রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
ই-পেপার

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এইআই ক্যামেরায় ফিরছে ঢাকার রাস্তার শৃঙ্খলা
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১০:৫৪ এএম   (ভিজিট : ১০৯)
X

সড়কে এআই নজরদারির পর বদলাচ্ছে চালকদের আচরণ, 
কমছে উল্টো পথে চলা ও সিগন্যাল ভাঙা
সকাল সাড়ে ৯টা। রাজধানীর ফার্মগেট মোড়। একসময় যেখানে লালবাতি উপেক্ষা করে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও বাসের হুড়োহুড়ি ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য, এখন সেখানে অপেক্ষা করছে সারিবদ্ধ যানবাহন। 

সিগন্যাল সবুজ না হওয়া পর্যন্ত কেউ সামনে এগোচ্ছে না। ফুটওভারব্রিজের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এক ট্রাফিক সার্জেন্ট মুচকি হেসে বললেন, “এখন আর বাঁশি বাজাতে হয় কম, ক্যামেরাই কাজ করে দিচ্ছে।”

রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরা বসানোর পর দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে। বছরের পর বছর ধরে বেপরোয়া যান চলাচল, সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে গাড়ি চালানো ও হেলমেটবিহীন মোটরসাইকেল চালানোর যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, প্রযুক্তির কঠোর নজরদারিতে তাতে প্রথমবারের মতো দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ বলছে, এআই ক্যামেরা চালুর পর অনেক এলাকায় ট্রাফিক আইন ভঙ্গের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে হেলমেট ব্যবহার ও লেন মেনে চলার প্রবণতা বেড়েছে। সড়কে এখন অনেক চালকই জানেন—কোথাও না কোথাও “অদৃশ্য চোখ” তাদের নজরে রাখছে।

রাজধানীর শাহবাগ, বিজয় সরণি, গুলিস্তান, এয়ারপোর্ট সড়ক, বনানী ও প্রগতি সরণিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্থাপন করা হয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্মার্ট ক্যামেরা। এসব ক্যামেরা শুধু ভিডিও ধারণই করে না; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে পারে সিগন্যাল ভঙ্গ, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, স্টপ লাইন অতিক্রম, নির্ধারিত লেন ভঙ্গ, এমনকি মোবাইল ফোন ব্যবহার করে গাড়ি চালানোও।

ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ক্যামেরা শনাক্ত করার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সার্ভারে পাঠানো হয়। এরপর গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্ত করে মামলা বা জরিমানার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ডিএমপির এক কর্মকর্তা বলেন, “আগে চালকরা ভাবতেন, পুলিশ না দেখলে নিয়ম ভাঙলেও সমস্যা নেই। এখন তারা বুঝতে পারছেন, প্রযুক্তি সবসময় নজর রাখছে।”

আচরণে পরিবর্তন॥ রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল চালকদের বড় অংশ এখন হেলমেট ব্যবহার করছেন। অনেকেই সিগন্যাল অমান্য করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বদলে নির্ধারিত লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। বাস চালকদের মধ্যেও কিছুটা সতর্কতা দেখা যাচ্ছে। ফার্মগেটে কথা হয় মোটরসাইকেল চালক রাকিব হাসানের সঙ্গে। 

তিনি বলেন, “আগে মাঝে মাঝে সিগন্যাল ভাঙতাম। এখন ভয় লাগে। ক্যামেরায় ধরা পড়লে সরাসরি মামলা চলে আসে।” একজন রাইডশেয়ার চালক বলেন, “পুলিশের সামনে নিয়ম মানতাম, এখন সব জায়গাতেই মানতে হয়। কারণ কোন ক্যামেরা কোথায় আছে বোঝা যায় না।”

প্রযুক্তির ভয়ে শৃঙ্খলা॥ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার সড়কে দীর্ঘদিন ধরে আইন প্রয়োগের ঘাটতি ছিল বড় সমস্যা। ফলে চালকদের মধ্যে “ধরা না পড়লে অপরাধ নয়”—এমন মানসিকতা তৈরি হয়েছিল। এআই ক্যামেরা সেই সংস্কৃতিতে আঘাত করেছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালকদের আচরণ পরিবর্তনে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। 

কারণ মানুষের পক্ষে সব জায়গায় নজরদারি সম্ভব না হলেও এআই ক্যামেরা ২৪ ঘণ্টা কাজ করতে পারে। তবে তারা সতর্কও করছেন—শুধু ক্যামেরা বসালেই হবে না; এর তথ্যের সঠিক ব্যবহার, স্বচ্ছ জরিমানা ব্যবস্থা এবং নাগরিক আস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।

কমছে কি দুর্ঘটনা॥ ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, যেসব এলাকায় এআই ক্যামেরা সক্রিয় রয়েছে সেখানে কিছু ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলা কমেছে। বিশেষ করে সিগন্যাল অমান্য ও উল্টো পথে চলাচল কমে আসায় মোড়ে যানজটের চাপও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি এখনও প্রাথমিক পরিবর্তন। দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল পেতে হলে পুরো নগরজুড়ে সমন্বিত স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

ঢাকার ট্রাফিক সংস্কৃতিতে নতুন অধ্যায়॥ বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার সড়কে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু নজরদারি নয়; এটি নগর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সূচনা। কারণ এতদিন সড়কে নিয়ম মানা অনেকের কাছে ছিল “ঐচ্ছিক” বিষয়। এখন প্রযুক্তি সেই সুযোগ কমিয়ে আনছে। 

এতে একদিকে যেমন চালকদের মধ্যে জবাবদিহি তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষও কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। রাজধানীর বাসিন্দা আফসানা রহমান বলেন, “আগে রাস্তা পার হতে ভয় লাগত। এখন অন্তত মনে হয় গাড়িগুলো একটু থামে।”

চ্যালেঞ্জও কম নয়॥ তবে বাস্তবতা পুরোপুরি বদলে যায়নি। এখনও অনেক এলাকায় বেপরোয়া বাস চালানো, ফুটপাত দখল, অবৈধ পার্কিং ও ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা রয়ে গেছে। অনেক চালক অভিযোগ করছেন, কোথাও কোথাও ভুল শনাক্তের কারণে হয়রানির ঘটনাও ঘটছে। এ ছাড়া প্রযুক্তির রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ, তথ্য নিরাপত্তা এবং দক্ষ জনবল নিয়েও প্রশ্ন আছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই ক্যামেরা কার্যকর করতে হলে স্বচ্ছ ডাটা ব্যবস্থাপনা, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি, এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। “ভয় নয়, অভ্যাসে পরিণত হোক”। ট্রাফিক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির ভয়ে নিয়ম মানা শুরু হলেও সেটিকে ধীরে ধীরে নাগরিক সংস্কৃতিতে রূপ দিতে হবে। 

কারণ একটি আধুনিক শহরে ট্রাফিক শৃঙ্খলা শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি নাগরিক দায়িত্ববোধেরও অংশ। তাদের ভাষায়, “ঢাকার মানুষ যদি ক্যামেরার ভয়ে নয়, সচেতনতা থেকে নিয়ম মানতে শেখে—তবেই এই পরিবর্তন স্থায়ী হবে।” রাজধানীর ব্যস্ত মোড়ে দাঁড়িয়ে এখন তাই নতুন এক বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে—বাঁশির শব্দের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে ক্যামেরার নীরব নজরদারি।

আ.দৈ/আরএস



Advertisement
Advertisement
Loading...
Loading...
বিশেষ সংবাদ- এর আরো খবর
close
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশক : কামরুজ্জামান সাঈদী সোহাগ

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ মাসুদ আলম
প্রকাশক কর্তৃক ১/২ সাগুফতা ডি লরেল (তৃতীয় তলা), কমলাপুর বাজার রোড, মতিঝিল ঢাকা-১০০০ বা/এ হইতে প্রকাশিত।

বার্তা ও বানিজ্যক কার্যালয়ঃ খাজা আইটি পার্ক, কল্যানপুর ঢাকা -১২০৭
ফোন : 01901-025220 , ই-মেইল : ajkerdainik@gmail.com

About Us    Advertisement    Terms & Conditions    Privacy Policy    Copyright Policy    Circulation    Contact Us   
© ২০২৬ আজকের দৈনিক
🔝