান করছিল। এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
আরো অভিযোগ রয়েছে, ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম মিলটন দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রীর সামনে আগের প্রশাসকের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, লোপাট ,অপ্রয়জনীয় খাতে অর্থ ব্যয় এবং এই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকটের বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের টানা দুই মাসের বেতন ভাতা পরিশোধ করার মতো টাকাও নাকি ফান্ডে ছিল না। কিন্তু তিনি নিজেও সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের স্টাইলে অপ্রয়োজনীয় খাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় শুরু করেছেন। রাজনৈতিক বিবেচনায় সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে একজনকে তিনি নিয়োগ দিয়েছেন। এই কর্মকর্তাই ডিএনসিসিকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিনত করেছেন। তাকে নিয়েই ডিএনসিসির টপ টু বটম বেশ আলোচনা চলছে ।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং বর্তমান সরকারের জারি করা অফিস আদেশ অমান্য করে অপ্রয়োজনীয় একাধিক ব্যক্তিকে সাথে নিয়ে ‘ক্রয় সংক্রান্ত বিষয়কে পুঁজি করে ইতালিসহ কয়েকটি দেশে বিলাশী ভ্রমণ যাচ্ছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একটি টিম। অর্থিকভাবে দুর্বল ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ডিএনসিসির অর্থ ব্যয় করে ইতালিসহ বেশ কয়টি দেশ ভ্রমণকে কেন্দ্র করে ডিএনসিসিতে নানা সমালোচনা শুরু হয়েছে।
সূত্র মতে, গত ৩০ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ-১ থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে এই নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, অর্থ বিভাগ থেকে ২০১২ সালের ৯ অক্টোবর জারিকৃত ‘সরকারি কাজে বিদেশ ভ্রমণকালে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রাপ্য ভ্রমণ ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা’ সংক্রান্ত নীতিমালার অনুচ্ছেদ ২১(খ)-এ যা-ই থাকুক না কেন, বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যয় সংকোচনের লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।এবার সরকারি ব্যয় সংকোচনের লক্ষ্যে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে নতুন কড়াকড়ি আরোপ করেছে সরকার।
আ. দৈ./কাশেম




















