হামে মৃত্যু নিয়ে দ্বৈত তথ্যে বাড়ছে বিভ্রান্তি
বিশেষ প্রতিনিধি

আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু’ আর ‘উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু’দুই হিসাবেই বাড়ছে উদ্বেগ
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা, পরীক্ষা সংকট ও তথ্যের অসামঞ্জস্যে বাড়ছে জনমনে শঙ্কা
হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে সারাদেশে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব মতে এখন পর্যন্ত এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৪৭৫ জনের। তবে ‘আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু’ আর ‘উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু’দুই হিসাবেই উদ্বেগ বাড়লে হামে মৃত্যু নিয়ে দ্বৈত তথ্যের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। সমাজে ভুল বার্তা যাচ্ছে। এতে সরকার যেমন চাপে পড়ছে। আবার ঢালাও ভাবে বিগত অন্তবর্তী সরকারের উপর দোষারোপ করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে “নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে” মারা গেছে ৫৭ শিশু। একই সময়ে “হামের উপসর্গ নিয়ে” মারা গেছে আরও ২৭৯ জন। অর্থাৎ মোট ৩৩৬ জন শিশুর মৃত্যু হলেও এর বড় অংশ এখনো পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দুই পরিসংখ্যানের পার্থক্য শুধু তথ্যগত নয়; এটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা, ল্যাব পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং রোগ নজরদারির দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। কারণ হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বলতে বোঝানো হচ্ছে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া রোগী, আর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হলো এমন রোগী যাদের মধ্যে হামসদৃশ লক্ষণ ছিল, কিন্তু পরীক্ষা হয়নি বা রিপোর্ট আসেনি।
এই দুই ধরনের তথ্যের পার্থক্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তেমনি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও বলছেন সঠিক তথ্য ব্যবস্থাপনা না থাকলে সংক্রমণের প্রকৃত চিত্র আড়ালেই থেকে যাবে।
সরকারি হিসেবে যেসব মৃত্যুকে “হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু” বলা হচ্ছে, সেগুলোর বেশিরভাগই পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া রোগী। অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তি হাম ভাইরাসে সংক্রমিত ছিলেন এবং সেই রোগ বা তার জটিলতায় মৃত্যু হয়েছে এমন প্রমাণ রয়েছে। অন্যদিকে “হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু” বলতে বোঝানো হচ্ছে এমন সব রোগীকে, যাদের শরীরে হামসদৃশ উপসর্গ ছিল—যেমন জ্বর, ফুসকুড়ি, কাশি বা চোখ লাল হওয়া—কিন্তু মৃত্যুর আগে বা পরে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, দুটি তথ্যকে এক করে দেখলে বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন যদি পরীক্ষার অভাব বা রিপোর্ট বিলম্বের কারণে বহু মৃত্যুই উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হিসেবে থেকে যায়, তাহলে প্রকৃত হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা কি আড়াল হয়ে যাচ্ছে না?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে “নিশ্চিত মৃত্যু” এবং “সন্দেহভাজন মৃত্যু” আলাদাভাবে গণনা করা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই রোগী মারা যাওয়ার আগে পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল, সীমান্ত এলাকা বা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়।
হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হলো চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক নিশ্চিত তথ্য। কিন্তু “উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু” হলো সতর্কতামূলক জনস্বাস্থ্য তথ্য, যা ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ। একজন সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, “হামের মতো রোগে শুধু নিশ্চিত পরীক্ষার ওপর নির্ভর করলে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা কঠিন হয়ে যায়। কারণ অনেক রোগী পরীক্ষা ছাড়াই মারা যান। তাই উপসর্গভিত্তিক নজরদারি খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
কেন বাড়ছে ‘উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু॥ স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এখনো পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসকেরা উপসর্গ দেখে রোগীকে হাম সন্দেহে চিকিৎসা দেন। কিন্তু পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় মৃত্যুর পর সেই তথ্য “সন্দেহজনক” হিসেবেই থেকে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি কারণে “উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু”র সংখ্যা বাড়তে পারে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ল্যাব টেস্টের অভাব, রোগীকে দেরিতে হাসপাতালে আনা, অপুষ্টিজনিত জটিলতা
শিশুদের টিকাদানে ঘাটতি, হাম ও অন্যান্য ভাইরাসজনিত রোগের উপসর্গের মিল বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে হাম দ্রুত জটিল আকার নেয়। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে সংক্রমণ এবং শ্বাসকষ্টের কারণে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।
তথ্য বিভ্রাটে বাড়ছে আতঙ্ক
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র বলছে, বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য ও কেন্দ্রীয় ডাটাবেইসের তথ্যের মধ্যে মিল না থাকায় প্রায়ই বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। কোথাও “হামে মৃত্যু” বলা হলেও পরে দেখা যাচ্ছে সেটি “উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু” ছিল। আবার কিছু ক্ষেত্রে উপসর্গভিত্তিক মৃত্যুর পর পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য জনমনে আতঙ্ক বাড়াতে পারে, আবার প্রকৃত ঝুঁকিকেও আড়াল করতে পারে। স্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা বলেন, “জনগণ জানতে চায় প্রকৃত অবস্থা কী। কিন্তু যখন একেক জায়গা থেকে একেক ধরনের সংখ্যা আসে, তখন মানুষের আস্থা কমে যায়।”
চিকিৎসকদের মতে, হামকে অনেকে সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ মনে করলেও এটি অত্যন্ত সংক্রামক। আক্রান্ত একজন ব্যক্তি থেকে আরও ১২ থেকে ১৮ জন আক্রান্ত হতে পারে। অপুষ্ট শিশু, কম রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি এবং টিকা না নেওয়া শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিকাদান কর্মসূচিতে কিছুটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। করোনাকালীন সময়ে অনেক শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বাদ পড়ে। এর প্রভাব এখন হাম সংক্রমণে দেখা যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, দেশে হাম নির্মূলে ৯৫ শতাংশের বেশি টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন। কিন্তু কিছু এলাকায় সেই হার এখনো আশঙ্কাজনকভাবে কম। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, টিকাদানে সামান্য ঘাটতিও বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব ডেকে আনতে পারে। কারণ হাম অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায়। এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একদিকে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে সঠিক তথ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। যদি “হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু” এবং “উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু”র তথ্য স্পষ্টভাবে আলাদা করে প্রকাশ না করা হয়, তাহলে জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
কারণ “উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু”কে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এর মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে প্রকৃত সংক্রমণের বড় অংশ। আবার সব উপসর্গভিত্তিক মৃত্যুকেও হাম হিসেবে ধরে নেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। তাই প্রয়োজন দ্রুত পরীক্ষা, স্বচ্ছ তথ্য ও সমন্বিত নজরদারি। তাদের মতে, হাম শুধু একটি রোগ নয়; এটি একটি জনস্বাস্থ্য সূচকও। কোনো দেশে হাম বাড়া মানে সেখানে টিকাদান, পুষ্টি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় দুর্বলতা রয়েছে—এমন বার্তাও বহন করে। স্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো আতঙ্ক নয়, বরং নির্ভরযোগ্য তথ্য ও দ্রুত প্রতিরোধ ব্যবস্থা। কারণ “হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু” আর “উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু”—এই দুই সংখ্যার মধ্যকার ব্যবধানই হয়তো বলে দিচ্ছে, দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
এদিকে হামের মৃত্যু ও টিকার সংকট নিয়ে ঢালাওভাবে অন্তবর্তী সরকারকে দোষারোপে পালা চলছে। অথচ তদন্তে দেখা গেছে এই সংকট তৈরি হয়েছে পতিত হাসিনা সরকারের আমল থেকেই। যদি এর দায় অন্তবর্তী সরকার এড়াতে পারে না। অনুসন্ধানে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে টিকার ঘাটতি তৈরি হয়। করোনার প্রকোপের সময়ও সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মমন্বয়হীনতা ও ক্রয়-প্রক্রিয়ায় জটিলতায় টিকার বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। যা থেকে আজকের পরিস্থিতি।
টিকা ঘাটতি প্রসঙ্গে দেশের জনস্বাস্থ্যবিদ এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, হামের টিকার প্রথম লট এসেছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। কিন্তু দ্বিতীয় লটের টিকা দেরি করে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আসে। এতে টিকার ঘাটতি তৈরি হয়। সময়মতো ক্যাম্পেইন হয়নি। এই সময়ে নির্বাচন চলে আসায় সময়টা দীর্ঘ হয়ে যায়। আবার গত বছর স্বাস্থ্যকর্মীরা আন্দোলন করায় টিকাদানের গ্যাপ তৈরি হতে থাকে। তবে রুটিন টিকা চলছিল। এই সময়ে লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হয়নি। যে টিকা এসেছিল ওই টিকা দিয়েই এবছর ক্যাম্পেইন শুরু হয় বলে জানান তিনি। তারপর এবছর রাজস্বের অর্থছাড় করা টাকায় ক্রয় করা টিকা আসে দু’সপ্তাহ আগে।
তিনি আরও বলেন, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে টেন্ডার নিয়ে টিকা ক্রয়ে অর্থছাড় নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটা জটিলতা তৈরি হয়েছিল। এদিকে ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা নিয়ে দ্বন্দ্বে সমস্যা বড় আকার ধারণ করে। তিনি স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে জরুরি এসব বিষয়ে আইনের আরও সহজকরণ করার পরামর্শ দেন। ডা. মুশতাক হোসেন আরও বলেন, করোনার সময় ২০২০-২১ সাল থেকে হামের টিকা দেয়ার গ্যাপ তৈরি হতে থাকে দেশে।
২ বা ৩ বছর পর ক্যাম্পেইন করে টিকা দেয়ার কথা থাকলেও তা সঠিকভাবে হয়নি। এই সময়ে পঞ্চম ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল। ক্যাম্পেইন সঠিক সময় না হওয়ায় হামের প্রকোপ বেড়ে দেশে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ২০২৫-২৬ সালে এসে অস্বাভাবিক গ্যাপ তৈরি হয় হামের টিকায়। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলনের কারণে টিকার ক্যাম্পেইন আরও পিছিয়ে যায়। আর এতে ২০২৬ সালে জানুয়ারি মাসে এসে বিস্ফোরণ তৈরি হয় হামে। বাড়তে থাকে শিশুমৃত্যু ও আক্রান্ত। তিনি বলেন, গণটিকা ক্যাম্পেইনে ৫ বছর পর্যন্ত শিশুকে টিকা দেয়া হয়। নিয়মিত টিকাদানে ৫ শতাংশ শিশু বাদ পড়লে সম্পূরক টিকাদান ক্যাম্পেইনে তা কাভার করা হয়।
আ.দৈ/আরএস




















