প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব দাখিল ইসির আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ
শাহীন রহমান

মাঠের বাস্তব ব্যয় ও জমা দেয়া হিসাবের মধ্যে ব্যবধান থাকায় নির্বাচনী অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হচ্ছে
নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাব দাখিল না করায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ২১ জন প্রার্থীকে জেল-জরিমানার হুঁশিয়ারি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব না দেওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নিতে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনাও দিয়েছে সংস্থাটি।
ইসির উপ-সচিব মোহাস্মদ মনির হোসেনের পাঠানো চিঠিতে এই হুশিয়ারি দেয়া হয়েছে। ইসির আইনে প্রার্থীরাদের হিসাব দেয়া বাধ্যতামুলক হলেও তা কখনো যাচাই বাছাই করে না ইসি। এখন পর্যন্ত কোন প্রার্থী ইসির ব্যয়সীমা অতিক্রম করেছে কিনা তা যাচাই করে ব্যবস্থা নিতেও দেখা যায়নি। শুধু হিসাব দাখিল না করলে কাগজে কমলে জরিমানার হুশিয়ারি দেয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন নির্বাচন শেষে প্রার্থীদের আয়-ব্যয়ের হিসাব নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দেয়ার বিধান আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে এর কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব জমা দেয়ার কথা থাকলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রক্রিয়া এখন অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। মাঠের বাস্তব ব্যয় ও জমা দেয়া হিসাবের মধ্যে ব্যবধান থাকায় নির্বাচনী অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে নির্বাচনী ব্যয়ের বিবরণ নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। এতে প্রচারণার উৎস, ব্যয়ের খাত, এবং সংশ্লিষ্ট ভাউচার ও নথিপত্র সংযুক্ত করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, কাগজে-কলমে এই নিয়ম থাকলেও বাস্তবে এর সঠিক যাচাই ও নিরীক্ষা প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের মতে নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব ব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। তারা বলছেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রার্থীরা নিজেদের ব্যয় নির্ধারিত সীমার মধ্যে দেখালেও বাস্তব প্রচারণায় তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় হয়, যা হিসাবের বাইরে থেকে যায়। সুজন সম্পাদক অধ্যাপক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ থাকলেও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না। তার মতে, “আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল। ফলে যারা বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারে তারা নির্বাচনে বাড়তি সুবিধা পায়, আর এটি নির্বাচনকে অসম প্রতিযোগিতায় পরিণত করে। তিনি আরও বলেন, ব্যয়ের তথ্য যদি স্বাধীনভাবে যাচাই ও জনসমক্ষে প্রকাশ করা না হয়, তাহলে স্বচ্ছতার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ব্যবস্থায় প্রার্থীর দেয়া হিসাবের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে। ব্যাংক লেনদেন, ডিজিটাল পেমেন্ট, বিজ্ঞাপন ব্যয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং স্থানীয় পর্যায়ের অঘোষিত খরচ এসব অনেক ক্ষেত্রেই আলাদাভাবে যাচাই করা হয় না। ফলে কাগজে প্রদর্শিত ব্যয় ও বাস্তব ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক থেকে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বলেন, নির্বাচনী অর্থায়নের স্বচ্ছতা গণতন্ত্রের জন্য মৌলিক শর্ত। তার মতে, “নির্বাচনে অর্থের প্রভাব যত বাড়ে, রাজনৈতিক সমতার সুযোগ তত কমে যায়। ব্যয়ের হিসাব যদি কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়, তাহলে সেটি জনআস্থার সংকট তৈরি করে।” তিনি আরও যোগ করেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যয়ের ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু না করলে এই সংকট কাটানো কঠিন।
সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনী ব্যয়ের অনিয়ম শুধু আইন লঙ্ঘনের বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করে। যারা বেশি অর্থ ব্যয় করতে সক্ষম, তারা মাঠে প্রচারণায় বেশি প্রভাব ফেলতে পারে যা তুলনামূলক কম সম্পদশালী প্রার্থীদের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করে। এতে ভোটের প্রতিযোগিতা অনেক সময় “অর্থনির্ভর” হয়ে পড়ে।
ইসির সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা বলছেন, কমিশনের নজরদারি ব্যবস্থায় জনবল ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জমা দেয়া হিসাব মূলত গ্রহণ করা হয়, কিন্তু এর গভীর নিরীক্ষা বা মাঠপর্যায়ে যাচাই সব সময় সম্ভব হয় না। ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), বিজ্ঞাপন সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য সমন্বয় করে বিশ্লেষণ করার মতো সমন্বিত কাঠামো এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।
ইসি কর্মকর্তারা দাবি করেন, নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতা বাড়াতে ধাপে ধাপে কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অনলাইন ভিত্তিক রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু, ব্যয়ের ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ এবং অভিযোগ তদন্তের প্রক্রিয়া শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি নির্বাচনী ব্যয়ের তথ্য ধীরে ধীরে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে, যাতে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ তা যাচাই করতে পারে। তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রযুক্তি নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ আইন থাকলেও যদি তা কঠোরভাবে প্রয়োগ না হয়, তাহলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তারা বলছেন, নির্বাচনী ব্যয়ের সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রায় সব বড় নির্বাচনে ওঠে, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া দেখা যায়।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, নির্বাচনী ব্যয়ের তথ্য শুধু কমিশনে জমা রাখলে হবে না, তা সহজবোধ্যভাবে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। এতে ভোটাররা জানতে পারবেন কোন প্রার্থী কত ব্যয় করছেন এবং সেই অর্থের উৎস কী। একই সঙ্গে মিথ্যা তথ্য দিলে কঠোর শাস্তির বিধান কার্যকর করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। এটি শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়, বরং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির মৌলিক অংশ। তাই কাগজে-কলমে থাকা বিধানকে বাস্তব প্রয়োগে রূপ দিতে না পারলে নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি প্রশ্ন থেকেই যাবে—নির্বাচনের প্রকৃত ব্যয় কত, আর ঘোষিত হিসাব কতটা বাস্তবসম্মত।
আ.দৈ/আরএস




















