রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সংসদ ভবনে এক মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার উদ্বোধন প্রধানমন্ত্রীর
ঢাকাজুড়ে রুফটপ সোলারে বড় পরিকল্পনা সরকারের
নতুন ভবনে বাধ্যতামূলক হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা
শাহীন রহমান
প্রকাশ: রোববার, ২৪ মে, ২০২৬, ৬:৫৪ পিএম  আপডেট: ২৪.০৫.২০২৬ ৭:৩০ পিএম  (ভিজিট : ১০১)
X

বিদ্যুত সংকটের মধ্যে দেশে সবচেয়ে আলোচিত যে বিষয়টি সামন্যে আসছে তা হলো সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার। এক সময় সোলার হোম সিস্টেমে গ্রামে গঞ্জে বিদ্যুত ব্যবহার হলেও সম্প্রতি গ্রিডেও যুক্ত হয়েছে। প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত এখন গ্রিডে যোগ হচ্ছে। 

নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর  সৌর বিদ্যুত উৎপাদনের উপর জোর দিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে ১ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন সোলার অন গ্রীড রুপটপ প্যানেল বসানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর উদ্বোধন করেন।

এ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতীয় সংসদ ভবনে এক মেগাওয়াট রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার উদ্বোধনের মাধ্যমে একটা বার্তা আমরা স্পষ্টভাবে দিতে পারব। সেটি হচ্ছে, বাংলাদেশ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, সবুজ অর্থনীতি এবং আত্মনির্ভরশীল শক্তি ব্যবস্থার পথে ধীরে ধীরে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে ঢাকার রুপটপ সোরাল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে অসংখ্য ভবনের ছাদই হয়ে উঠতে পারে দেশের নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র।

জানা গেছে বিগত অন্তবর্তী সরকার সরকার রুপটপ সোলার থেকে বিদ্যুত উৎপাদনের একটি নীতিমালা অনুমোদন করেছে। নীতিমালা অনুযায়ি ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ৪০ সালের মধ্যে সোলার থেকে ৩০ শতাংশ বিদ্যুত উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর ২৯ জুন উপদেষ্টা পরিষদের বেঠকে এই নীতিমালা বা গাইডলাই অনুমোদন  করা হয়। 

ডেসকো সুত্রে জানা গেছে বর্তমানে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৫.৬ শতাংশ বা ১ হাজার ৫৬৩ মেগাওয়াট উৎপাদিত হচ্ছে সৌর বিদ্যুত থেকে। মুলত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির অগ্রাধিকার দিতেই বিদ্যুত বিভাগ জাতীয় রুপটপ সোলার কর্মসূচি প্রণয়ন করেছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেই সংকট মোকাবেলায় সৌর বিদ্যুত উৎপাদনের উপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা ভবনের ছাদে সোলার বসিয়ে বিদ্যুত উৎপাদনের নির্দেশনা দিয়েছে। 

রুপটপ সোলার বিষয়ে বিদ্যুত মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, প্রতিটি বাসায় সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিকল্প শক্তির উৎস হিসেবে সোলার পাওয়ারকে সহজলভ্য করা হবে। এ বিষয়ে আগামী জুন মাসের মধ্যে সরকারি আদেশ জারির মাধ্যমে নতুন নীতিমালা ঘোষণা করা হতে পারে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন নেতৃত্ব ও কার্যকর পরিকল্পনার অভাবে দেশে বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রসার ঘটেনি। তবে বর্তমান সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং বিশেষভাবে সোলার ও উইন্ড এনার্জি খাতে বিনিয়োগ ও ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করছে।

জানা গেছে সরকারের নতুন নীতিমালায় নেট মিটারিং সুবিধা সহজ করা, নতুন ভবনে সৌরবিদ্যুৎ বাধ্যতামূলক করা এবং শিল্প-কারখানাকে ছাদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসাহ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ও টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ স্রেডা সূত্রে জানা গেছে, ১ হাজার বর্গফুট বা তার বেশি ব্যবহারযোগ্য ছাদ রয়েছে এমন নতুন ভবনে ধাপে ধাপে রুফটপ সোলার বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুমোদিত বিদ্যুৎ লোডের অন্তত ২০ শতাংশ সমপরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনাও আসছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকার বিপুল সংখ্যক বহুতল ভবন, শপিং মল, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও গার্মেন্টস কারখানার ছাদ ব্যবহার করা গেলে কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং দিনে বিদ্যুৎ সংকটও অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসবে। এদিকে নেট মিটারিং নীতিতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ জাতীয় গ্রিডে দেয়া যেত, এখন শতভাগ বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ রাখা হচ্ছে। সিঙ্গেল-ফেজ গ্রাহক, প্রিপেইড ও স্মার্ট মিটার ব্যবহারকারীদেরও এ সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অতিরিক্ত বিদ্যুতের অর্থ ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধের ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। স্রেডার র সাবেক চেয়ারম্যান খন্দকার মো. আব্দুল হাই এ বিষয়ে বলেন, রুফটপ সোলারে বিনিয়োগের বাধা কমিয়ে সাধারণ মানুষ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। সৌরবিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তারাও মনে করছেন, নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে ঢাকায় সৌরবিদ্যুতের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হবে।

তবে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ প্রাথমিক ব্যয়, ছাদের সীমাবদ্ধতা, অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতা ও সচেতনতার অভাব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। তারপরও সরকারের লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বড় অংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে নিশ্চিত করা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন দেশে বছরে প্রায় ৩শ’ অধিক দিন সূর্যের আলো পাওয়া যায়।  কিন্তু সেই সূর্যের আলো এখনো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। একদিকে গ্যাসের মজুত কমছে, অন্যদিকে আমদানি করা জ্বালানির বাড়তি দামে চাপে পড়েছে অর্থনীতি। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও বাড়ছে ভর্তুকি, লোডশেডিং আর বৈদেশিক মুদ্রার চাপ। এমন বাস্তবতায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে সৌরবিদ্যুৎ যে শক্তি একসময় কেবল গ্রামীণ সোলার হোম সিস্টেমে সীমাবদ্ধ ছিল, সেটিই এখন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ভবনের ছাদ, পতিত জমি, জলাশয় এবং শিল্পকারখানার অব্যবহৃত এলাকা ব্যবহার করেই হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের সম্ভাব্য সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা ‘রুফটপ সোলার’ বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পকারখানা এবং বাণিজ্যিক ভবনের ছাদ ব্যবহার করে বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নেট-মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। জানা গেছে, দেশে ইতোমধ্যে চার হাজারের বেশি নেট-মিটারিংভিত্তিক সৌরব্যবস্থা চালু হয়েছে।

তাদের মতে, গ্রামের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়ও সৌরশক্তির গুরুত্ব বাড়ছে। সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে সৌর, বায়ু ও বায়োগ্যাস মিলিয়ে ‘হাইব্রিড মাইক্রোগ্রিড’ ব্যবস্থা তৈরি করলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা সম্ভব। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও কমবে। গবেষণায় দেখা গেছে, সৌরবিদ্যুতের সঙ্গে ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তি যুক্ত হলে বিদ্যুতের খরচও কমানো যায়।

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের ইতিহাস মূলত শুরু হয়েছিল সোলার হোম সিস্টেম দিয়ে। বিদ্যুৎহীন গ্রামে ঘরে ঘরে ছোট সৌরপ্যানেল বসিয়ে আলো পৌঁছে দেয়ার সেই উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। তবে জাতীয় পর্যায়ে বড় বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরশক্তির অংশ এখনো খুবই কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নীতিগত দুর্বলতা, দীর্ঘসূত্রতা এবং বিনিয়োগ সংকট বড় বাধা হয়ে আছে।

পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য সৌরশক্তি শুধু অর্থনৈতিক নয়, অস্তিত্বের প্রশ্নও। কয়লা ও তেলনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্বন নিঃসরণ বাড়াচ্ছে, যা জলবায়ু বিপর্যয়কে আরও তীব্র করছে। অথচ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ প্রায় নেই বললেই চলে। গবেষণায় দেখা গেছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক গ্রিড ব্যবস্থা চালু হলে কার্বন নিঃসরণ প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সৌরবিদ্যুতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি স্থানীয় সম্পদনির্ভর। সূর্যের আলো আমদানি করতে হয় না। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান তৈরি হয় স্থানীয় পর্যায়ে। সৌরপ্যানেল স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাটারি প্রযুক্তি ও প্রকৌশল খাতে নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। বৈদ্যুতিক যানবাহনের সঙ্গেও সৌরবিদ্যুতের সমন্বয় ভবিষ্যতে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এখনই বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শহরের প্রতিটি নতুন ভবনে বাধ্যতামূলক সৌরব্যবস্থা, সরকারি ভবনে রুফটপ সোলার, শিল্পকারখানায় নেট-মিটারিং সম্প্রসারণ এবং জলাশয়ে ভাসমান সৌরকেন্দ্র নির্মাণ দ্রুত শুরু করা দরকার। একই সঙ্গে গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং দক্ষ জনবল তৈরিতেও জোর দিতে হবে। কারণ প্রশ্ন এখন কেবল বিদ্যুতের নয় প্রশ্ন দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার। বাংলাদেশের আকাশে প্রতিদিন যে সূর্য ওঠে, সেই সূর্যের শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে হয়তো জ্বালানি সংকটের অন্ধকার অনেকটাই দূর হবে। আর যদি তা না হয়, তবে বাড়তে থাকা বিদ্যুৎ চাহিদার সঙ্গে আমদানিনির্ভর ব্যয়বহুল জ্বালানির বোঝাও আরও ভারী হবে দেশের কাঁধে।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝