রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্থানীয় সরকার নির্বাচন
নির্দলীয় ভোটে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন
শাহীন রহমান
প্রকাশ: সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬, ৯:৪৮ পিএম   (ভিজিট : ১২৯)
X

আইনের সঙ্গে বাস্তবতার সংঘাত, বাড়ছে বিতর্ক
আগামী এক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে দেশের সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ইসি থেকেও নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন এবারের নির্বাচন হবে নির্দলীয়। এ কারণে বিধিমালায় সংশোধনী আনা হচ্ছে। অচিরেই আইন বিধি সংশোধন হলে তফসিল ঘোষণা প্রস্তুতি রয়েছে সাংবিধানিক সংস্থাটির। তবে আইন অনুযায়ি স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ায় দলগুলোর প্রার্থী ঘোষণা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। 

নির্দলীয় হওয়ায় এই নির্বাচনের ব্যালটে থাকছে না দলীয় প্রতীক। কাগজে-কলমে রাজনৈতিক দলের সরাসরি সম্পৃক্ততারও সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে নিজেদের সমর্থিত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করছে, দলীয় সভায় মনোনয়ন দিচ্ছে, এমনকি বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নিচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সত্যিই কি নির্দলীয়, নাকি কেবল নামেই নির্দলীয়?

ইতোমধ্যে এনসিপি সিটি করপোরেশন, পৌর ও উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। দলীয় সমর্থন নিয়ে জামায়াতের প্রার্থীরা মাঠে নেমে পড়েছে। বিএনপি দলীয় প্রার্থী ঘোষণা না দিলেও দলটি অনেক প্রার্থী মাঠে নেমে পড়েছে। এছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোও আনুষ্ঠানিক প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এতে নির্দলীয় নির্বাচনের রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে ইতোমধ্যেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এই ধরনের প্রার্থীর ঘোষণা আইনের সুষ্পষ্ট লংঘন।

বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এমএম নাসিরউদ্দিনও। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন দল থেকে অলরেডি মনোনয়নের ঘোষণা দিচ্ছে। এটা আমার জন্য চিন্তার, আমার কপালে ভাঁজ পড়েছে। এতে নির্বাচন কমিশনের জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। তার বক্তব্যের পর বিষয়টি আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।
এদিকে নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, নির্বাচন বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের আলোচনায় এখন বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে এই দ্বৈত বাস্তবতা। 

একদিকে আইনে নির্দলীয় কাঠামো, অন্যদিকে মাঠে পুরোপুরি দলীয় নিয়ন্ত্রণ। ফলে নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, সমতা ও আইনের প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আইনে দলীয় প্রতীক না থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলো “সমর্থিত প্রার্থী” হিসেবে যেভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে, তাতে কার্যত নির্বাচন দলীয় রূপ নিচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কার্যালয়ে বৈঠক করে প্রার্থী ঠিক করা, কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রচারণায় অংশ নেয়া এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিষ্কার বা শোকজ করার ঘটনাও ঘটছে।

সম্প্রতি বিভিন্ন জেলায় দেখা গেছে, বড় রাজনৈতিক দলগুলো স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে বৈঠক করছে এবং তৃণমূল নেতাদের মাধ্যমে একক প্রার্থী দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। কোথাও কোথাও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচন করলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার হুমকিও দেয়া হয়েছে। এতে নির্দলীয় নির্বাচনের মূল ধারণাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্থানীয় নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরেই দলীয় প্রভাবমুক্ত ছিল না। আগে সরাসরি দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও পরে আইন পরিবর্তন করে নির্দলীয় পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা হয়। তবে আইন বদলালেও রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলায়নি। বরং দলগুলো এখন অনানুষ্ঠানিকভাবে আগের মতোই প্রার্থী নিয়ন্ত্রণ করছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে রাজনৈতিক দলগুলো এখন জাতীয় রাজনীতির শক্তি যাচাইয়ের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। কোন এলাকায় কোন দলের সাংগঠনিক শক্তি বেশি, মাঠে কার প্রভাব কতটা এসব হিসাব স্থানীয় নির্বাচন দিয়েই পরিমাপ করা হচ্ছে। ফলে দলগুলো এই নির্বাচনকে কোনোভাবেই “অরাজনৈতিক” রাখতে আগ্রহী নয়।

অন্যদিকে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, নির্দলীয় নির্বাচনে দলীয় হস্তক্ষেপ বাড়লে সাধারণ প্রার্থীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতাসীনদের সমর্থন না থাকলে স্থানীয়ভাবে নির্বাচনে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ কমে যায় এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা দলীয় প্রভাবের বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক মনে করেন, নির্দলীয় নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় সরকারকে জাতীয় রাজনীতির সংঘাত থেকে কিছুটা আলাদা রাখা। কিন্তু দলীয় সমর্থনের সংস্কৃতি অব্যাহত থাকায় সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বরং এখন প্রকাশ্য দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে “গোপন দলীয়করণ” চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান আইনে রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার সুযোগ না থাকলেও বাস্তবে “সমর্থিত প্রার্থী” ধারণাটি ব্যবহার করে দলগুলো সেই সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে যাচ্ছে। এতে আইনের চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, যদি বাস্তবে দলীয়ভাবেই নির্বাচন পরিচালিত হয়, তাহলে হয় আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, নয়তো রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।

এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র বিরোধী দল এখনি নানা অভিযোগ তুলছে।  জাতীয় নাগরিক পার্টি মুখপাত্র নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারি নির্বাচন কমিশন ও বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন কোন ধরনের অনিয়মন হলে বা নির্বাচনে কারচুপির চেষ্টার হলে এই সরকারকে আওয়ামী লীগের পরিণতি নবহন করতে হবে। দেশের আবার ও একটি অভ্যুত্থান হবে। তখন নির্বাচনী কমিশনকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে আইনের সঙ্গে বাস্তবতার অসামঞ্জস্য। কাগজে নির্দলীয় নির্বাচন থাকলেও মাঠে যদি দলীয় নির্দেশেই সবকিছু পরিচালিত হয়, তাহলে ভোটারদের কাছেও পুরো প্রক্রিয়া বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে। এতে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে রাষ্ট্রকে একটি স্পষ্ট অবস্থানে যেতে হবে। হয় পুরোপুরি নির্দলীয় কাঠামো কার্যকর করতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, নয়তো বাস্তবতা মেনে দলীয় অংশগ্রহণের স্বচ্ছ পদ্ধতি চালু করতে হবে। বর্তমান “ঘোষণায় নির্দলীয়, বাস্তবে দলীয়” অবস্থা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতা আরও বাড়াবে। কারণ স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া নয়; এটি তৃণমূল গণতন্ত্রের ভিত্তি।

 সেখানে যদি দলীয় আধিপত্য, প্রভাব ও অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণই প্রধান হয়ে ওঠে, তাহলে স্থানীয় সরকারের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়বে। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যাবে—নির্বাচন যখন কার্যত দলীয়ভাবেই হচ্ছে, তখন তাকে নির্দলীয় বলা কতটা যৌক্তিক?

আ.দৈ/আরএস


Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝