একেরপর এক শিশু ধর্ষণ ও হত্যা
নিষ্ঠুর পাশবিকতার শেষ কোথায়
শাহীন রহমান

গত মঙ্গলবার সকালে পল্লবী সেকশন-১১ এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী রামিসার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ৮ বছর বয়সী শিশুকে হত্যার আগে ধর্ষণ করে অভিযুক্ত সোহেল রানা। সোহেল ওই শিশুকে টয়লেটে নিয়ে প্রথমে ধর্ষণ করে। পরে তাকে গলা কেটে হত্যা হত্যা করে বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে অভিযুক্ত ব্যক্তি। শুধু রামিসা নয়।
একইদিনে রামপুরার বনশ্রী থেকে ১০ বছরের মাদ্রাসা ছাত্রের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত শিশুটির নাম আবদুল্লাহ। বয়স ১০। সে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার প্রবাসী আবুল কালাম আজাদের ছেলে।
শিশুটি মাদ্রাসায় থাকতো এবং হিফজ বিভাগে পড়াশোনা করতো। সুরতহাল শেষে পুলিশ বলছে, শিশুটির পায়ুপথ অস্বাভাবিক ফাঁকা। ধারনা করা হচ্ছে, শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে। বনশ্রী সি ব্লকের ‘আলোকিত কোরআন ইন্টারন্যাশনাল হিফজু মাদ্রাসা’র বাথরুম থেকে গামছা দিয়ে গলায় ফাঁস লাগানো শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এটা দুদিনের ঘটনার বিবরণ। সম্প্রতি সময়ে দেশজুড়ে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শিশু হত্যা। কখনও অপহরণের পর মুক্তিপণ না পেয়ে হত্যা, কখনও পারিবারিক কলহ, কখনও ধর্ষণ ঢাকতে নির্মম হত্যাকাণ্ড প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ শিরোনামে উঠে আসছে শিশুর মরদেহ উদ্ধারের খবর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, অধিকাংশ ঘটনায় হত্যাকারী পরিচিতজন। আর সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিক অবক্ষয়, মাদক, পারিবারিক সহিংসতা ও ডিজিটাল অপরাধের বিস্তার শিশুদের আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
শুধু রাজধানী নয়, জেলা-উপজেলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এই সহিংসতা। শিশু অধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো অনেক ক্ষেত্রেই হত্যার ধরন অত্যন্ত নৃশংস, যা সমাজে গভীর আতঙ্ক তৈরি করছে।
গত কয়েক মাসে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া একাধিক ঘটনায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর উপকণ্ঠে আট বছরের এক শিশুকে নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর পরিত্যক্ত ভবন থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তে জানা যায়, পরিবারের পরিচিত এক ব্যক্তি চকলেটের প্রলোভন দেখিয়ে শিশুটিকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে। খুলনায় স্কুলে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হওয়া দশ বছরের এক শিশুর মরদেহ পরে নদীর পাড় থেকে উদ্ধার হয়।
পুলিশ বলছে, মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে অপহরণের পর পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় শিশুটিকে হত্যা করা হয়। চট্টগ্রামে সৎ বাবার নির্যাতনে প্রাণ হারায় ছয় বছরের এক শিশু। প্রতিবেশীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই নির্যাতনের শিকার ছিল শিশুটি। কিন্তু বিষয়টিকে “পারিবারিক ব্যাপার” মনে করে কেউ কার্যকরভাবে এগিয়ে আসেনি। শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বরং একই ধরনের সহিংস প্রবণতার ধারাবাহিক বহিঃপ্রকাশ।
জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফ বাংলাদেশ জানিয়েছে, দেশে প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৯ জনই পরিবারে কোনো না কোনো ধরনের সহিংস আচরণের শিকার হয়। সংস্থাটির মতে, দেশে ৪ কোটি ৫০ লাখের বেশি শিশু নিয়মিত শারীরিক বা মানসিক সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে। শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, পারিবারিক সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, অপহরণ, মাদক এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে শিশু হত্যার ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু হত্যার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক নানা সংকট একসঙ্গে কাজ করছে। সমাজে সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ ঘটছে। পরিবারে অস্থিরতা, দাম্পত্য কলহ, মাদকাসক্তি ও নৈতিক অবক্ষয় শিশুদের ঝুঁকিতে ফেলছে। আগে যে রাগ বা বিরোধ সীমিত পর্যায়ে থাকত, এখন তা ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সালেহা আক্তার বলেছেন সমাজে সহিংসতার প্রবণতা এখন পরিবার পর্যন্ত ঢুকে পড়েছে। আগে শিশুরা বাইরের ঝুঁকিতে বেশি থাকলেও এখন পরিচিত মানুষ, এমনকি পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও হুমকির মুখে পড়ছে। এটি সামাজিক মূল্যবোধের গভীর সংকটের ইঙ্গিত। ডিজিটাল আসক্তি, পারিবারিক ভাঙন, মাদক এবং অসহিষ্ণুতা মিলিয়ে একটি অস্থির সমাজ তৈরি হয়েছে, যেখানে শিশু সবচেয়ে দুর্বল শিকার।”
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য সংকটও বড় কারণ। হতাশা, আসক্তি ও নিয়ন্ত্রণহীন আচরণের কারণে অনেকেই শিশুদের ওপর চরম নির্যাতন চালাচ্ছে। বিশেষ করে সৎ বাবা-মা, অভিভাবক বা নিকট আত্মীয়ের সম্পৃক্ততা বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মাহবুব রহমান বলেন, অনেক অপরাধীর মধ্যেই আচরণগত বিকার, রাগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও মানসিক অসুস্থতার উপসর্গ থাকে। কিন্তু দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনও অত্যন্ত সীমিত। ফলে সহিংস প্রবণতা অনেক সময় ভয়াবহ অপরাধে রূপ নেয়। তিনি বলেন, শিশুর ওপর নির্যাতনের আগে সাধারণত কিছু সতর্ক সংকেত থাকে অস্বাভাবিক আচরণ, ভয়, চুপচাপ হয়ে যাওয়া বা আতঙ্ক। পরিবারকে এসব লক্ষণ বুঝতে হবে।
শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, অর্থনৈতিক সংকট ও পারিবারিক ভাঙনের প্রভাবও মারাত্মক। দরিদ্র পরিবারে শিশুদের পর্যাপ্ত নজরদারি থাকে না। অনেক বাবা-মা জীবিকার তাগিদে বাইরে থাকেন। ফলে শিশুরা দীর্ঘ সময় অরক্ষিত অবস্থায় থাকে। গ্রাম থেকে শহরে আসা নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বস্তি এলাকায় মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাধী চক্রের প্রভাবের কারণে শিশুরা সহজ টার্গেটে পরিণত হচ্ছে। একটি শিশু অধিকার সংস্থার নির্বাহী পরিচালক বলেন, “শুধু আইন করলেই হবে না। পরিবার, স্কুল ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে সামাজিক সচেতনতা ভয়াবহভাবে কম।
ইউনিসেফ বলছে, এ ধরনের সহিংস আচরণ শিশুর মানসিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ আচরণে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পরিবারে সচেতনতা বাড়ানো, সহিংসতামুক্ত শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কমিউনিটি পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের সাহস বাড়াচ্ছে। বহু আলোচিত হত্যাকাণ্ড বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। অনেক পরিবার মামলা চালাতে গিয়ে আর্থিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়ে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, শিশু হত্যা মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। একই সঙ্গে তদন্তের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ঘটনায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারণে তদন্ত ধীরগতির হয়। তারা বলেন, যখন অপরাধী দেখে যে শাস্তি অনিশ্চিত, তখন ভয় কমে যায়। শিশু হত্যা মামলাগুলোকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা জানিয়েছে বর্তমানে শিশু হত্যা মামলার বড় অংশেই পরিচিতজন জড়িত থাকছে। অপহরণ, যৌন নির্যাতন গোপন করা কিংবা পারিবারিক প্রতিশোধ এসব কারণ বেশি দেখা যাচ্ছে। কমিউনিটি নজরদারি ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আগে প্রতিবেশীরা একে অপরের খোঁজ রাখত, এখন সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বেড়েছে।
আইনজীবী ব্যারিস্টার তানভীর হাসান বলেছেন, শিশু হত্যা মামলাগুলোকে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত নিষ্পত্তি করা দরকার। দীর্ঘসূত্রতা কমলে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় তৈরি হবে।বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সিসিটিভি, স্কুল নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও কমিউনিটি মনিটরিং কার্যকর হলে অনেক ঘটনা প্রতিরোধ সম্ভব ছিল। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ এলাকায় শিশু নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। অনেক স্কুলে শিশু পরিবহন ব্যবস্থার কোনো নিরাপত্তা নীতিমালা নেই। আবার আবাসিক এলাকায় অপরিচিত লোকজনের গতিবিধি নিয়েও তদারকি দুর্বল। ফলে অপরাধীরা সহজেই সুযোগ পাচ্ছে।
আতঙ্কে অভিভাবকরা॥ ক্রমাগত শিশু হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যে। সন্তান স্কুলে গেলে, খেলতে বের হলে বা কোচিংয়ে গেলে অনেক পরিবার আতঙ্কে থাকছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নির্মম ঘটনার ভিডিও ও তথ্য সেই ভয় আরও বাড়িয়ে তুলছে। রাজধানীর এক অভিভাবক বলেন, এখন সন্তানকে একা বাইরে পাঠাতে ভয় লাগে। পরিচিত কাউকেও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছি না।
সমাধান কী॥ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কঠোর আইন নয় সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ দরকার। শিশু সুরক্ষা নীতির বাস্তবায়ন, দ্রুত বিচার, পরিবারে সচেতনতা, স্কুলভিত্তিক নিরাপত্তা শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। তাদের মতে, প্রতিটি শিশু হত্যার ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
আ.দৈ/আরএস




















