রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফুটপাথে বেড়ে ওঠা শৈশব
উন্নয়ন বিতর্কে অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে শহরে পথশিশুদের জীবনসংগ্রাম
শাহীন রহমান
প্রকাশ: রোববার, ১৭ মে, ২০২৬, ৮:২৬ পিএম  আপডেট: ১৭.০৫.২০২৬ ৯:২৮ পিএম  (ভিজিট : ৮১)
X

পুরান ঢাকার বাহাদুরশাহ পার্কে প্রায় ২ বছর ধরে কুসুমের (১০) বসবাস। ছোট বেলায় কুসুমের মা মারা যায়। বাবা নতুন বিয়ে করলে তাকে নানির কাছে পাঠিয়ে দেয়া। নানি মারা যাওয়ার পর ফুটপাতে হয় কুসুমের ঠিকানা। বলতে গেলে এটা তার স্থায়ী ঠিকানা। 

কুসুম মাঝে মাঝে কলম বিক্রি করে যা পাই তাই দিয়ে খাওয়া দাওয়া করে দিন কাটায়। মাঝে মাঝে না খেয়েও থাকে। আর রাতে এই পার্কেই ঘুমাই। শুধু কুসুুুুুুুুম নয়। এই শহরের কসুমের মতো হাজারো শিশুর বসবাস। মানবেতর জীবন যাদের নিত্যসঙ্গী। 

রাজধানীসহ সারাদেশে কি পরিমান পথশিশু বাস করে সেই পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই। পথশিশুদের জন্য সরকারের কোন উন্নয়ন পরিকল্পনাও নেই। অভাব যাদের নিত্য সঙ্গী রাষ্ট্রও তাদের পাশে নেই বললেই চলে। অবহেলা বঞ্চনার মধ্যেই তাদের বেড়ে ওঠা। এই পরিপেক্ষিতে  আদালত সরকারকে রুল দিয়ে জানতে চেয়েছে পথশিশুদের সুরক্ষা এবং তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতাকে কেন অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না।

 মানবাধিকার সংস্থা ‘ইকুইটাস ফাউন্ডেশনে’র করা একটি জনস্বার্থমূলক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রোববার বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের হাইকোর্ট বেঞ্চ রোববার এই রুল জারি করেন।

আদেশে বলা হয় পথশিশুদের সুরক্ষা, পুনর্বাসন ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে কেন প্রয়োজনীয় বিধিমালা, নীতিমালা বা আইন প্রণয়নের নির্দেশ দেয়া হবে না, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তার কারণ দর্শাতেও বলেছেন আদালত। রুলে হাইকোর্ট আরও জানতে চেয়েছেন পথশিশুদের প্রকৃত অবস্থা নির্ণয়ে কেন তদন্ত ও দেশব্যাপী জরিপ পরিচালনার নির্দেশ দেয়া হবে না; এবং তাদের বিরুদ্ধে সব ধরনের হয়রানি, নির্যাতন, অবহেলা ও শোষণ প্রতিরোধে কঠোর তদারকি, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ কেন দেয়া হবে না।

ঢাকার ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন লাখো মানুষের ভিড়ের মাঝেও কিছু মুখ যেন অদৃশ্য। কেউ ফুল বিক্রি করছে, কেউ গাড়ির কাঁচ মুছছে, কেউ আবার গভীর রাতে ফুটপাতের এক কোণে ছেঁড়া কাপড় গায়ে ঘুমিয়ে পড়ছে। রাজধানীর উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির নানা আলোচনার বাইরে থেকে যাওয়া এই শিশুরাই ঢাকার পথশিশু। রাষ্ট্রের নানা অর্জনের বিপরীতে তাদের জীবন যেন নগরের এক নীরব প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেকই আসে ঢাকা বিভাগে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থে রাজধানীকেন্দ্রিক অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হচ্ছে, বাড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নগর সম্প্রসারণ। কিন্তু একই সময়ে ঢাকা শহরের ফুটপাত, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন ও বাজার এলাকাগুলোতে বেড়ে চলেছে পথশিশুর সংখ্যা। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক বৈষম্যের এই দ্বৈত চিত্র এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনিসেফের সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৩৪ লাখের বেশি শিশু রয়েছে। অর্থাৎ তারা রাস্তায় বসবাস করে, রাস্তায় কাজ করে অথবা জীবনের বড় অংশ কাটায় ফুটপাত ও উন্মুক্ত নগর পরিবেশে। এদের বড় অংশই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে কেন্দ্রীভূত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদীভাঙন, পরিবার ভাঙন এবং গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থানের সংকট সব মিলিয়ে হাজার হাজার শিশু প্রতি বছর ঢাকামুখী হচ্ছে।

রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন, সদরঘাট, গাবতলী, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, মহাখালী ও বিভিন্ন উড়ালসেতুর নিচে প্রতিদিন দেখা যায় এসব শিশুর বসবাস। দিনের বেলায় তারা কেউ ভিক্ষা করে, কেউ টোকাই হিসেবে বর্জ্য সংগ্রহ করে, কেউ চায়ের দোকানে কাজ করে, আবার কেউ ট্রাফিক সিগন্যালে ফুল বা খেলনা বিক্রি করে। রাত নামলে ফুটপাতই হয়ে ওঠে তাদের শয়নকক্ষ।

শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, এসব শিশুর বড় অংশই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত নয়। ইউনিসেফের জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৭২ শতাংশ পথশিশু পড়তে বা লিখতে পারে না। স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ আশ্রয়, পুষ্টিকর খাবার ও মানসিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে তারা বড় হচ্ছে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। মেয়েশিশুরা আরও বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। যৌন সহিংসতা, পাচার, মাদক ও অপরাধচক্রের শিকার হওয়ার আশঙ্কা তাদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি।

সামাজিক সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, রাজধানীতে পথশিশুদের একটি বড় অংশ দিনে অন্তত একবার খাবারের নিশ্চয়তাও পায় না। অনেকেই খাবারের জন্য হোটেলের উচ্ছিষ্ট বা বাজারের ফেলে দেয়া খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সীমিত পরিসরে কাজ করলেও সমস্যার ব্যাপ্তি এত বড় যে তা মোকাবিলায় সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নগর উন্নয়নের সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর সমন্বয় না থাকায় এই সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। ঢাকা শহরে একদিকে বহুতল ভবন, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে ও আধুনিক অবকাঠামো গড়ে উঠছে; অন্যদিকে একই শহরের ফুটপাতে শিশুদের রাত কাটাতে হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। উন্নয়ন পরিকল্পনায় দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও শিশুদের অন্তর্ভুক্তি না থাকলে এই বৈষম্য আরও বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও বলছেন, শিশু অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্ন এখনো জাতীয় রাজনীতির মূল আলোচনায় পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না। সাম্প্রতিক সময়ে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে বিরতিমুলক সময়সীমার বিধানকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নারী অধিকারকর্মীদের মতে, রাজনৈতিক কাঠামোয় অংশগ্রহণ সীমিত হলে সামাজিক নীতিনির্ধারণেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে পথশিশু, শ্রমজীবী শিশু ও নগর দরিদ্রদের মতো বিষয়গুলো নীতিগত অগ্রাধিকার পায় না।

অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, রেমিট্যান্স প্রবাহ দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করলেও সেই অর্থের একটি বড় অংশ শহরকেন্দ্রিক ভোগ ও সম্পদ বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু নগর দরিদ্রদের জন্য আবাসন, শিশুশিক্ষা ও পুনর্বাসনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় সামাজিক বৈষম্য কমছে না। তারা মনে করেন, উন্নয়নের সুফল সমাজের নিম্নস্তরে পৌঁছাতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে তা সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।.

ঢাকার পথশিশুদের বড় অংশের জন্মও এই শহরে নয়। অনেক পরিবার নদীভাঙন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে গ্রাম হারিয়ে রাজধানীতে এসে বস্তিতে আশ্রয় নেয়। পরে পরিবার ভেঙে গেলে বা অভিভাবক কাজ হারালে শিশুরা রাস্তায় নেমে পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে শিশুরা নিজেরাই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসে নির্যাতন বা দারিদ্র্যের কারণে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘদিন রাস্তায় বসবাস করা শিশুদের মধ্যে হতাশা, ভয়, আক্রমণাত্মক আচরণ ও মানসিক ট্রমা তৈরি হয়। কিন্তু বাংলাদেশে পথশিশুদের জন্য বিশেষায়িত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রায় অনুপস্থিত। ফলে তারা সহজেই অপরাধচক্র, মাদকাসক্তি বা সহিংস পরিবেশে জড়িয়ে পড়ে।

শিশু অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, শুধু অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, পরিবারভিত্তিক সহায়তা, বিনামূল্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ নগর পরিকল্পনা। একই সঙ্গে পথশিশুদের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও নিয়মিত সরকারি তথ্যভান্ডার গড়ে তোলারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
 বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন রাজধানীর ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা শিশুটিও নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারবে। অন্যথায় অর্থনৈতিক অগ্রগতির ঝলমলে পরিসংখ্যানের আড়ালে থেকে যাবে এক বিশাল প্রজন্মের বঞ্চনার ইতিহাস।

আ.দৈ/আরএস


Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝