পেট্রোল পাম্পের জমিতে বিআরবির বহুতল ভবন
বিশেষ প্রতিনিধি

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব মো: আহম্মদুল্লাহকে বিপিসি থেকে বদলী করা হয়েছে চলতি মাসের ১৩ তারিখে। বর্তমানে তার কর্মস্থল ঢাকার মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের লিয়াজো অফিস।
বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারনে তাকে বদলী করা হয় । তবে তার বিরুদ্বে কোন তদন্ত কমিটি গঠন করেনি বিপিসি কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। শুধু মাত্র একটি বদলীর আদেশে সব কিছু থামিয়ে দেয়া হয়।
অথচ মাত্র সাত বছরের চাকরি জীবনে তিনি মালিক বনে গেছে শত কোটি টাকার। শুধু তিনিই নয়, সাথে সাথে অগাধ সম্পত্তির মালিক হয়েছেন তার স্ত্রীও।
২০১৯ সালে বিপিসি’র উপ-ব্যবস্থাপক পদে যোগ দেন মো. আহম্মদুল্লাহ্। তবে তার নিয়োগ নিয়েও রয়েছে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ। জানা গেছে প্রতিষ্ঠানটিতে তিনি চাকরি পায় বিপিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমানের আশীর্বাদে। তার একমাত্র মেয়ের গৃহশিক্ষক ছিলেন এই আহম্মদুল্লাহ। সেই সম্পর্কের সুবাদের পাশাপাশি তার ছিল রাজনৈতিক পরিচয়ও , এই দুটো মিলিয়ে বিপিসিতে চাকরি বাগিয়ে নেন আহম্মদুল্লাহ্।
এদিকে বিপিসিতে নিয়োগের পর বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন তিনি। তবে বিপিসিতে তার উত্থানের পেছনে বড় ভুমিকা পালন করেছে তার রাজনৈতিক পরিচয়। শ্রেফ রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ঝালকাঠি জেলার সদর উপজেলার দিবাকর কাঠি গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও তিনি চাকরি নেয় ঢাকা জেলার কোটা ব্যবহার করে ।
চাকরি পেতে তিনি জমা দেন আওয়ামী লীগের দলীয় একটি প্রত্যয়ন পত্র। সেখানে ঝালকাঠির ১০নং নথুল্লাবাদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. সেলিম শাহ তাকে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেন। তার পরিবারের সদস্যরাও আওয়ামী লীগের আদর্শে বিশ্বাসী ও রাজনীতিতে জড়িত বলে সেই প্রত্যায়নপত্রে বলা হয়েছে । এই রাজনৈতিক পরিচয় কাজে লাগিয়ে বিপিসিতে প্রবেশের পর তিনি দানবের মতো ক্ষমতা অর্জন করেন।
এদিকে আবার তার শ্বশুর ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রয়াত প্রভাবশালী নেতা কালো বিড়ালখ্যাত রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পিএস। সেই পথে হাটা শুরু করেন তিনিও। বিপিসি চেয়ারম্যানের একান্ত সহকারীর পদটি সহকারী ব্যবস্থাপক (৯ম গ্রেড) সমমানের। কিন্তু বিপিসির প্রবিধানমালা পাত্তা না দিয়ে উপব্যবস্থাপক (৬ষ্ঠ গ্রেড) হয়েও এই পদটি দখলে রেখেছেন বদলী হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত।
পিএস পদটি ব্যবহার করে আহম্মদুল্লাহ্ গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। আওয়ামী লীগ এবং নিজের প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন মহলকে ম্যানেজ করে নামে-বেনামে শত শত কোটি টাকার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।
২০২১ সালের ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) মো. আবুল কালাম আজাদ অঙ্গ প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে একটি চিঠি দেন। ওই চিঠিতে ‘ওটি ইস্টার্ন কেরিয়ার-২’ নামের একটি শ্যালো ড্রাফট ট্যাংকারকে চার বছরের জন্য ‘ওটি ইস্টার্ন কেরিয়ার’ নামে জাহাজটির বিপরীতে প্রতিস্থাপনের জন্য বিপিসির সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। চিঠিটির অনুলিপি দেওয়া হয় জাহাজ মালিক ইস্টার্ন বাল্ক কেরিয়ার লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী এবং বিপিসি চেয়ারম্যানের একান্ত সচিবকে।
ইস্টার্ন বাল্ক কেরিয়ার লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী হলেন চট্টগ্রামভিত্তিক বাশার গ্রুপ অব কোম্পানির মালিক আবুল বশর আবু। অন্যদিকে ওই সময়ে বিপিসি চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব (পিএস) ছিলেন মো. আহম্মদুল্লাহ।
জাহাজটি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে আবুল বশর আবুর সঙ্গে মো. আহম্মদুল্লাহর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া না গেলেও ওই চিঠির ২০ দিন আগে ২০২১ সালের ১১ নভেম্বর ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একটি জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দুজনের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সেদিন একটা সাফ কবলা দলিল নং-১০১৯৭ সম্পাদিত হয়। এ দলিলের মাধ্যমে কেরানীগঞ্জ (দক্ষিণ) থানার কোন্ডা ইউনিয়নের আইন্তা মৌজাস্থ বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পের সাড়ে তিন কাঠার (পাঁচ দশমিক সাত শতাংশ) ২৮৭নং প্লটটি নুসরাত জেবিন সিনথী নামের একজনকে হস্তান্তর করেন আবুল বশর। দলিলে মূল্য দেখানো হয় ৩০ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। নুসরাত জেবিন সিনথী বিপিসি চেয়ারম্যানের সাবেক পিএস আহম্মদুল্লাহর স্ত্রী।
ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পের ২৮৭নং প্লট পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, ওই প্লটে ৮ তলা ভবনের পুরোটাই ছাদ পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে। কিন্তু নির্মাণাধীন ওই ভবনের তিন তলায় সাঁটানো সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে, “ক্রয় সূত্রে এই জমির মালিক- বাশার গ্রুপ অব কোম্পানি, আলহাজ আবুল বশর (আবু)”।
কেরানীগঞ্জ রাজস্ব সার্কেলের (দক্ষিণ) সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিস সূত্রে জানা গেছে, নুসরাত জেবিন সিনথীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তার নামে ওই জমির নামজারি খতিয়ান (নং-২২৪৩) খোলা হয়।
কথা হলে পাশের একটি ভবনের ম্যানেজারের সাথে ‘এখানে বর্তমানে প্রতি কাঠা জমি ৪২ থেকে ৪৭ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’ সে হিসাবে সাড়ে তিন কাঠা প্লটটির শুধু জমির বর্তমান মূল্য দেড় কোটি টাকার বেশি।
প্লটটির সরকারি খতিয়ানে নুসরাত জেবিন সিনথীর নাম থাকলেও মূল জায়গাতে আবুল বশর (আবু)’র নামে সাইনবোর্ড ঝুলানো থাকায় প্রশ্ন উঠেছে—আট তলা ভবনটির মালিক কে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ওই জমির নামজারি আবেদনে দেওয়া নুসরাত জেবিন সিনথীর মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
দীর্ঘদিন চেয়ারম্যানের পিএস থাকার সুবাদে বিপিসিকে দুর্নীতির আতুর ঘর বানিয়ে এভাবেই অনৈতিকভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পদ সংগ্রহ করেছেন মো: আহম্মদুল্লাহ। অভিযোগ রয়েছে তিনি কোটি কোটি টাকার স্বর্ণ কিনে গোপন লকারে মজুদ করেছেন। রাজধানী ঢাকার মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট, জমি ও গ্রামের বাড়িতে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি কিনেছেন। মিরপুরে দুটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে তার নামে। কোটি কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র ও এফডিআর, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার হয়েছেন। স্ত্রী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামে গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদ।
তার প্রভাব ও ক্ষমতার কাছে হার মেনেছেন খোদ বিপিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান এবিএম আজাদও। বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তাকে ২০২১ সালের ৩ অক্টোবর বিপিসি চেয়ারম্যানের পিএস পদ থেকে ছড়িয়ে চট্টগ্রামের প্রধান কার্যালয়ের হিসাব বিভাগে বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু একদিন পরই সেই অফিস আদেশ বাতিল করিয়ে মো. আহম্মদুল্লাহ্ স্বপদে ফিরে যান। নিয়ম অনুযায়ী তিন বছর পর পর বদলির বাধ্যবাধকতা থাকলেও, ৭ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি একই পদে ছিলেন এই আহম্মদুল্লাহ।
এছাড়া বিপিসির চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের জন্য বরাদ্দ হওয়া গাড়ি (জীপ ও কার) তিনি নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন। সেই সময়ে তিনি নিজে প্রাথমিকভাবে গাড়ির প্রারাধিকারভুক্ত কর্মকর্তা না হওয়া সত্ত্বেও, তার এই ব্যবহার নিয়ে বিপিসির অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল । কথিত আছে, মো. আহম্মদুল্লাহ্ বিপিসিতে যা চেয়েছে তাই হয়েছে। তিনি এতই ভয়ঙ্কর যে, তার অনিয়মের বিষয়ে মুখ খোলার চেষ্টা করলে বদলি সহ চাকরি থেকেই বিতাড়িত হতে হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কর্মচারীদের অনেকের।
অভিযোগ রয়েছে, নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে আহম্মদুল্লাহ্ জ্বালানী সেক্টরে বরিশালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পছন্দের জায়গায় পদায়ন করছেন। বরিশাল অঞ্চলের অন্তত ১০ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে তিনি বিপিসি চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং ঢাকার অফিস-রেস্ট হাউসে পদায়ন করে রেখেছেন।
এছাড়াও, বিপিসির ঢাকা রেস্ট হাউস, লিয়াজো অফিস এবং বিপিসির অধীনস্থ কোম্পানির ডিপোতে আত্মীয়-স্বজনসহ প্রতিবেশীদের চাকরি দিয়ে সবকিছু তার তত্ত্বাবধানে রেখেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তার ফুপাতো ভাই মো. মিরাজকে পদ্মা অয়েলের বরিশাল বার্জ ডিপোতে চাকরি দেয়ার।
বিপিসি চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব মো. আহম্মদুল্লাহ্ ঢাকা লিয়াজো অফিসে অঘোষিত ক্যাশিয়ার হিসেবে রেখেছেন বিপিসির আরেক কর্মকর্তা, উপ-ব্যবস্থাপক (ডিএলও) মো. আশিক শাহরিয়ারকে। আশিক শাহরিয়ারও তার নিজ জেলা বরিশালের বাসিন্দা স্বত্বেও, একই নিয়োগ ও নিয়মে তিনি ঢাকা জেলার কোটা ব্যবহার করে বিপিসিতে যোগদান করেন।
যোগ্যতার অভাবে এসিএআর-এ কম নম্বর পেয়েছিলেন আশিক শাহরিয়ার। বিপিসির তৎকালীন চেয়ারম্যান এবিএম আজাদ তাকে পদোন্নতি দিতে চাইলেও, দেননি। কিন্তু পিএস মো. আহম্মদুল্লাহ্ নিজের ক্ষমতায় ৩ বছর ১৭ দিনে পদোন্নতির ব্যবস্থা করেন।
অভিযোগ রয়েছে, আশিক শাহরিয়ারকে ব্যবহার করে বিভিন্ন ডিপো ও পার্টির কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছেন আহম্মদুল্লাহ্। পাশাপাশি তিনি বিপিসি টেন্ডার বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য এবং প্রোমোশন বাণিজ্য এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন। বিপিসি চেয়ারম্যানের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে অর্থ আদায় করার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিনের। তিনি রেস্ট হাউজে নামে-বেনামে ভুয়া বিল বানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মাধ্যমে বিল উত্তলন করে অর্থ ভাগাভাগি করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, মো. আহম্মদুল্লাহ্ নিজের প্রভাব খাটিয়ে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীকে বিটুমিন, ক্রুড অয়েল এবং ডিজেলের মতো পণ্য আমদানির অনুমোদন পাইয়ে দেয়ার। তার বিরুদ্ধে দুদকের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি উর্ধ্বতনদের ম্যানেজ করে পদোন্নতির জন্য মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে ছাড়পত্র নেন।
এছাড়া বিপিসির অধীনস্ত কোম্পানির কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের মাসোয়ারা নিয়ে পদোন্নতি, বদলি ও বিভিন্ন তদন্ত রিপোর্টে জালিয়াতি করে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, কোম্পানি সমূহের বার্ষিক ৫ শতাংশ মুনাফার অনুমোদন এবং কোম্পানির নিয়োগ বিধির তফসিলের তৃতীয় শ্রেণীর বিষয় পরিবর্তনের জন্যও মোটা অংকের আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। বিপিসির অধীনস্ত কোম্পানি সমূহের ডিপো ইনচার্জদের বদলির হুমকি দিয়ে মাসভিত্তিক মাসোহারা গ্রহণ করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তিনি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আপ্যায়ন বিল, টিএ/ডিও বিল, জ্বালানি বিল বাবদ বিপিসি থেকে নিয়েছেন ৫ লাখ ৫৯ হাজার ৯৫১ টাকা।
এছাড়াও, দৈনিক ভিত্তিতে চাকরি দেওয়ার জন্য বিপিসির সাবেক চেয়ারম্যান আমিনুল আহসানকে খুশি করার নামে দুইটি এসির দাম বাবদ এক চাকরি প্রার্থীর কাছ থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা গ্রহণ করার অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিপিসির সকল নিয়োগ-বাণিজ্যের মূল হোতা ছিলেন এই আহাম্মদুল্লাহ।
অভিযোগ রয়েছে, মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বার্তা বাহক পদে ভুয়া ঠিকানা দিয়ে বিপিসিতে নিয়োগ দেন শাওন নামের একজনকে। পরবর্তীতে এটি জানাজানি হয়ে গেলে তৎকালীন পরিচালক (অপারেশন ও পরিদর্শন) খালেদ আহমেদ-এর তদন্ত রিপোর্টে ভুয়া ঠিকানায় নিয়োগ ও দুর্নীতির সত্যতা প্রমাণিত হয়।
মো. আহম্মদুল্লাহ্ এনপিএসের দায়িত্ব পেয়ে বিপিসির ব্যাংক হিসাবের এফডিআর ও এসএনডি হিসাবে তার পছন্দনীয় ব্যাংকগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে মোটা অংকের মাসোহারা নিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা দুর্নীতি করেছেন। তিনি তার পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনকে বিভিন্ন ব্যাংকে চাকরি দিয়ে ব্যাংকসমূহকে এফডিআর ও এসএনডি হিসাবে বিপিসির কোটি কোটি টাকা জমা রাখতেন।
এছাড়া বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ এস আলমের সঙ্গে সম্পর্কের সুবাদে এস আলমের ব্যাংকসমূহে বিপিসির হাজার হাজার কোটি টাকা এসএনডি ও এফডিআর হিসাবে জমা করেন। এসব ব্যাংকের এসএনডি ও এফডিআর হিসাবে সর্বশেষ জমাকৃত প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা বিপিসি এখনো তুলতে পারেনি।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি বেসরকারি ব্যাংকে এলসি’র অতিরিক্ত অর্থ জমা, মোটা অংকের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ, বেসরকারি রিফাইনারী থেকে মাসোহারা গ্রহণ এবং বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনকে চাকরি দেওয়ার মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করেছেন।এসপিএম প্রকল্প, ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন প্রকল্প, ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশীপ পাইপলাইন প্রকল্পসহ বিপিসির চলমান প্রকল্প থেকে মোটা অংকের কমিশন বাণিজ্য এবং প্রকল্পের জন্য শ্রমিক, কর্মচারী নিয়োগে লক্ষ লক্ষ টাকা আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন।
এছাড়াও, তিনি বিপিসির অধীনস্ত বিভিন্ন কোম্পানি থেকে গাড়িসহ অন্যান্য আর্থিক সুবিধা ভোগ করেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বেসরকারি রিফাইনারীসমূহ থেকে লাখ লাখ টাকা মাস ভিত্তিক মাসোয়ারা গ্রহণ করেন।
বিপিসির ইস্টার্ণ রিফাইনারীর যন্ত্রাংশ ক্রয়ের নামে প্রতি বছরে ৭০-৭৫টি এলোকেশন অনুমোদন দিয়ে বিপিসির শত শত কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি করে মোটা অংকের মাসোহারা গ্রহণ করেছেন। এছাড়া ইস্টার্ণ রিফাইনারীর প্রসেসিং ফি থেকেও মাসোহারা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। তার এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে অনুসন্ধান হলেও তা প্রকাশ পায়নি। তবে চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি দুদকে সম্পদের হিসাব বিবরনী জমা দিয়েছেন মো. আহম্মদুল্লাহ্। এবিষয়ে তার সাথে কথা বলার জন্য একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেনি।
ঢাকা জেলার রেজিস্ট্রেশন প্রশাসনে জমির শ্রেণি পরিবর্তন, দলিল সম্পাদনে অনিয়ম এবং ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠছে। তথ্য বলছে, জেলা রেজিস্ট্রারসহ গুলশান ও মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ ঘিরে পুরো রেজিস্ট্রেশন প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমান, মোহাম্মদপুর থানার সাব রেজিস্ট্রি কর্মকর্তা আব্দুল কাদের এবং গুলশান থানার সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল মামুন। অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ৩ মে গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ১০.৬৬ কাঠা জমির একটি সাব-কবলা দলিল সম্পাদন করা হয়, যার দলিল নম্বর ৩৪৫৯। সেখানে বাস্তবে জমিটি বসতভিটা হলেও দলিলে সেটিকে ‘নাল জমি’ হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সূত্র জানায়, জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি এবং দলিল সম্পাদনে চাপ প্রয়োগের ঘটনাও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দাতা পক্ষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে দলিল সম্পাদনে বাধ্য করা হয়েছে এবং সরকারি রাজস্বের একটি অংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা জেলার অন্তত ২১টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চললেও জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমান কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেননি। বরং কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের রক্ষায় ভূমিকা রাখার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
তথ্য বলছে, মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তা আব্দুল কাদেরের বিরুদ্ধে দলিল জালিয়াতির বিষয় ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ের নকল নবিশ আওলাদ হোসেন গত দেড় বছর ধরে বালাম বইয়ে কোনো তথ্য সংরক্ষণ করেননি। নিয়মনীতি উপেক্ষা করে তার বিরুদ্ধে সাব-রেজিস্টারের এজলাসে ওঠারও অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া আব্দুল কাদের নিজ অর্থে কার্যালয়ে স্ক্যানার বসিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, রেকর্ড রুমে এ ধরনের স্ক্যানার স্থাপনের কোনো নিয়ম নেই। ওই স্ক্যানারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জমির দলিল স্ক্যান করে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, সরকারি বিধিবিধানের বাইরে গিয়ে কীভাবে এ ধরনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলো।
অন্যদিকে, গুলশান সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে দলিল সম্পাদনে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ এবং রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ আনা হয়েছে। সূত্র জানায়, কিছু সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্র দলিল প্রক্রিয়া দ্রুত করার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দালাল চক্রকে প্রশ্রয় দেওয়ার কারণেই সাধারণ সেবাগ্রহীতারা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ২০২৪ সালের একটি পৃথক অভিযোগে আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কিছু কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণ ও দলিল প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগে বলা হয়, সেখানে একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ছিল।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুন্সি মোখলেছুর রহমান, মোহাম্মদপুর থানার সাব-রেজিস্ট্রি কর্মকর্তা আব্দুল কাদের এবং গুলশান থানার সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ আল মামুনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তারা কেউ ফোন রিসিভ করেননি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, জেলা রেজিস্ট্রার মোখলেছুর রহমানের বিরুদ্ধে মাশোহারা নেওয়া, অডিটের নামে অর্থ আদায় এবং বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। তথ্য বলছে, ২১টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে নিয়মিত অর্থ সংগ্রহের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি তিন মাস পরপর অডিটের নামে একটি অফিস থেকেই ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো, যা ২১টি অফিস মিলিয়ে ১ কোটি ৫ লাখ টাকায় পৌঁছায়।
সূত্র জানায়, ২০২৫ সাল থেকে তিনি ছুটিতে থেকেও প্রতি সপ্তাহে অফিসগুলো থেকে ১০ হাজার টাকা করে গ্রহণ করতেন। এছাড়া প্রতি মাসে প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে ২০ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। যদিও এসব আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সাব-রেজিস্ট্রার বলেন, আশুলিয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুষ আদায়, দলিল গ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নিয়ে ২০২৪ সালের নভেম্বরেও প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল। তার দাবি, মোহাম্মদপুরের সাব-রেজিস্ট্রার আব্দুল কাদেরের সহযোগিতায় একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা জেলা রেজিস্ট্রারকে নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে অফিসগুলোকে ‘ঘুষময় অফিসে’ পরিণত করেছে।
প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অভিযোগ ওঠার পরও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। পর্যবেক্ষকদের মতে, রেজিস্ট্রেশন বিভাগে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৫ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ৩৫টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অভিযান চালিয়েছিল, যেখানে দলিল রেজিস্ট্রি ও নকল উত্তোলনে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুষ্ঠু তদন্ত হলে রেজিস্ট্রেশন প্রশাসনের ভেতরের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
জমি বরাদ্দ ছিল পেট্রোল পাম্পের জন্য। একটা সময়ে সেখানে পেট্রোল পাম্প ছিলও। কিন্তু পাম্পটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর রোডের সেই জমিতে নিয়ম ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বরখাস্ত হওয়া আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের স্ত্রী বিসিএস ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তা সায়লা ফারজানার মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়। অথচ ইউটিলিটি সেবার জন্য বরাদ্দ জমির শ্রেণি পরিবর্তনের কোনো আইনগত সুযোগ নেই। বিআরবি কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, সবকিছুই আইন মেনে করা হয়েছে। তবে নগরবিশেষজ্ঞ ইকবাল হাবীব বলছেন, এমন স্থাপনার অনুমোদন দিয়ে রাজউক গুরুতর অনিয়ম করেছে।
নথি ঘেঁটে দেখা যায় প্লট হস্তান্তরের ফাইলে দেওয়া শর্তে স্পষ্ট করে বলা ছিল, ‘জমিটি শুধু একটি পেট্রোল পাম্প এবং সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের জন্য ব্যবহৃত হবে এবং কোনো অবস্থাতেই উপরোক্ত উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ অন্য কোনো যন্ত্রপাতি এখানে স্থাপন করা যাবে না।’ বিআরবি শুধু বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করেই ক্ষান্ত হয়নি, গিলে ফেলেছে একটি সড়কদ্বীপও। তারা নিয়ম লঙ্ঘন করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কাছ থেকে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য নামমাত্র বিজ্ঞাপন মূল্যে পেট্রোল পাম্পের জমির পাশের সড়কদ্ সড়কদ্বীপটিতে আগে বটসহ বিভিন্ন প্রজাতির বেশ কয়েকটি বড় গাছ ছিল। সরেজমিনে দেখা গেছে, সৌন্দর্যবর্ধনের নামে সেগুলো কেটে সেখানে বনসাই গাছ আর লতাগুল্ম লাগানো হয়েছে। নিজেদের নবনির্মিত ১৪ তলা অফিস ভবনটির সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলতে বিআরবি সড়কদ্বীপটিকে একপ্রকার পৈতৃক সম্পত্তির মতো ব্যবহার করছে।
২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপসচিব সায়লা ফারজানা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, ধানমন্ডির আবাসিক এলাকার প্লট নম্বর ‘এ’ (পুরোনো) নতুন প্লট নম্বর–২, রোড নম্বর–৩ এ অবস্থিত ১৩ দশমিক ৮০ কাঠা জমির ওপর পেট্রোল পাম্পের পরিবর্তে শর্তসাপেক্ষে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কাঠাপ্রতি দুই লাখ টাকায় সর্বমোট ২৭ লাখ ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করা হয়।
রাজউকের ১৫০ কোটি টাকার জমিতে ‘নিকেতন লেডিস পার্ক’ কার স্বার্থেরাজউকের ১৫০ কোটি টাকার জমিতে ‘নিকেতন লেডিস পার্ক’ কার স্বার্থে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজের নামে বরাদ্দ ও শ্রেণি পরিবর্তনের ফাইলে সই করেন তৎকালীন মন্ত্রী সদ্য প্রয়াত ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন, সচিব মো. গোলাম রব্বানী, উপসচিব শায়লা ফারজানাসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা। ২০১৪ সালের ১৫ জুলাই ফাইলটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
টাকার জোরে জমির শ্রেণি পরিবর্তনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরবি গ্রুপের পরিচালক মফিজুর রহমান সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘ওই সময়ের মন্ত্রী–সচিব আইন মেনেই জমির শ্রেণি পরিবর্তন করেছেন। প্রথম মাস্টার প্ল্যানে সেখানে পেট্রোল পাম্প ছিল না। যে পেট্রোল পাম্পটি ছিল, সেটি অকেজো হয়ে গিয়েছিল। পরে পেট্রোল পাম্পের পরিবর্তে গ্যাস পাম্প করা হয়। কিন্তু স্থানটি উঁচু থাকায় গ্যাসের চাপ কমে যায়। সেখানে ৩–৪টার বেশি গাড়ি ঢুকতে পারতো না। এ কারণে আগের মালিক সরকারের সাবেক সচিব ফজলুর রহমান জমির শ্রেণি পরিবর্তন করেন। এরপর বিআরবি গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করেন। এখানে বাণিজ্যিক থেকে বাণিজ্যিকই করা হয়েছে। এখানে বিআরবি গ্রুপের কোনো হাত নেই।’
ধানমন্ডির তিন নম্বর সড়কে পেট্রোল পাম্পের জমিতে বিআরবি গ্রুপের বহুতল ভবন নির্মাণের বিষয় জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর সিটিজেন জার্নালকে বলেন, এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখব।
বিআরবি যে ফজলুর রহমানের কাছ থেকে জমি হস্তান্তর নেওয়ার কথা বলছে, তিনি এখন আর বেঁচে নেই। প্রয়াত ফজলুর রহমান পাকিস্তান আমলে উপমন্ত্রী এবং সিএসপি কর্মকর্তা ছিলেন। তার হাত ধরেই ১৯৬০–এর দশকে ধানমন্ডির ৩ নম্বর সড়কে গ্রিন ভিউ ফিলিং স্টেশন প্রতিষ্ঠা হয়। ফজলুর রহমানের মৃত্যুর পর এই সম্পত্তি দেখাশোনা করেন তার ছেলে ফয়জুর রহমান। ফয়জুর রহমানের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী, বর্তমানে যিনি আমেরিকা প্রবাসী, তিনি এটি দেখাশোনা করে আসছিলেন। এখন তাদের জমি ও বাড়িসহ আনুষাঙ্গিক সবকিছু দেখভাল করছেন সালমান শাকিল নামে এক ব্যক্তি। সালমান শাকিল সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ২০১২ সালে বিআরবি গ্রুপকে তারা এই জমি হস্তান্তর করেন। তবে শ্রেণি পরিবর্তন তাদের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল কিনা, সেটি তার জানা নেই। উল্লেখ্য পাম্পটি বন্ধ হয়ে যায় ২০১৫ সালে।
শ্রেণি পরিবর্তন যিনিই করে থাকুন, রাজউকের নতুন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) অনুযায়ী, আবাসিক ব্লকে নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক জোন ছাড়া ঢালাওভাবে শ্রেণি পরিবর্তন করার সুযোগ নেই। এটি ড্যাপের মূল নকশার বাইরে হলে তা ‘নগর উন্নয়ন আইন-১৯৫৩' এর সরাসরি লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে। এই আইনের ৭৫ ধারায় বলা আছে, মাস্টার প্ল্যান বা ড্যাপের জমির যে ব্যবহার নির্দিষ্ট করা আছে, তার বাইরে গিয়ে জমি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।
রাজউকরাজউকে পছন্দমাফিক সাজানো হলো বিসি কমিটি
ইউটিলিটির জন্য বরাদ্দকৃত জমি (যেমন পেট্রোল পাম্প, পার্ক বা খেলার মাঠ) অন্য কাজে ব্যবহার করা বাংলাদেশের প্রচলিত একাধিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। বিধিমালার মূল অংশে বলা আছে, রাজউক থেকে যে শ্রেণির জন্য নকশা অনুমোদন করা হয়েছে, সেই শ্রেণি পরিবর্তন করে অন্য কাজ করা যাবে না।
একাধিক আইন লঙ্ঘন করে বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজকে কেন জমির শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমোদন দেওয়া হলো- খুদে বার্তার মাধ্যমে পাঠানো এমন এক প্রশ্নের জবাবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপসচিব সায়লা ফারজানা সিটিজেন জার্নালকে বলেছেন, ‘আমি তখন শাখা অফিসার হিসেবে কাজ করেছি। সে কারণে হয়তো আমার স্বাক্ষর পেয়েছেন। এখনকার বিষয় এই মুহূর্তে তো মনে করতে পারছি না। ফাইল দেখে বলা যেতে পারে।’ ওই সময়ে চিঠির কপি তার কাছে পাঠানো হলে তিনি অপর এক বার্তায় বলেন, ‘১৯৯৫ সালের পরিপত্র অনুযায়ী প্লট কনভার্সন হয়েছে। তবুও বলবো ফাইল নোটেই হয়তো বিস্তারিত উল্লেখ আছে।’
পাকিস্তান আমলে ১৯৫০ সালে ভূমি অধিগ্রহন করে গড়ে তোলা হয় সুপরিকল্পিত ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা। ধানমন্ডিতে একটা সময় শিশুদের জন্য অনেক খেলার মাঠ ছিল, হাঁটাচলার জন্য ছিল প্রশস্ত ফুটপাত। চিত্তবিনোদনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল পার্ক আর ধানমন্ডি লেক। কিন্তু আইন লঙ্ঘন করে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ধানমন্ডির সেই আবাসিক এলাকার ঐতিহ্য।
পেট্রোল পাম্পের জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে পরিবেশবিদ ইকবাল হাবীব সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘ট্রাফিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসম্যান্ট (টিআইএ) না করেই সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়ে রাজউক চরম অন্যায় করেছে। দুটি রুটের সংযোগ স্থলে নির্মিত বহুতল ভবন চালু করলে আশপাশে ব্যাপক ট্র্যাফিক জ্যাম হবে। ভবনের সামনের জমিতে একজন নারী প্রজাপতির বাগান তৈরি করেছিলেন। কিন্তু বিআরবি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে নানাভাবে ফুসলিয়ে ওই নারীর বরাদ্দ বাতিল করে সে জমিটি নিজেদের নামে করিয়ে নেয়।’ এটি বেআইনি ও অবৈধ বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সিনেমা হলের প্লটে হচ্ছে ৪০ তলা বাণিজ্যিক ভবনশান্তার ফাইল পার করতে রাজউকের ‘গোপন মিশন’
অনেক সময় আবাসিক এলাকায় প্লটগুলো বাণিজ্যিক ব্যবহারের ফি দিয়ে বাণিজ্যিক ভবনে রূপান্তরিত করা হচ্ছে, যা নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ–রাজউকের পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ শাখা) মোহাম্মদ কায়ছার সিটিজেন জার্নালকে বলেন, মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র ছাড়া সেখানে বহুতল ভবন করার কোনো সুযোগ নেই। কীভাবে মন্ত্রণালয় ছাড়পত্র দিলো সে বিষয়ে ফাইল না দেখে মন্তব্য করা যাবে না। বিষয়টি নিয়ে অথরাইজড অফিসারের সঙ্গে কথা বলে মন্তব্য করা হবে।
ধানমন্ডির তিন নম্বর সড়কে পেট্রোল পাম্পের জমিতে বিআরবি গ্রুপের বহুতল ভবন নির্মাণের বিষয় জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর সিটিজেন জার্নালকে বলেন, এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখব।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) কর্তৃক সড়কদ্বীপের সৌন্দর্যবর্ধন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট আইন ও নীতিমালা অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সাধারণত এই ধরনের কাজে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করার কথা। যদি দরপত্র ছাড়া বা প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনো প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়, সেটা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। বিআরবিকে ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি তৎকালীন ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল এই বরাদ্দ দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম সিটিজেন জার্নালকে বলেন, ‘বিআরবি ক্যাবলকে অনেক আগেই এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখানে কোন রুলস বা রেগুলেশনের বিষয় না। যে কোম্পানিগুলোকে এই কাজ দেওয়া হচ্ছে, তাদের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হচ্ছে। এ সমস্ত প্রতিষ্ঠান নিজস্ব খরচে সৌন্দর্যবর্ধন করছে এবং সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণও করছে। পাশাপাশি সেখান থেকে তারা সিটি কর্পোরেশনকে রেভিনিউ দিচ্ছে।’
জহিরুল ইসলাম এরপর অবশ্য যোগ করেন, ‘রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সৌন্দর্যবর্ধনের যে সমস্ত কাজগুলো আগে দেওয়া হয়েছিল, অনেকেই তা যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে করছে না। কেউ কেউ আবার সেগুলো হস্তান্তর করতে চাচ্ছে।’ এগুলো অন্য প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে বলে জানান তিনি।
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর




















