জুলাই থেকে নবম পে স্কেল
অর্থনীতিতে স্বস্তি বার্তা থাকলেও মূল্যস্ফীতি ও জীবন মানে প্রভাব পড়ার শঙ্কা
শাহীন রহমান

সরকার যদি অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে ব্যাংকঋণ বাড়ায় বা নতুন কর আরোপ করে, তাহলে সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় আকারের বেতন বৃদ্ধি প্রায়ই মূল্যস্ফীতি বাড়ায়। বিশেষ করে খাদ্য ও বাসাভাড়ার বাজারে এর প্রভাব দ্রুত পড়ে।
দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় পর অবশেষে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে সরকার। আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। নতুন এই পে স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব এসেছে। একই সঙ্গে বাড়ানো হচ্ছে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও অন্যান্য ভাতাও।
সরকারের দাবি মূল্যস্ফীতির চাপে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান রক্ষা করতেই এ উদ্যোগ। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে যেমন বাজারে ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, তেমনি বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি এবং সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপও।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ টিআইবি এই বেতন বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে আগেই প্রশ্ন তুলেছে। সংগঠনটির মতে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বেতন বৃদ্ধি একটি স্বাভাবিক ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। কিন্তু রাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব আয়ের সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর বাস্তবতায় এ মুহূর্তে নতুন পে-স্কেলের উদ্যোগ কতটা সুবিবেচনাপ্রসূত, তা নিয়ে যৌক্তিক বিশ্লেষণের দাবী রাখে।
সংস্থাটি যথার্থই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, জনপ্রশাসন সংস্কার ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত না করে কেবল বেতন বাড়ানো হলে তা কার্যত দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগকেই আরও প্রসারিত করবে। হুট করে পে-স্কেল বাস্তবায়ন করলে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
টিআইবির নির্বাহি পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন জনগণের করের টাকায় যাদের বেতন হয়, তাদের জবাবদিহিহীন আচরণ, সেবাপ্রদানে অনীহা এবং দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা দূর না করে কেবল আর্থিক সুবিধা বাড়ানো হলে তা হবে সাধারণ করদাতাদের প্রতি অবিচার। তাছাড়া এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হতে পারেন সমাজের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। সরকারি খাতে বেতন বৃদ্ধির একটি অবশ্যম্ভাবী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বাজারব্যবস্থার ওপর।
অতীতের ধারা অনুযায়ী, পে-স্কেল ঘোষণার পরপরই দ্রব্যমূল্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে নিম্নআয়ের মানুষ এবং বেসরকারি খাতে কর্মরত বিশাল জনগোষ্ঠীর ওপর। সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লেও বেসরকারি খাতের কর্মী কিংবা দিনমজুরদের আয় সেই অনুপাতে বাড়ে না, অনেক ক্ষেত্রে অপরিবর্তিতই থাকে।
ফলে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে এই শ্রেণির মানুষের ওপর বিশাল অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে, যা বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলবে। এদিকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আগামী অর্থবছর, অর্থাৎ ১ জুলাই থেকেই নতুন বেতনকাঠামোর বাস্তবায়ন হবে। কীভাবে তা উত্তম উপায়ে করা যায়, এটি নিয়ে কাজ চলছে।’
২০১৫ সালে ঘোষিত অষ্টম জাতীয় পে স্কেল কার্যকর হওয়ার পর গত ১১ বছরে দেশের অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বাজারমূল্যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তখন সর্বনিম্ন বেতন ছিল ৮ হাজার ২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা। নতুন প্রস্তাবিত নবম পে স্কেলে সেই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়াচ্ছে প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি। সরকারি চাকরিজীবীদের ভাষ্য, বিদ্যমান বাজারদরে পুরোনো বেতন কাঠামো দিয়ে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে মধ্যম ও নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে ছিলেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন পে স্কেল একসঙ্গে পুরোপুরি কার্যকর না করে তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপে আগামী জুলাই থেকে মূল বেতনের একটি অংশ কার্যকর হবে। পরবর্তী দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে পূর্ণ সুবিধা যুক্ত করা হবে। এজন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার চিন্তা করছে সরকার।
৮ম বনাম ৯ম পে স্কেল: কোথায় কত পরিবর্তন॥ ২০১৫ সালের অষ্টম পে স্কেলে ২০টি গ্রেডে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ করা হয়েছিল। নবম পে স্কেলেও একই কাঠামো বহাল থাকলেও প্রায় সব গ্রেডেই মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। ৮ম পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। প্রস্তাবিত ৯ম পে স্কেলে সর্বনিম্ন বেতনের প্রস্তাব করা হয়েছে ২০হাজার টাকা। এছাড়া অষ্টম স্কেলে সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা।
প্রস্তাবিত নবম পে স্কেলে এই বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১লাখ ৬০ হ্জাার টাকা। এছাড়া আগের পে স্কেলে বাড়িভাড়া ভাতা মূল বেতনের নির্দিষ্ট অংশ। নতুন স্কেলে এই ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। আগের স্কেলে চিকিৎসা ভাতা সীমিত। নতুন স্কেলে দ্বিগুণের কাছাকাছি বাড়তে পারে। অষ্টমে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশ। নতুন স্কেলে কাঠামোগত পরিবর্তনের আলোচনার কথা বলা হয়েছে। পেনশন সুবিধা সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন কাঠামোয় নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেলেও উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বেতনও বড় আকারে বাড়ছে। ফলে প্রশাসনিক ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, শুধুমাত্র বেতন বৃদ্ধি করলেই সরকারি সেবার মান বাড়বে না; একই সঙ্গে জবাবদিহি, দক্ষতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণও জরুরি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, গত এক দশকে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। চাল, ডাল, তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বাড়িভাড়া সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। সরকারি কর্মচারীদের একটি বড় অংশ শহরে বাসাভাড়া ও শিক্ষা ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই নতুন পে স্কেলের দাবি জানিয়ে আসছিল।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠনগুলোর দাবি ছিল, বর্তমান বাজার বাস্তবতায় সর্বনিম্ন বেতন কমপক্ষে ২৫ হাজার টাকা করতে হবে। যদিও প্রাথমিকভাবে সরকার ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্যও নতুন গাড়ি সুবিধা, বিশেষ ভাতা ও পদভিত্তিক সুযোগ-সুবিধা পুনর্বিন্যাসের আলোচনা চলছে।
জনগণের ওপর কী প্রভাব পড়বে॥ নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ গেলে বাজারে ভোগব্যয় বাড়বে। এতে একদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসতে পারে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপও তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক এক গবেষক বলেন, “সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ে। এতে খুচরা বাজার, আবাসন, শিক্ষা ও সেবা খাতে চাহিদা বাড়ে। কিন্তু উৎপাদন ও সরবরাহ সেই হারে না বাড়লে পণ্যমূল্যও বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশ মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। তাদের আয় বাড়লে প্রথমে শহরাঞ্চলের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাবে। ইলেকট্রনিক পণ্য, মোটরসাইকেল, ফ্ল্যাট, বেসরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বাড়তে পারে। ব্যাংকে আমানত বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে এর বিপরীত আশঙ্কাও কম নয়। সরকার যদি অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে ব্যাংকঋণ বাড়ায় বা নতুন কর আরোপ করে, তাহলে সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় আকারের বেতন বৃদ্ধি প্রায়ই মূল্যস্ফীতি বাড়ায়। বিশেষ করে খাদ্য ও বাসাভাড়ার বাজারে এর প্রভাব দ্রুত পড়ে।
নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে বেসরকারি চাকরিক্ষেত্রেও চাপ তৈরি হতে পারে। সরকারি চাকরির সঙ্গে বেতনের ব্যবধান কমাতে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কর্মীদের বেতন বাড়াতে হতে পারে। বিশেষ করে ব্যাংক, বীমা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন বেতন কাঠামো আনতে বাধ্য হতে পারে। শ্রমবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি চাকরিতে আকর্ষণ আরও বাড়বে। চাকরিপ্রার্থীদের বড় অংশ আবারও সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে উদ্যোক্তা ও বেসরকারি খাতে দক্ষ জনবল সংকটও তৈরি হতে পারে।
রাজস্ব আদায়ে নতুন চ্যালেঞ্জ॥ নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে সরকারের বাড়তি ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বিকল্প নেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ইতোমধ্যে করজাল সম্প্রসারণ, ভ্যাট সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল করব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ব্যবসায়ী মহল আশঙ্কা করছে, অতিরিক্ত করের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ঘাড়েই চাপবে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে বড় আকারের বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের আগে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি। না হলে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়লেও কাঙ্খিত অর্থনৈতিক সুফল নাও আসতে পারে।
জানা গেছে আগামী বাজেট অধিবেশনেই নবম পে স্কেলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। এরপর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন শুরু হবে। ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং বেতন কমিশনের সুপারিশ নিয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, নতুন পে স্কেল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একদিকে স্বস্তির বার্তা, অন্যদিকে বড় পরীক্ষাও। যদি এর সঙ্গে উৎপাদনশীলতা, প্রশাসনিক সংস্কার ও বাজার নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা যায়, তবে এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যথায় বাড়তি অর্থপ্রবাহ মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
আ.দৈ/আরএস




















