৫ হাজার কোটি টাকার স্কুল ফিডিং প্রকল্পে ইচ্ছেমতো লোপাট
শাহীন রহমান

নিম্নমানের খাবার, টেন্ডার কারসাজি, আত্মসাৎ ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগে প্রশ্নের মুখে শিশু পুষ্টি কর্মসূচি
দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
তদন্তে ৫ সদস্যের কমিটি
স্কুল ফিডিং প্রকল্পের শুরুতেই ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠৈছে। ১১ উপজেলায় অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সপ্তাহে কলা ও ডিম-বানরুটি থেকেই লোপাট হচ্ছে ১৭ কোটি টাকা। নিম্নমানের এসব খাবার খেয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা। এদিকে প্রকল্পের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার নির্দেশনার পর তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষীদের দৃষ্টান্তমুলক ও বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনারও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়েই বিষযটি নিয়ে কাজ শুরু করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। ইতোমধ্যে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সোমবার শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এ ঘটনা নিয়ে মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছেন। এমনকি অনিয়মকারীদের কার্যাদেশ বাতিল করার কথা জানিয়েছেন।
সভায় ববি হাজ্জাজ সভায় পাঁচ দফা নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, মিড-ডে মিল কার্যক্রম বাস্তবায়নে অনুমোদিত নমুনা অনুযায়ী নির্ধারিত প্যাকেজিং কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে এবং পূর্বানুমোদন ছাড়া কোনো ধরনের পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য হবে না। সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পণ্য সরবরাহকারী চালক ও জাতীয় পরিচয়পত্রধারী ব্যক্তি একই হতে হবে এবং সরবরাহের সময় বাধ্যতামূলকভাবে পরিচয় যাচাই করা হবে।, কোনো অবস্থাতেই সাব-কন্ট্রাক্ট বা উপ-ঠিকাদারি প্রদান করা যাবে না এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে স্বাক্ষরিত অঙ্গীকারনামা জমা দিতে হবে।
মিড-ডে মিল কার্যক্রমের মান ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা প্রতি মাসে দুইবার আকস্মিকভাবে কারখানা পরিদর্শন করবেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের খাদ্য নিরাপত্তা ও সেবার মান তদারকিতে বিদ্যালয় পর্যায়ে মায়েদের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ‘গার্ডিয়ান কমিটি’ গঠন করা হবে। এ কমিটিতে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিটির একজন সদস্য এবং তিনজন অভিভাবক মা সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
সারাদেশে প্রায় ১৫০ উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক স্কুল ফিডিং প্রকল্পটি চলছে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর থেকে। প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে বর্তমানে ৫ প্রকার খাবার দেওয়া হচ্ছে শিশুদের। তালিকায় রয়েছে, ডিম, বানরুটি, দুধ, কলা ও বিস্কুট। মুলত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দরিদ্র ও ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং পুষ্টিহীনতা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত সরকারের “স্কুল ফিডিং” প্রকল্প এখন নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার গুরুতর অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্য, সরকারি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন, তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবার নিম্নমানের, পরিমাণে কম, কোথাও পচা বা মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্য সরবরাহ করা হয়েছে; আবার কোথাও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে টেন্ডার বাণিজ্য ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরকারি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে দেশের অন্তত ৩৫ জেলায় স্কুল ফিডিং কার্যক্রমে “গুরুতর অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা” শনাক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির তুলনায় কম খাদ্য বিতরণ দেখানো হয়েছে।
কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত পুষ্টিমান বজায় রাখা হয়নি। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু এনজিও ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের মাধ্যমে কাজ পেয়েছে বলেও অভিযোগ উঠে এসেছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মাঠপর্যায়ে তদারকি দুর্বল হওয়ায় খাদ্য সরবরাহকারী ও স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে এক ধরনের “অঘোষিত যোগসাজশ” তৈরি হয়েছে। এর ফলে সরকারি বরাদ্দের একটি অংশ নিয়মিতভাবে অপচয় বা আত্মসাত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি জেলায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিম্নমানের খাবার বিতরণ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। কোথাও শুকনো বিস্কুটে পোকা পাওয়া গেছে, কোথাও কলা ও ডিমের মান নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। কয়েকটি বিদ্যালয়ে খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনাও তদন্তে এসেছে। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগ পরে তদন্ত কমিটি গঠন করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মাদারীপুর, ভোলা, গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার অভিভাবক ও শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, বিদ্যালয়ে যে খাবার সরবরাহ করা হয় তা অনেক সময় বাজারমূল্যের তুলনায় অতিরিক্ত দামে ক্রয় দেখানো হয়। প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ ও বাস্তব সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে বলেও দাবি তাদের।
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে কয়েকটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত পুষ্টিকর খাদ্যের পরিবর্তে নিম্নমানের ও কম পরিমাণ খাবার সরবরাহের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা হলেও বাস্তবে তা পরিণত হয়েছে কাগুজে সাফল্যের প্রদর্শনীতে।
অন্যদিকে ভোলার চরফ্যাশনে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম পরিচালনাকারী একটি এনজিওর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও অভিভাবকদের অভিযোগ, খাদ্য বিতরণে অনিয়ম, উপস্থিতির তালিকা জালিয়াতি এবং প্রকল্প ব্যয়ের ভুয়া হিসাব দেখিয়ে অর্থ আত্মসাত করা হয়েছে।
এদিকে প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পরিবর্তে প্রভাবশালী ঠিকাদার ও ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে অনেক ক্ষেত্রে শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী কাজ পায়। কিছু এলাকায় আবার সরবরাহকৃত খাদ্যের মান যাচাই ছাড়াই বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন দীর্ঘদিন ধরে চলা এ ধরনের প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব থাকলে দুর্নীতির ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাদের মতে, স্কুল ফিডিংয়ের মতো সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচিতে স্থানীয় প্রশাসন, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি ও অভিভাবকদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করলে অনিয়ম ঠেকানো কঠিন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশুদের পুষ্টি ও বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ এ ধরনের অনিয়ম সরাসরি শিশুস্বাস্থ্য ও শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাদের মতে, প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে ডিজিটাল মনিটরিং, উন্মুক্ত ক্রয়প্রক্রিয়া, নিয়মিত তৃতীয় পক্ষের অডিট এবং অভিযোগ তদন্তে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা অবশ্য দাবি করেছেন, বিচ্ছিন্ন কিছু অনিয়ম ছাড়া প্রকল্প সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তারা জানান, অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরাই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে যদি কার্যকর নজরদারি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে শিশুদের পুষ্টি উন্নয়নের লক্ষ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জনগণের করের অর্থও অপচয়ের ঝুঁকিতে পড়বে। আর সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হবে সেই দরিদ্র শিক্ষার্থীরা, যাদের জন্য এই কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল।
আ.দৈ/আরএস




















