সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা কেন ?
নাসের চৌধুরীর অপশাসনের কালো ছায়া গণপূর্তে
বিশেষ প্রতিবেদন

তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন না। এখানেই শেষ না। তার রুমে সাংবাদিক ঢোকা নিষেধ। গণপূর্ত অধিদপ্তরে সাংবাদিকদের জন্য আলাদা খাতা চালু করা হয়েছে। সেখানে নাম, পত্রিকার পরিচয়, আগমনের কারণ, কার সঙ্গে দেখা করবেন বিস্তারিত লিখে দিতে হয়। এমনকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া কোনো সাংবাদিককে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয় না।
এমনকি পূর্ত ভবনে ঢোকার ক্ষেত্রেও প্রধান ফটকে প্রতিটি দর্শনার্থীকে শুরুতেই জানতে চাওয়া হয়, সাংবাদিক কিনা। তথ্য নিতে যার কাছে যেতে হয় তাকে ফোন করতে হবে। তারপরে ঢোকার অনুমতি মেলে। ভিজিটর কার্ড নিয়ে ভেতরে ঢুকতে হয়। এরপরেও ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেমের মাধ্যমে মূল ভবনে ঢোকা। এরপরে বের হবার সময়ও একই অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। সাংবাদিক কত সময় ভবনে অবস্থান করলো তা মনিটরিং করা হয়। এ সব সিস্টেম তৈরির মানুষটি গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী-২ ড. আবু নাসের চৌধুরী।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তর দপ্তর জনগণের টাকায় পরিচালিত হওয়ার কথা, সেটিই এখন যেন পরিণত হয়েছে এক ‘নিয়ন্ত্রিত দুর্গে’। অভিযোগ উঠেছে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরীর অঘোষিত নির্দেশ ছাড়া প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশ কার্যত অসম্ভব। দুর্নীতি, টেন্ডার সিন্ডিকেট, কমিশন বাণিজ্য, পদায়ন বাণিজ্য এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে তাকে ঘিরে এখন তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনা তৈরি হয়েছে প্রশাসনিক অঙ্গনজুড়ে।
একাধিক সূত্র জানায়, সাবেক আলোচিত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ হাফিজুর রহমান মুন্সী ওরফে টিপু মুন্সির ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়ার সুবাদে দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাবের বলয়ে রয়েছেন ড. আবু নাসের চৌধুরী। আর সেই প্রভাব ব্যবহার করেই তিনি অধিদপ্তরের ভেতরে গড়ে তুলেছেন এক অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ উঠেছে ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-২ এ তার পদায়ন নিয়ে।
এর আগেই নাসের চৌধুরী বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে ওঠে ভয়াবহ অনিয়ম, টেন্ডার কারসাজি ও কমিশন বাণিজ্যের বিস্ফোরক অভিযোগ। সূত্রগুলো বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বরাদ্দ ও এপিপিভুক্ত বিভিন্ন কাজ এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের অনুমোদন দিয়ে মোটা অঙ্কের কমিশন বাণিজ্য করা হয়েছে।
একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, প্রকল্প পাইয়ে দেয়ার নামে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায় করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে ভেরিয়েশন সুবিধা পাইয়ে দেয়ার নামেও হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। অভিযোগ রয়েছে, বগুড়ায় দায়িত্বে থাকলেও সপ্তাহে দুই দিনের বেশি অফিস করতেন না ড. আবু নাসের। বাকি সময় ঢাকায় অবস্থান করে তদবির, পদ বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেই ব্যস্ত থাকতেন তিনি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলেই তার অনিয়মিত উপস্থিতির প্রমাণ মিলবে। তার বিপুল সম্পদের তথ্য নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
একাধিক বিশেষজ্ঞ বলছেন, সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের কর্মচারীরা জনগণের সেবক মাত্র। রাষ্ট্রের সম্পদ জনগণের, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য নয়। অথচ ড. আবু নাসের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো প্রমাণ করে, তিনি যেন সরকারি দপ্তরকে ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে পরিণত করেছেন।
এ বিষয়ে ড. আবু নাসের চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য পরপর তিন দিন তার অফিসে গিয়ে কোন কথা বলেন নি। এমন কি রুমেও ঢুকতে দেয়নি। সাংবাদিকদের প্রবেশে এত কড়াকড়ির কারণ জানতে চাইলে তার কর্মকর্তারা জানান, সাংবাদিক জানলে তাকে তিনি ধমক দেন।
একাধিক সূত্র জানায়, রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই ব্লকে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, মোহাম্মদপুরে আরেকটি ফ্ল্যাট, বারিধারা ও গুলশান-২ এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট এবং গাজীপুরে প্রায় ২০ একর জমির মালিক তিনি। এছাড়াও নামে-বেনামে বিপুল ব্যাংক হিসাব ও অঘোষিত সম্পদের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার জন্ম দিয়েছে সাংবাদিকদের প্রতি তার আচরণ।
অর্থের বিনিময়ে আবু নাসের চৌধুরী ঢাকা গণপূর্তর সার্কেল-২ পোষ্টিং বাগিয়ে নিয়েছেন। আবু নাসের চৌধুরী হাসিনা সরকারের আমলে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসাবে দীর্ঘদিন গণপূর্ত সম্পদ বিভাগে থেকে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি এবং টেন্ডার বাণিজ্যে করছেন। একইভাবে বগুড়া গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসাবে এপিপির কাজ এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান অনুমতি দিয়ে কোটি কোটি হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বগুড়া গণপূর্ত বিভাগে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে আবু নাসের চৌধুরী ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান অনুমতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বিশেষ বরাদ্দের কাজ ও এপিপির কাজ দিয়ে ১০% কমিশন হাতিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগের পাহাড়, প্রভাবের বলয়, টেন্ডার সিন্ডিকেট, অস্বচ্ছ সম্পদের প্রশ্ন এবং পেশাদার সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে অঘোষিত বাধা সব মিলিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরে এখন যেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এক ভয়ংকর ‘দুর্গতন্ত্র’। আর সেই দুর্গের কেন্দ্রবিন্দুতে ঘুরপাক খাচ্ছে আলোচিত নাম আবু নাসের চৌধুরী।
আ.দৈ/আরএস




















