বন্ধের দাবি এলাকাবাসীর
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশে মদের বার
ফ্যাসিস্ট নুরুল ইসলামের দাপটে চলে
ইসমাঈল হুসাইন ইমু

হাসপাতালের নিচে মদের বারের পর এবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশে মদের বারের তথ্য পাওয়া গেছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গড়ে উঠেছে একাধিক ‘মদের বার’।
জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ। তাদের অভিযোগ, শিক্ষার্থী ও তরুণদের অবাধ যাতায়াতের এলাকায় এসব বারের বিস্তার সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এদিকে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নয় বলে দাবি করেছে পুলিশ প্রশাসন। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা ইতোমধ্যে লালমাটিয়া সোসাইটির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট বার মালিকদের কাছে আপত্তিপত্রও পাঠিয়েছেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর বলছে, গত দুই বছরে নতুন করে কোনো মদের বারের অনুমোদন তারা দেয়নি।
সরকারি অনুমোদন না পেলেও ডিপিএলের মালিক নুরুল ইসলামের দাপটে চলছে লালমাটিয়ার এই মদের বার। এর আগে পান্থপথের ডিপিএল বার নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর নানা মহল থেকে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়। যদিও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে মোহাম্মদপুরে কোন বারের অনুমতি দেয়নি।
এ বিষয়ে প্রশাসন কিছু জানে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান। তিনি বলেন, লালমাটিয়া কিংবা তার আশপাশে মদের ‘বার’ দেওয়া হয়েছে- এমন বিষয় আমাদের জানা নেই। এ বিষয়ে আমাদের কাছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা কোনো দফতর থেকে কোনো চিঠি আসেনি। বিষয়টি নিয়ে আমরা খোঁজখবর নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।
লালমাটিয়া এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বারের একপাশে শিক্ষার্থী ও বইপ্রেমীদের 'বেঙ্গল বুক' এবং আরেক পাশে ইংরেজি মাধ্যম 'অক্সফোর্ড স্কুল' রয়েছে। এর পাশে লালমাটিয়া সোসাইটি এলাকাজুড়ে অর্ধশত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২০টির বেশি মসজিদ ও বড় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যার ফলে এই এলাকায় মদের বার নিয়ে সবার মধ্যে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। এসব মদের বার বন্ধ করতে ইতোমধ্যে হাউজিং সোসাইটি বরাবর অভিযোগ জানানো হয়েছে।
স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মোহাম্মদপুরকে মাদকমুক্ত করতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন জেনেভা ক্যাম্পে অভিযান চালায়। অথচ, আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশে প্রশাসনের নাকের ডগায় এভাবে প্রকাশ্যে মাদকের আস্তানা 'মদের বার' গড়ে ওঠেছে। একই এলাকায় মাদক নিয়ে প্রশাসনের দুই নীতিতে মনে হচ্ছে, প্রশাসনই চায় এলাকাজুড়ে মাদক ব্যবসা চলতে থাকুক।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, সন্তানদের স্কুলে আনা-নেওয়ার সময় প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। অনেক শিক্ষার্থীও কৌতূহলবশত এসব স্থানের সামনে ভিড় করে। অনেক শিক্ষার্থী এই ‘বার’ সম্পর্কে জানতে চায়। এখানে কী হয়- এটা নিয়ে তাদের কৌতূহল রয়েছে। যা তাদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একটি ঘনবসতি শৃঙ্খল আবাসিক এলাকার ভেতর এমন মদের বার গড়ে তোলা কতটা বাস্তবসম্মত? কীভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন একটি এলাকায় মাদকের আস্তানা গড়ে তুলতে পারে? দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকার পদক্ষেপ নিয়ে এটি বন্ধ করা উচিত বলে মনে করেন তারা।
তৌহিদুল হাসান নামের এক অভিভাবক বলেন, আমার সন্তান ধানমন্ডি বয়েজ স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। প্রতিদিনই এদিক দিয়ে যাতায়াত করে। অনেক সময় দেখা গেছে, আমরা ব্যস্ত থাকায় তাকে একা গাড়িতে করে স্কুলে পাঠিয়ে দিই। আবাসিক এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশে এমন মাদকের আড্ডাখানা গড়ে তোলা কতটা যৌক্তিক? কীভাবে এর অনুমোদন দেওয়া হয়? তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এ নিয়ে আমরা অনেক অভিভাবক ইতোমধ্যে হাউজিং সোসাইটির অফিসে গিয়ে মৌখিকভাবে অভিযোগ জানিয়ে এসেছি। ‘বার’ বন্ধ করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে বলে এসেছি। আশা করছি শিগগির প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।
স্থানীয় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ওয়ালিদ আবদুল্লাহ বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে এ ধরনের বার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শিশু-কিশোরদের মধ্যে ভুল বার্তা যায়। অনেক শিশু আগ্রহের বশে মদের বার দেখতে যাবে, অনেকে বারে গিয়ে মাদক সেবনও করতে পারে। এমন একটি এলাকায় এভাবে মদের বার গড়ে ওঠলে স্থানীয় শিশু-কিশোররা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক এলাকায় মাদকসেবী বাড়বে। তাই সংশ্লিষ্ট সবার উচিত, দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে এমন একটি আস্তানা বন্ধ করে দেওয়া।
অপরদিকে আবাসিক এলাকার পাশে এমন ‘বার’ বন্ধের জন্য ইতোমধ্যে 'লালমাটিয়া সোসাইটি' কর্তৃপক্ষের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। সংগঠনের সভাপতি হাজী বেলাল আহমেদ বলেন, আমাদের কাছে স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকরা মৌখিকভাবে অভিযোগ করে গেছেন। দ্রুত ‘বার’ স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে আমরা সোসাইটির পক্ষ থেকে চিঠি পাঠিয়েছি। আবাসিক এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে এমন মদের আসর সবার জন্য ক্ষতির কারণ।
সোসাইটির সভাপতি বলেন, নগর পরিকল্পনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কঠোর নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। আমরা চাই এমন ‘বার’ বন্ধসহ শিক্ষা ও আবাসিক এলাকার পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে তা বন্ধ করে দেবে।
ফু-ওয়াং বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. শামীম বিল্লাহ বলেন, ধানমন্ডির বারটি আমাদের নয়। এটি কয়লা নামে একটি প্রতিষ্ঠানের। আরিফ নামে এক ব্যক্তি আমাদের থেকে স্বত্ব কিনে নিয়েছেন।
নতুনভাবে একটি আবাসিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিপূর্ণ এলাকায় মদের বার গড়ে ওঠা নিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) আবুল কালাম আজাদ বলেন, গত দুই বছর যাবত কোনো মহানগরী এলাকায় নতুন মদের বার তৈরির অনুমোদন দেওয়া হয়নি। কেউ এমন প্রতিষ্ঠান করলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।
আবুল কামাল আজাদ বলেন, একটি ‘বার’ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন বিষয় তদন্ত শেষে যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দিই। ‘বার’ তৈরির সংশ্লিষ্ট এলাকায় কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকা থাকলে সেখানে তা তৈরির কোনো অনুমোদনই দেওয়া হয় না।
আ.দৈ/আরএস




















