ক্ষুধার রাজ্যে সুবাস ছড়ায় যে শিশুকন্যা
নিজস্ব প্রতিবেদক :

যে বয়সে ডানপিটে শৈশবের মাতাল হাওয়া গায়ে মেখে মেতে ওঠার কথা ছিল পুতুলখেলায়, পিঠে থাকার কথা ছিল রঙিন স্কুলব্যাগ আর হাতে নতুন বই-খাতা—সেই বয়সে এক জোড়া কোমল হাত আজ শক্ত করে ধরে আছে রজনীগন্ধা আর গোলাপের মালা।
অন্যদের চোখে যা কেবলই সুবাসিত ফুল, তার কাছে তা ক্ষুধার অন্ন জোগানোর একমাত্র হাতিয়ার। ঢাকার ফুসফুসখ্যাত রমনা পার্কের প্রতিটি চেনা গলিতে সে আজ এক অক্লান্ত পথচারী; কাঁধে তার শৈশবের আনন্দ নয়, চেপে বসেছে জীবনের নির্মম এক বোঝা।ওদের আছে আনেক স্বপ্ন। কেউ মডেল হতে চায় কেউ সরকারী চাকরি করবে। কেউ উকিল ইত্যাদি। ওদের স্বপ্েনর শেষ নেই।মডেল হওয়ার স্বপ্ন।
ভোরের কুয়াশা কিংবা চড়া রোদের আলো ফুটতেই তার যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধ কোনো বীরত্বের নয়, এ যুদ্ধ প্রতিদিনের ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে টিকে থাকার এক নীরব সংগ্রাম। বাতাসে ওড়ে ধুলোমাখা এলোমেলো চুল, পায়ে জড়িয়ে থাকে এক জোড়া মলিন ছেঁড়া স্যান্ডেল, আর চোখের কোণে জমে থাকে এক মহাসমুদ্র ক্লান্তি।

“একটা মালা নিন না স্যার... মাত্র বিশটা টাকা দিয়েন...” কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে, দ্বিধা আর জড়তা জড়ানো কণ্ঠে সে যখন এই আকুতি জানায়, তখন তার চোখের অতলান্তে খেলা করে এক চিলতে আশা আর এক বুক নীরব ভয়। এই ব্যস্ত শহরে মানুষের প্রতিক্রিয়ারও কত রূপ! কেউ হয়তো মায়ায় পড়ে কিনে নেয় একগুচ্ছ মালা, কেউ আবার বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে রুক্ষ স্বরে বলে ওঠে—“যাও তো, সামনে থেকে সরো!” তবে মাঝেমধ্যে কোনো এক সহৃদয় পথিক যখন মমতার হাত বাড়িয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, তখন মুহূর্তের জন্য হলেও এই কঠোর পৃথিবীতে সে খুঁজে পায় পরম এক ভালোবাসার স্পর্শ।
আসলে, এই শিশুকন্যাটি কেবল ফুল বিক্রি করে না; সে যেন প্রতিদিন রমনার ফুটপাতে ফেরি করে বেড়ায় তার নিজের ছোট ছোট রঙিন স্বপ্নগুলো। অসুস্থ মা-বাবার মুখে একমুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার তাগিদ, কিংবা ছোট ভাইবোনের পড়ার খরচ জোগানোর এক অদৃশ্য দায় চেপে বসেছে তার এই ছোট্ট কাঁধে। জীবনের রূঢ় বাস্তবতা তাকে সময়ের আগেই বড় বানিয়ে দিয়েছে।
পথচলতি মানুষের ভিড়ে কেউ তাকে ভাবে পথের ভিখারিনী, কেউ বা মনে করে এক বিরক্তিকর উপদ্রব। কিন্তু সেই মেকি হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য আর্তনাদ আর চোখের কোণের জমাট বাঁধা জল কজনই বা দেখতে পায়? কেউ কি জানতে চায়, তারও মনে একদিন ডাক্তার, শিক্ষক কিংবা রঙ-তুলির শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন জেগেছিল? এক বুক অভিমান নিয়ে আজ সেই স্বপ্নগুলো হারিয়ে গেছে নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে।
তবুও নিয়তির প্রতি তার কোনো নালিশ নেই, কোনো অভিযোগ নেই আকাশের কাছে। সে এক অদ্ভুত জীবনবোধ থেকে শিখে গেছে—চোখের জল ফেললে ফুল বিক্রি হয় না, ক্ষুধা মেটে না। তাই সব কষ্ট আড়াল করে মুখে এক কৃত্রিম কিন্তু মায়াবী হাসি ফুটিয়ে সে রোজ ছুটে চলে। ছোট্ট দুটি কাঁধে এক বিশাল পৃথিবীর দায়িত্ব নিয়ে সে অপেক্ষা করে আরেকটি নতুন সকালের, আরেকটি নতুন আশার।
আ. দৈ./কাশেম/ হেলাল




















