রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি
গঙ্গার পানি বন্টন নিয়ে নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ ভারত
শাহীন রহমান
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ৭:২৬ পিএম   (ভিজিট : ৬৪)
X

আর মাত্র কয়েক মাস পরই শেষ হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বহুল আলোচিত ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি। তিন দশক আগে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা আগামী ডিসেম্বর মাসে। 

এর আগেই নতুন চুক্তি, পুরোনো চুক্তির নবায়ন অথবা নতুন কাঠামোয় পানি ভাগাভাগি কোন পথে দুই দেশ এগোবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও কারিগরি আলোচনা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আলোচনায় সবচেয়ে বড় বিরোধ তৈরি হয়েছে একটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। গঙ্গার পানি আসলে কোথায় এবং কীভাবে মাপা হবে। 

এছাড়া আগের চুক্তি বহাল রেখে নতুন চুক্তি হবে নাকি এতে নতুন শর্ত যোগ হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষের মাঝ ব্যাপক আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে আওয়ামী লীগ সরকার আমলের শেষের দিকে বিষয়টি নিয়ে দুদেশের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। কিন্ত আগস্ট পটপরিবর্তনে ফলে আলোচনায় ছেদ পরে। 

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ফের দু দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে জানা গেছে উভয় দেশের পক্ষ থেকে চুক্তি নিয়ে নতুন সমীকরণ শুরু হয়েছে। ফলে অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে নতুন গঙ্গা চুক্তির নিয়ে। এ বিষয়ে শনিবার কথা বলেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

তিনি বলেন দুই দেশের সম্পর্ক নির্ভর করছে ফারাক্কা পানি বন্টন চুক্তির উপর। একই সাথে তিনি উল্লেখ করেন দেশের স্বার্থ বিনষ্ট করে আমরা কখনই কোনো চুক্তি কাউকে করতে দেব না। এ ব্যাপারে আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন। এদিকে ঢাকা ও দিল্লির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে দুই দেশের যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি), পানি বিশেষজ্ঞ, হাইড্রোলজিস্ট ও কূটনৈতিক কর্মকর্তারা কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। 

চলতি বছরের মার্চে ফারাক্কা এলাকায় যৌথ জরিপও পরিচালনা করা হয়েছে। কলকাতায় অনুষ্ঠিত টেকনিক্যাল কমিটির বৈঠকে সেই জরিপের ফলাফল এবং শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার প্রবাহের বাস্তব চিত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। তবে আলোচনার অগ্রগতি যতটা এগোচ্ছে, মতপার্থক্যও ততটাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

জানা গেছে, চুক্তির নবায়ন ইস্যুতে ভেতরে ভেতরে যে প্রাথমিক প্রস্তুতি চলছে, তাতে ভারতীয় পক্ষ চাইছে ফারাক্কা পয়েন্টে পানি প্রবাহের ভিত্তিতে চুক্তির ফ্রেমওয়ার্ক দাড় করাতে। অন্যদিকে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির গড় প্রবাহ কম থাকায় বাংলাদেশ চাইছে পুরো নদীর পানি প্রবাহকে বিবেচনায় নিয়ে পানি ভাগাভাগি করতে। সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি উভয দেশের মধ্যে আলোচনার বিষয়ে কথা বলেছেন। 

ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণও বলেছেন, আগের চুক্তিতে যে ফর্মুলায় পানি ভাগাভাগির কথা বলা হয়েছিল সেটি এখন আর কাজ নাও করতে পারে। ওই চুক্তিতে ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত পানি প্রবাহকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছিল। পঙ্কজ শরণ বলেছেন যে ১৯৯৬ সালের চুক্তির ত্রিশ বছর পর এসে একই ফর্মুলা কাজ করবে না। তিনি এ ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক ৪০ বছরের পানি প্রবাহকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন। 

যদিও যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য ও নদী বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলছেন, এ ধরনের চিন্তা মোটেও যৌক্তিক নয়। তিনি বলেন, গঙ্গা নদী তো ফারাক্কা থেকে শুরু হয়নি। আবার উজান থেকে ভারত একতরফা পানি প্রত্যাহার করার কারণে সেখানে পানির প্রবাহ অনেক কম থাকে। ফলে তার ওপর গড় করে পানি ভাগাভাগি ন্যায্য হবে না। এছাড়া দুই দেশ আগেই সম্মত হয়েছিল যে গঙ্গার পানি নদীর পরিমাণ ভিত্তিক ভাগ হবে। আইনুন নিশাত বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত এখন সুসম্পর্কের কথা বলছে এবং এই সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই হলো পানি। 

আশা করবো আলোচনা ও যৌক্তিক আচরণের ভিত্তিতে গঙ্গার পানি বণ্টনের বিষয়টি ঠিক হবে। জানা গেছে বাংলাদেশের পক্ষ জানানো হয়েছে গঙ্গার মূল প্রবাহ উজানে বিভিন্ন স্থানে প্রত্যাহার বা ডাইভারশন হওয়ার পর ফারাক্কায় যে পরিমাণ পানি পৌঁছায়, সেটিকে ভিত্তি করে ভবিষ্যৎ বণ্টন নির্ধারণ করা হলে বাংলাদেশ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের মতে, গঙ্গার স্বাভাবিক অববাহিকার প্রবাহ, দীর্ঘমেয়াদি গড় পানি এবং উজানের ব্যবস্থাপনা সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে নতুন হিসাব নির্ধারণ করতে হবে। অন্যদিকে ভারতীয় পক্ষের অবস্থান হচ্ছে, ফারাক্কা ব্যারাজ পয়েন্টে বাস্তবে যে পরিমাণ পানি পাওয়া যায়, সেই প্রবাহের ভিত্তিতেই বণ্টন হওয়া উচিত। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, এই পার্থক্যই এখন নতুন চুক্তির আলোচনায় সবচেয়ে বড় অচলাবস্থার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তিকে দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হয়েছিল। সে সময় বাংলাদেশ সরকার এবং ভারতের সরকারের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিটি ৩০ বছরের জন্য কার্যকর করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি ভাগাভাগির একটি সূচি নির্ধারণ করা হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ বজায় রাখা এবং ভারতের হুগলি নদীর নাব্যতা রক্ষা করা।

কিন্তু গত তিন দশকে বাস্তবতা বদলে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, হিমালয় অঞ্চলের প্রবাহগত পরিবর্তন, উজানে নতুন পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প, কৃষি ও নগর ব্যবহারের চাহিদা বৃদ্ধি সব মিলিয়ে গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

ভারতের কিছু পানি বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক কূটনীতিক প্রকাশ্যে বলছেন, ১৯৯৬ সালের চুক্তির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত ডেটা এখন আর বাস্তবসম্মত নয়। কারণ সেই সময় মূলত ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সালের প্রবাহ তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন হাইড্রোলজিক্যাল ডেটা এবং সাম্প্রতিক প্রবাহের বাস্তবতা বিবেচনায় না নিলে নতুন চুক্তি টেকসই হবে না বলে তারা মত দিচ্ছেন।

বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এই যুক্তিকে সতর্কতার সঙ্গে দেখছেন। তাদের বক্তব্য, যদি “বর্তমানে যত পানি পাওয়া যায়” এই নীতিতে চুক্তি করা হয়, তাহলে উজানে পানি প্রত্যাহারের বিষয়টি কার্যত বৈধতা পেয়ে যাবে। এতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ভাগ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা বলছেন, শুধু ফারাক্কা পয়েন্টে দাঁড়িয়ে প্রবাহ মাপলে সমস্যার মূল কারণ আড়াল হবে। বরং পুরো গঙ্গা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনা, উজানে কত পানি কোথায় সরানো হচ্ছে এবং পরিবেশগত ন্যূনতম প্রবাহ এসব বিষয় নতুন চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ এখন শুধু পানি বণ্টনের প্রশ্ন নয়; এটি আঞ্চলিক রাজনীতি, জলবায়ু নিরাপত্তা এবং আন্তঃসীমান্ত কূটনীতির বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু জেলা বিশেষ করে রাজশাহী, কুষ্টিয়া, খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা অঞ্চলে গঙ্গার শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ কমে যাওয়ার প্রভাব বহু বছর ধরেই আলোচিত। 

নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, কৃষিতে সেচ সংকট, মাছের উৎপাদন হ্রাস এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়গুলো নতুন করে সামনে আসছে। পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যৎ চুক্তিতে পরিবেশগত প্রবাহ নিশ্চিত না করা গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

এদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যেও ফারাক্কার গুরুত্ব কম নয়। কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা এবং হুগলি নদীর প্রবাহ সচল রাখতে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই ফারাক্কা ব্যারাজকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে আসছে। ফলে দিল্লির জন্যও এটি কেবল দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক ইস্যু নয়, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত।

দুই দেশের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে খুব সতর্ক ভাষায় কথা বলছেন। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি সম্প্রতি বলেছেন, যৌথ নদী কমিশন সময়মতো বিষয়টি নিয়ে কাজ করবে এবং দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানের পথ খুঁজবে। বাংলাদেশি কর্মকর্তারাও আনুষ্ঠানিকভাবে আশাবাদী অবস্থান বজায় রাখছেন। তবে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, সামনের কয়েক মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। কারণ নতুন চুক্তি শুধু প্রযুক্তিগত সমঝোতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে দুই দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সম্পর্কও গভীরভাবে জড়িত। সীমান্ত, বাণিজ্য, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, তিস্তা চুক্তির অমীমাংসিত প্রশ্ন সব মিলিয়ে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের সামগ্রিক আবহ গঙ্গা আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত দুই দেশ হয়তো পুরোপুরি নতুন চুক্তির বদলে বিদ্যমান কাঠামো সংশোধন করে নবায়নের পথ বেছে নিতে পারে। আবার কেউ কেউ বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় “ডায়নামিক ওয়াটার শেয়ারিং” বা মৌসুমি বাস্তব প্রবাহভিত্তিক নমনীয় কাঠামো নিয়েও আলোচনা হতে পারে। যদিও এ ধরনের প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।

পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে স্বচ্ছ তথ্য বিনিময়। গঙ্গার প্রকৃত প্রবাহ, উজানে পানি ব্যবস্থাপনা, প্রত্যাহারের পরিমাণ এবং ভবিষ্যৎ জলবায়ুগত ঝুঁকি নিয়ে যদি দুই দেশ অভিন্ন তথ্যভিত্তিক অবস্থানে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে নতুন চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। তারা আরও বলছেন, শুধু কূটনৈতিক সমঝোতা নয়, বৈজ্ঞানিক তথ্য, যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার না দিলে ভবিষ্যতে পানি সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

তিন দশক আগে যে গঙ্গা চুক্তি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন দিগন্ত হিসেবে উদযাপিত হয়েছিল, তার মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে এখন আবারও সেই নদী দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। আগামী কয়েক মাসের আলোচনা ঠিক করে দিতে পারে গঙ্গা হবে সহযোগিতার নতুন সেতু, নাকি দক্ষিণ এশিয়ার পানি রাজনীতির আরেকটি অনিশ্চিত অধ্যায়।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝