লাশ হয়ে ফিরছে দেশে
দালালের খপ্পরে পড়ে রাশিয়ার যুদ্ধের ময়দানে বাংলাদেশিরা
বিশেষ প্রতিনিধি

প্রতারণার শিকার তরুণদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে অস্ত্র
শ্রমিক নেওয়ার নামে মানবপাচার,
সামরিক চুক্তিতে জোর করে সই;
ইউক্রেন সীমান্তে নিহত-নিখোঁজ বহু বাংলাদেশি
গত বৃহস্পতিবার ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলায় নিহত হয় কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন (২৫)। সে রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ করছিলেন। মৃত্যুর খবরটি জানায় তার বন্ধু মৃদুল। মৃদুলও রাশিয়ার একই সেনাক্যাম্পে কর্মরত। বাড়ি টাঙ্গাইলে। দুজনের পরিবারই জানিয়েছে তাদেও প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। মাদারীপুরের সুরুজ কাজী (৩৫) যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছেন। তারা সবাই রাশিয়ায় ভালো চাকরির আশায় গিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রুশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা দাঁড়ালো অন্তত ৩৯ জনে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন বিদেশে ভালো চাকরি, মোটা বেতন আর “নিশ্চিত ভবিষ্যৎ এই স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশের তরুণদের রাশিয়ায় পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের অনেকেই জানতে পারছেন ভয়াবহ বাস্তবতা। কারখানা বা নিরাপত্তাকর্মীর চাকরির বদলে হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে অস্ত্র। কয়েক দিনের প্রশিক্ষণ শেষে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে। কেউ ফিরছেন না, কেউ ফিরছেন পঙ্গু হয়ে, আর কেউ ফিরছেন কফিনবন্দি লাশ হয়ে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আড়ালে এখন বাংলাদেশিদের জড়িয়ে পড়ার এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বলছে, সংঘবদ্ধ দালালচক্র চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতারণার মাধ্যমে তাদের সামরিক চুক্তিতে সই করানো হচ্ছে।
বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সম্প্রতি জানিয়েছে, একটি চক্র অন্তত ৫০ জন বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ১১ জনকে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে। এ ঘটনায় একজন মূল হোতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই চক্রের সঙ্গে বিদেশি এজেন্টদেরও যোগাযোগ রয়েছে।
সিআইডির কর্মকর্তারা বলেন, “প্রথমে শ্রমিক বা নিরাপত্তাকর্মীর চাকরির কথা বলা হয়। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের রুশ ভাষায় কিছু নথিতে সই করানো হয়। পরে তারা বুঝতে পারেন, এগুলো ছিল সামরিক চুক্তি। তদন্তে জানা গেছে, দালালরা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বেকার তরুণদের টার্গেট করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ হারানো শ্রমিক, বিদেশে যেতে আগ্রহী যুবক এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের বেশি প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। জনপ্রতি ৫ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে বিদেশে পাঠানোর নামে। পরিবারগুলোর অভিযোগ, তাদের সন্তানদের বলা হয়েছিল রাশিয়ায় গ্যাস প্ল্যান্ট, কারখানা, নির্মাণকাজ বা ক্লিনিং সার্ভিসে চাকরি দেয়া হবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাদের সামরিক ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক যুবকের বাবা বলেন, ছেলে বলেছিল মাসে দুই লাখ টাকা বেতনের চাকরি পেয়েছে। পরে ফোন করে কান্নাকাটি করে বলে তাকে যুদ্ধ করতে পাঠানো হচ্ছে। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি। একই ধরনের তথ্য মিলেছে লক্ষ্মীপুর, মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লা ও নরসিংদীর কয়েকটি পরিবার থেকেও। কেউ নিখোঁজ, কেউ আহত, আবার কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পেয়েছে পরিবার। তবে নিহত বাংলাদেশির প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সরকারি হিসাব নেই।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর এক প্রতিবেদনে কয়েকজন বাংলাদেশির সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হয়। সেখানে একজন তরুণ বলেন, আমাদের বলা হয়েছিল নির্মাণকাজ করতে হবে। কিন্তু পরে সামরিক পোশাক পরিয়ে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। না গেলে মারধর করা হতো। আরেক বাংলাদেশি জানান, খুব অল্প প্রশিক্ষণের পরই তাদের ইউক্রেন সীমান্তে পাঠানো হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলা ও গোলাবর্ষণের মধ্যে তারা আটকা পড়েন। অনেক বিদেশি যোদ্ধা সেখানেই নিহত হন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, যুদ্ধক্ষেত্রে বিদেশিদের সামনে রেখে রুশ সেনারা পেছনে অবস্থান করত। অনেক সময় পর্যাপ্ত খাবার, চিকিৎসা বা নিরাপত্তা সরঞ্জামও দেয়া হয়নি। কেউ পালানোর চেষ্টা করলে শাস্তির ভয় দেখানো হতো। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু মানবপাচার নয়; বরং “কনফ্লিক্ট ট্রাফিকিং” বা যুদ্ধকেন্দ্রিক মানবপাচারের নতুন রূপ। যেখানে দরিদ্র ও বেকার তরুণদের বিদেশে উচ্চ আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈধ শ্রম অভিবাসনের আড়ালে বাংলাদেশিদের জোরপূর্বক সামরিক কাজে ব্যবহারের আশঙ্কাজনক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। সংস্থাটি অন্তত ১০ জনের নির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছে, যাদের পরিবার জানিয়েছে তারা চাকরির জন্য গিয়েছিলেন, কিন্তু পরে যুদ্ধ করতে বাধ্য করা হয়েছে। ব্র্যাকের তদন্তে দেখা গেছে, ভুক্তভোগীরা বৈধ ওয়ার্ক ভিসা ও চাকরির চুক্তি নিয়েই রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। কিন্তু পৌঁছানোর পরই তাদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং ‘স্বেচ্ছাসেবী সামরিক চুক্তিতে’ জোর করে সই করিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠানো হয়। রিপোর্টে বলা হয়, অপ্রশিক্ষিত বিদেশি শ্রমিকদের যুদ্ধক্ষেত্রে ‘খরচযোগ্য জনবল’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের একজন আফজাল হোসেন মেরাজ, ৭০ হাজার টাকার বেতনে ওয়েল্ডার হিসেবে রাশিয়া যান। এজন্য তিনি উত্তরার এক রিক্রুটিং এজেন্সিকে ৬.৫ লাখ টাকা দেন। রাশিয়ায় গিয়ে এক দালাল তাকে বেশি বেতনের সুযোগ দেখিয়ে সামরিক চুক্তিতে সই করান ২ লাখ ৬০ হাজার টাকার সাইনিং বোনাস ও ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকার মাসিক বেতন, আহত হলে ১৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং যুদ্ধ জিতলে নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়।
মেরাজের বাবা আলি হোসেন বলেন, আমার ছেলে আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে জানায়, ওরা ওকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়েছে। সে বলেছিল, ‘বাবা, আমি যেকোনো সময় মারা যেতে পারি।’ পরে জানতে পারলাম, ওর সামনেই দুইজন বাংলাদেশি মারা গেছে। মেরাজ গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, পরে সেখান থেকে পালিয়ে মস্কোতে বাংলাদেশ দূতাবাসে আশ্রয় নিয়ে দেশে ফেরেন।
ব্র্যাকের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাগেরহাটের আয়ন মণ্ডল, কুমিল্লার অমিত বড়ুয়া এবং ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের মোহসিন আহমেদও একইভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হন। আয়নের পরিবার জানিয়েছে, মাস কয়েক আগে তিনি ফোনে জানান যে তাকে ইউক্রেন সীমান্তের দিকে নেয়া হচ্ছে, এরপর আর যোগাযোগ নেই। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন। অমিত বড়ুয়ার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে, যেখানে তাকে রুশ সেনা পোশাকে দেখা যায়। তার কোনো খোঁজ নেই এখনো।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে দেশের উচ্চ বেকারত্ব, বিদেশে যাওয়ার তীব্র আগ্রহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রতারণা। ফেসবুক, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে রাশিয়ায় চাকরি নামে অসংখ্য বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে। সেখানে উচ্চ বেতন, ফ্রি থাকা-খাওয়া এবং দ্রুত ভিসার প্রলোভন দেখানো হয়। ঢাকার একটি অভিবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বলেন, অনেক তরুণ বুঝতেই পারছে না তারা কী ঝুঁকিতে যাচ্ছে। কারণ দালালরা বৈধ ভিসা, এয়ার টিকিট ও চাকরির অফার লেটার দেখিয়ে বিশ্বাস অর্জন করছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর ভুক্তভোগীদের পাসপোর্ট কেড়ে নেয়া হয়। পরে তাদের সামরিক নিয়োগকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। অনেককে বাধ্যতামূলকভাবে চুক্তিতে সই করানো হয়। ভাষা না জানার কারণে তারা বুঝতেই পারেন না কীতে সই করছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের সম্পৃক্ততার খবর তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। রাশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস কয়েকটি ঘটনার খোঁজখবর নিচ্ছে। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তথ্য সংগ্রহে জটিলতা রয়েছে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণা রোধে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। মানবপাচারবিরোধী ইউনিটগুলোও সক্রিয় রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে এই সমস্যা ঠেকানো কঠিন হবে। প্রয়োজন জনসচেতনতা ও বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিদেশি যোদ্ধা ও শ্রমিক সংগ্রহে নতুন কৌশল নিচ্ছে বিভিন্ন চক্র। দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্র জনগোষ্ঠী এখন তাদের বড় টার্গেট।
কূটনীতিকরা বলছেন এটি শুধু অভিবাসন প্রতারণা নয়; এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়। কোনো নাগরিককে প্রতারণা করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো ভয়াবহ অপরাধ। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে বেশ কিছু ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে নিজেদের বাংলাদেশি দাবি করা কয়েকজন তরুণ যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। কেউ আহত অবস্থায় সাহায্য চেয়েছেন, কেউ দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের তরুণদের বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নতুন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পাচার বাড়ছে। তাই বিদেশে চাকরির আগে সরকারি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি, চুক্তিপত্র এবং কর্মস্থলের প্রকৃতি যাচাই করা জরুরি। কারণ অনেকের কাছে রাশিয়া ছিল স্বপ্নের চাকরির দেশ। কিন্তু সেই স্বপ্নই এখন পরিণত হচ্ছে যুদ্ধ, মৃত্যু আর নিখোঁজ হওয়ার বিভীষিকায়।
আ.দৈ/আরএস




















