রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মাতুয়াইল ডাম্পিং স্টেশন বর্জ্যের গন্ধে বিপন্ন জনপদ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬, ৬:৩৬ পিএম   (ভিজিট : ১৩১)
X

রাজধানীর বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আসল রূপ দেখতে মাতুয়াইল ডাম্পিং স্টেশনে প্রবেশ করতেই নাকে আসে এক তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ। সাধারণ মানুষের পক্ষে এই দুর্গন্ধ সহ্য করে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া যেখানে অসম্ভব, সেখানে বছরের পর বছর ধরে এই বিষাক্ত পরিবেশেই দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় লাখো বাসিন্দা। 

তবে বর্জ্যের এই মহাসমুদ্রে সাধারণ মানুষের জীবন যখন ওষ্ঠাগত, তখন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদাসীনতা এবং এক শ্রেণীর অসাধু চক্রের পকেট ভারী হওয়ার গল্প অন্যরকম।

ডাম্পিং স্টেশনের মূল বর্জ্য ফেলার জায়গায় প্রবেশ করতে গেলেই পড়তে হয় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে। সেখানে পাহারায় থাকা আনসার সদস্যদের সোজা কথা—‘উপরের পারমিশন চাই’। অথচ নিয়মানুযায়ী তথ্য সংগ্রহের জন্য ডিএসসিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীকে ফোন করা হলে তিনি পরিচয় লিখে হোয়াটসঅ্যাপ করার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে পরিচয় পাঠালেও মেলে আমলাতান্ত্রিক ‘পাসিং দ্য বল’ খেলা; দায়িত্ব ঠেলে দেওয়া হয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের দিকে।

তথ্য সংগ্রহের এই দাপ্তরিক জটিলতার মাঝেই ডাম্পিং স্টেশনের মূল ফটকে দেখা যায় এক অদ্ভুত দৃশ্য। নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে একটি মাটি বোঝাই ছোট ভ্যান এসে দাঁড়াতেই, চালক অত্যন্ত সাবলীলভাবে দায়িত্বরত আনসার সদস্যের হাতে কিছু ‘কাগজি নোট’ বা ঘুষ গুঁজে দেন। মুহূর্তেই কোনো অনুমতি ছাড়াই খুলে যায় ভেতরের গেট। অর্থাৎ, গণমাধ্যমের জন্য যে নিয়মের বেড়াজাল, তা অবৈধ সুবিধাভোগীদের জন্য একেবারেই শিথিল। বর্তমানের সামাজিক বাস্তবতায় এই প্রকাশ্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করাও যেন সাধারণ মানুষের জন্য এক প্রকার বিলাসিতা।

মাতুয়াইল ডাম্পিং স্টেশন সংলগ্ন আমিন মোহাম্মদ হাউজিংয়ের সি-ব্লকে গিয়ে দেখা যায় জনদুর্ভোগের এক চরম চিত্র, যাকে স্থানীয়রা ‘নরক’ বললেও কম মনে করেন। এখানকার বাতাসে মিশে আছে তীব্র বিষ। এলাকার মানুষের প্রতি প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে শরীরে ঢুকছে ক্ষতিকর গ্যাস। ফলে ঘরে ঘরে মানুষের চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, এমনকি ডায়াবেটিসের মতো জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। দুর্গন্ধ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে এই এলাকার বাড়িগুলো এখন প্রায় জনশূন্য। প্রতিটি বাড়ির সামনে ঝুলছে ‘টু-লেট’ বা বাসা ভাড়ার বোর্ড। ভাড়াটিয়ারা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে এলাকা ছেড়ে পালাচ্ছেন। ফলে বাড়িগুলো এখন যেন একেকটি ‘পরিত্যক্ত দুর্গ’।

স্থানীয় বাড়ির মালিকরা জানান, তারা সিটি কর্পোরেশন থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে এই মরণফাঁদটি ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়ার জন্য বারবার লিখিত আবেদন করেছেন। কিন্তু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে ‘দূষণমুক্ত’ পরিকল্পনা করা কর্মকর্তাদের কানে আজ পর্যন্ত এই দুর্গন্ধ ও আর্তনাদ পৌঁছায়নি। দীর্ঘদিন ধরে কোনো প্রতিকার না পেয়ে এলাকাবাসী এখন ক্লান্ত এবং তারা আন্দোলনের পথ বেছে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছেন না।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে এই অব্যবস্থাপনা জিইয়ে রাখার আসল রহস্য। এই ডাম্পিং স্টেশনটি এখন একদল অসাধু মানুষের জন্য ‘টাকার খনি’। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা বর্জ্য যখন পচে মাটিতে মিশে যাচ্ছে, তখন সেই পুষ্টিসমৃদ্ধ ‘বর্জ্য-মিশ্রিত মাটি’ রাতের আঁধারে গোপনে বিক্রি করছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। যেখানে বিষাক্ত বায়ুর চাপে মানুষের জীবন বিপর্যস্ত, সেখানে এই আবর্জনাকে পুঁজি করেই আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে এক শ্রেণীর কালোবাজারি চক্র। আর এই পুরো প্রক্রিয়াই চলছে প্রশাসনের নাকের ডগায়।

মাতুয়াইলের এই বর্তমান চিত্র শুধু একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে না; বরং এটি সিটি কর্পোরেশনের চোখে ঠুলি আর কানে তুলা দিয়ে থাকার এক নির্লজ্জ মহড়া। একদিকে একটি বিস্তীর্ণ জনপদ ও তার বাসিন্দাদের স্বাস্থ্য ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, আর অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ সম্ভবত পরবর্তী ‘ক্লিন সিটি’ বা পরিচ্ছন্ন নগরীর পুরস্কার পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর। ঢাকার ফুসফুসকে এভাবে বিষাক্ত করার এই ধারা এখনই বন্ধ না হলে, এর চড়া মূল্য দিতে হবে পুরো রাজধানীকে।

 আমিন মোহাম্মদ গ্রুফের একজন  বাসিন্দা জানান, তিনি এই এলকায় বাসা ভাড়া নেওয়ার পর শ্বাস কষ্টে ভুগছে। তিনি শিগগরিই এই এলকা থেকে চলে যাবে। আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ সহ   এলাকার অন্যান্য বসবাসকারী  জনগন জানিয়েছে শিগগরিই তারা প্রধান মন্ত্রীর কাছে একটি  এ বিষয় নিয়ে আবেদন করবেন। এরপর তারা রাজপথে  কর্ম--সুচি পালন করবে।

আ.দৈ/আরএস/এএইচএইচ


Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝