কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় খাসকালেকশনের পায়তারায় সিন্ডিকেট
ঢাকা দক্ষিণে কোরবানীর পশুর ২ হাটের টেন্ডারে কেউ অংশ নেয়নি
আবুল কাশেম:

সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী কোরবানী পশুর হাট ইজারা। পর পর ৩ দফা টেন্ডার আহবান করেও ১১টি হাটের ইজারা সম্পন্ন করতে পারেন ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে তৃতীয় দফায় ৯টি হাটের ইজারা সম্পন্ন করলেও ২টি হাটের ইজারায় এখনো দরপত্র জমা পড়েনি বলে জানা যায়।
নাম না প্রকাশের শর্তে ডিএসসিসির দায়ত্ব প্রাপ্ত এক কর্মকর্তা বলেন, এই দুইটি অস্থায়ী কোরবানী পশুর হাটের ইজারায় কেউ দরপত্র জমা দেয়নি। তবে একটি হাটে প্রথমে সিডিউল ক্রয় করলেও পরে জমা দেয়নি। আর অপর একটি হাটের জন্য একজন সরকারি মূল্যে চেয়ে কম দরে সিডিউল জমা দিয়ে ছিলেন। যারফলে সেটি বাতিল করা হয়েছে। বলতে গেলে পর পর ৩ দফা টেন্ডার আহবার করেও কোন দুটি হাটের উজারা সম্পন্ন করা যায়নি। অবশেষে এই ২টি হাটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের মতামত চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এখনো বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তর থেকে কোন মতামত পাওয়া যায়নি।
এই হাট দুইটির একটি হচ্ছে; যাত্রাবাড়ীর কাজলা, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট ও শ্যামপুর-কদমতলী ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন খালি জায়গার হাটের নির্ধারিত দর ৬৬ লাখ ৪৬ হাজার ২৫০ টাকা। আর অপরটি হাটটি হচ্ছে সাদেক হোসেন খোকা মাঠের দক্ষিণ পাশের খালি জায়গার হাট, এটির নির্ধারিত দরে ২ কোটি ৯৪ লাখ ২৫০ টাকা।
এদিকে কোরবানী পশুর অস্তায়ী হাটের ইজারা নিয়ে ইতোমধ্যে স্থানীয় বিএনপি, এনসিপি এবং জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের ব্যাপক উত্তেজনা দেখা যাচ্ছ। তবে প্রভাবশালীদের সিন্ডিকেট ভাঙ্গতে পারছেন না ডিএসসিসির প্রশাসন।
তবে ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা ‘আজকের দৈনিক’ পত্রিকাকে নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, সরকারের নিয়মের বাইরে তার কিছু করবেন না।ওই তিনি বলেন, ১১টি হাটের মধ্যে ৮টি হাটের ইজারা সরকারি মূল্য নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া গেছে। একটি হাটের ইজারা সরকারি নির্ধারিত দরের সমপরিমান হওয়ায় সেটিও চূড়ান্ত করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবে জোর করে পশুর হাট জমাতে চাইলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এই বিষয়টি পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশনা দেওয়া হবে। পুলিশ এবং প্রশাসন কি করবেন,সেটা তাদের বিষয়।
ডিএসসিসির সূত্র মতে,প্রথম দফায় ১১টি হাটের ইজারায় টেন্ডার আহবান করা হয় ২৭ এপ্রিল। এই টেন্ডারের শর্তে উল্লেখ করা হয় ২৯ এপ্রিল সিডিউল বিক্রি এবং ৩০ এপ্রিল সকাল ৯ টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২ টা পর্যন্ত জমা গ্রহণ করা হবে। ওই দিন ২৭ এপ্রিল নগর ভবনে প্রথম দফায় টেন্ডার নিয়ে ব্যাপক হট্টগোল হয়।
২৭ এপ্রিল দুপুরে ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগের সামনে সরকারি দল বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। যাত্রাবাড়ীর কাজলা, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট ও শ্যামপুর-কদমতলী ট্রাকস্ট্যান্ডসংলগ্ন পশুর হাটের দরপত্র সংগ্রহকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে এই উত্তেজনা তৈরি হয়। ওইদিন শ্যামপুর থানা জামায়াতের আমির মোহাম্মদ মহিউদ্দিনসহ দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে শ্যামপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মাহবুব মওলা হিমেল ও যাত্রাবাড়ী থানা বিএনপির নেতা শ্যামলের অনুসারী সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এর ফলে প্রথম দফায় কোন পশুর হাটের ইজারায় কাঙ্খিত সরকারি মূল্য পাওয়া যায়নি। পরে দ্বিতীয় দফায় টেন্ডারে গত ৭ মে সিডিউল বিক্রি এবং ১০ মে সকাল ৯ টা থেকে সাড়ে ১২ টায় জমা নেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। এবারও কাঙ্খিত সরকারি মূল্য না পেয়ে ,পুনরায় তৃতীয় দফা ১৪ মে সিডিউল বিক্রি এবং ১৭ মে সকাল ৯ টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২ টা জমা নেয়ার কথা উল্লেখ করে টেন্ডার আহবান করা হয়। তবে এবার ১১টি হাটের মধ্যে ৯ টি হাটের ইজারায় প্রতেযোগিতা হয়েছে এবং সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি টাকায় ইজারা সম্পন্ন হচ্ছে। কিন্তু সিন্ডিকেট এবার ওই দুইটি হাটের ইজারায় কেউ অংশ গ্রহণ করেননি।
এবার সিন্ডিকেটের সদস্যদের টার্গেট বিনা টেন্ডারে জোর করে ঈদের ৩/৪ দিন আগে অস্থায়ী পশুর হাট জমাবেন এবং ডিএসসিসির প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে কথিত খাস কালেকশনের নামে কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব নিজেরা ভাগ করে নিবেন।
এদিকে সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী কোরবানী পশুর হাটের ইজারা চূড়ান্তভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
ডিএসসিসির অস্থায়ী পশুর হাটগুলো হচ্ছে; পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের পশ্চিম পাশে নদীর তীরবর্তী খালি জায়গায় নির্ধারিত ইজারা দর ২ কোটি ৭১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৭ টাকা, তবে এবার ইজারা হয়েছে ৪ কোটি ১ লাখ টাকা। উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাবের খালি জায়গার হাটের নির্ধারিত দর ১ কোটি ৮২ লাখ ৩৩ হাজার ৩৩৪ টাকা,এবার ইজারা হয়েছে ৩ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। রহমতগঞ্জ ক্লাবের খালি জায়গার হাটের নির্ধারিতি দর ৬৭ লাখ ৩১ হাজার ৬৬৭ টাকা, এবার ইজারা হয়েছে ৭৫ লাখ ১৮ হাজার টাকা।
আমুলিয়া মডেল টাউনের খালি জায়গায় হাটের নির্ধারিত দর ৫৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬৬৭ টাকা,এবার ইজারা হয়েছে ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। শিকদার মেডিকেল কলেজসংলগ্ন আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের খালি জায়গায় অস্থায়ী হাটের দর ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা,এবার ইজারা হয়েছে ৪ কোটি ২০ লাখ ১০ হাজার টাকা ।
কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি পানির পাম্পসংলগ্ন রাস্তার অব্যবহৃত জায়গায় হাটের দর নির্ধারিত দর ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, এবার ইজারা হয়েছে ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।মোস্তমাঝি মোড়সংলগ্ন অস্থায়ী হাটের নির্ধারিত দর ৭০ লাখ টাকা, তবে এবার ইজারা হয়েছে ৭০ লাখ ২০ হাজার টাকা। ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের দক্ষিণ-পূর্ব পাশের খালি জায়গার হাটের নির্ধারিত দর ১ কোটি ৪৭ লাখ ২৮ হাজার ৬০০ টাকা .তবে এবার ইজারা হয়েছে ৩ কোটি ১ লাখ টাকা। গোলাপবাগ আউটার স্টাফ কোয়ার্টারের উত্তর পাশের খালি জায়গায় অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাটের নির্ধারিত দর ৫৩ লাখ ৯৩ হাজার ৩৩৪ টাকা,এবার ইজারা হয়েছে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (উপসচিব) মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান বলেন,পশুর হাটগুলো নিয়ে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে এবং দরদাতাদের মধ্যে ভালো প্রতিযোগিতার কারণে ৯ টি হাটে বেশি টাকায় ইজারা হয়েছে। তিনি যেখানে প্রতিযোগিতা, সেখানে উত্তেজনা থাকে। তবে কোনো হাটে সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা নেই। কোনো কারণে কোনো হাটে ইজারা না মিললে সেগুলো সিটি করপোরেশন নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় (খাস আদায়) পরিচালনা করবে। এ বিষয়ে সব ধরনের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, এবার কোন মহাসড়কে পশুর হাট বসবে না। এরইমধ্যেই হাটগুলোর ইজারা সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, হাট ইজারা প্রক্রিয়া আইনগত দিক অনসুরণ করে সম্পন্ন করা হয়েছে। এখানে কাউকে অবৈধ কোনো সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। আইনগতভাবে এর কোনো সুযোগও নেই। তিনি বলেন, দলীয় পরিচয়ের সুবিধা নিয়ে কাউকে নগরীতে অবৈধ হাট বসাতে দেওয়া হবে না। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন কঠোর অবস্থানে থাকবে। হাটগুলোর শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়ে সিটি করপোরেশনের কোনো গাফিলতি থাকবে না।
আ. দৈ./কাশেম




















